ঢাকা     শনিবার   ০৯ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৬ ১৪৩৩ || ২১ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

লাইভ ওয়েটে কোরবানির পশু বিক্রি, স্বস্তিতে ক্রেতা-খামারিরা

মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল, ঠাকুরগাঁও || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ৯ মে ২০২৬  
লাইভ ওয়েটে কোরবানির পশু বিক্রি, স্বস্তিতে ক্রেতা-খামারিরা

কোরবানির পশু বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে ওজন মাপার মেশিনে

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে জমে উঠেছে খামারগুলো। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের গরু, মহিষ ও ছাগল প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। তবে এবার জেলার কয়েকটি খামারে ভিন্ন এক চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রচলিত দরকষাকষির পরিবর্তে লাইভ ওয়েট বা ওজনের ভিত্তিতে কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। প্রতি কেজি গরুর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫০ টাকা। নতুন এই পদ্ধতিতে স্বস্তি পাচ্ছেন ক্রেতারা, আবার বিক্রেতারাও বলছেন এতে প্রতারণা ও ঝামেলা কমছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং ক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক হাটে ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিন বসানো হচ্ছে, যেখানে গরুর ওজন অনুযায়ী নির্ধারিত দরে দাম ধরা হচ্ছে। এতে দর কষাকষির ঝামেলা কমে যাচ্ছে এবং প্রতারণার সুযোগও অনেক অংশে কমছে।

আরো পড়ুন:

অন্যদিকে, খামারিরাও এই পদ্ধতিতে পশু বেচাকেনায় স্বস্তি পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে তারা তাদের পশুর প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেন। আগে অনেক সময় দালালদের কারণে সঠিক দাম পাওয়া যেত না, কিন্তু এখন ওজন অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ হওয়ায় সেই সমস্যা কমেছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচ উপজেলায় গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার খামার রয়েছে ৫ হাজার ৬৪২টি। এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৯৫ হাজার ৪৩৬টি পশু। এর মধ্যে ষাঁড় গরু ৩২ হাজার ২২২টি, বলদ ৭ হাজার ৭৩৩টি, গাভী ১৪ হাজার ৬৭০টি, মহিষ ১৭১টি, ছাগল ৩৯ হাজার ৬৩৫টি, ভেড়া ৯৫১টি ও অন্যান্য ৫৩টি পশু রয়েছে।

জেলার সদর উপজেলার বিসমিল্লাহ এগ্রো ফার্মে গিয়ে দেখা যায়, খামারের সামনে সকাল থেকেই ক্রেতাদের ভিড়। কেউ গরু দেখছেন, কেউ আবার ওজন মাপার মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে দর যাচাই করছেন। খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, ছোট-বড় সব ধরনের গরুই লাইভ ওয়েটে বিক্রি হচ্ছে। পশুর ওজন অনুযায়ী দাম পরিশোধ করছেন ক্রেতারা।

খামারের পরিচালক ও চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম বলেন, “গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে কেজিদরে গরু বিক্রি শুরু করেছিলাম। তখন ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাই। এবার আরও বেশি পশু প্রস্তুত করেছি। এরইমধ্যে অর্ধেক গরু বিক্রি হয়ে গেছে।”

খামারের কর্ণধার শামিম আহমেদ বলেন, “অনেক মানুষ গরুর বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ না হওয়ায় প্রতারিত হন। তাই আমরা স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ওজন অনুযায়ী পশু বিক্রি করছি। এতে ক্রেতারা যেমন নিশ্চিন্ত থাকছেন, আমরাও সঠিক মূল্য পাচ্ছি।"

শুধু বিসমিল্লাহ এগ্রো ফার্ম নয়, জেলার রানীশংকৈল উপজেলার “নূর এগ্রো”, বালিয়াডাঙ্গীর “মদিনা লাইভস্টক” ও সদর উপজেলার “সানরাইজ ক্যাটল ফার্মেও কেজিদরে পশু বিক্রি করা হচ্ছে। এসব খামারে দেশি ফ্রিজিয়ান, শাহীওয়াল, সিন্ধি ও দেশি জাতের গরুর পাশাপাশি মহিষও রয়েছে।

নূর এগ্রোর মালিক আব্দুল কাদের বলেন, “আগে ক্রেতাদের সাথে দরদাম নিয়ে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হতো। এখন ওজন অনুযায়ী দাম নেওয়ায় কেউ ঠকছে না। এতে আমাদের বিক্রিও বেড়েছে।”

মদিনা লাইভস্টকের খামারি মশিউর রহমান বলেন, “অনেক ক্রেতা ঢাকা, রাজশাহী ও বগুড়া থেকেও আসছেন। কেউ কেউ আগাম বুকিং দিয়ে যাচ্ছেন। লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে গরু কেনা এখন অনেকের কাছে আধুনিক ও নিরাপদ মনে হচ্ছে।”

ক্রেতারাও এই পদ্ধতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঠাকুরগাঁও রোড এলাকার বাসিন্দা রতন তালুকদার বলেন, “আমরা তো সারা বছর গরু কেনাবেচার সাথে জড়িত থাকি না। কোরবানির সময় বাজারে গিয়ে অনেক সময় বুঝতে পারি না কোন গরুর দাম ঠিক কত হওয়া উচিত। তাই কেজিদরে কিনলে ঠকে যাওয়ার ভয় কম থাকে।”

ইসলামনগর থেকে গরু কিনতে আসা ইকবাল হোসেন বলেন, “আমি দুইটা গরু কিনেছি। সাইজ দেখে পছন্দ করেছি, পরে ওজন করে দাম দিয়েছি। দরকষাকষির ঝামেলা নেই, তাই বিষয়টা অনেক সহজ হয়েছে।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান পীরগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী আবু সাঈদ। তিনি বলেন, “বাজারে গেলে একেকজন একেক দাম বলে। কিন্তু এখানে ডিজিটাল ওজনে মেপে দাম নেওয়া হচ্ছে। এতে স্বচ্ছতা আছে।”

খামারিরা বলছেন, পশুর খাবার, ওষুধ ও পরিচর্যার খরচ বেড়ে গেলেও তারা ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই দাম রাখার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে দেশি জাতের গরুর প্রতি এবার ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ইজাহার আহমেদ খান জানান, “জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতেও পশু পাঠানো সম্ভব হবে। পশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খামারগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।”

তিনি আরো বলেন, “লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পশু বিক্রি করলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই স্বচ্ছতা থাকে। এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।”

কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ের খামারগুলো। আর নতুন এই কেজিদরে পশু বিক্রির পদ্ধতি ক্রেতাদের কাছে আস্থা তৈরি করায় ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ঢাকা/হিমেল/ইভা 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়