কৃষিপণ্যে সাজানো তোরণ, প্রধান অতিথিকে বরণ মানকচু দিয়ে
পাবনা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলামকে মানকচু দিয়ে বরণ করছেন এক কৃষক।
ফুলের বদলে তোরণটি সাজানো হয়েছে নানা রকমের কৃষিপণ্য দিয়ে। এর ডান পাশে সারি সারি কলাগাছে ঝুলছে কাঁদি, ঝুলছে আম, ভুট্টা, বেগুন, লাউসহ বিভিন্ন ফল আর সবজি। দুই পাশ দিয়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন কৃষিপণ্য। রয়েছে বিভিন্ন ফসলের বীজও।
সেখানে মহিষের গাড়ি থেকে নামলেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। হাতে মানকচু তুলে দিয়ে তাকে বরণ করলেন একজন কৃষক। ফিতা কেটে নয়, ধান কাটা কাঁচি দিয়ে কলাগাছের একটি শুকনো ডাগুর কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন প্রধান অতিথি।
এমনই ব্যতিক্রমী ও নজড়কাড়া আয়োজনের নাম ‘কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়’। সোমবার (১১ মে) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পতিরাজপুর এলাকায়।
বাংলাদেশ কৃষক সমিতির আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০০ কিষান-কিষানি উপস্থিত ছিলেন। তারা কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, তা অতিথিদের সামনে তুলে ধরেন এবং সমাধানের প্রতিশ্রুতি আদায় করেন।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম পতিরাজপুর রেলগেট থেকে তালেব জোয়ারদারের মৎস্য খামার পর্যন্ত মহিষের গাড়িতে করে অনুষ্ঠান স্থলে যান। অন্য অতিথিদের মধ্যে ছিলেন- পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম পাটোয়ারী, সহকারী পুলিশ সুপার প্রণব কুমার, ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব।
অনুষ্ঠানের তোরণ সাজানো হয় বিভিন্ন কৃষিপণ্য দিয়ে। সোমবার দুপুরে পাবনার ঈশ্বরদীর পতিরাজপুর গ্রামে
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ওরফে কুল ময়েজ অতিথিদের কাছে ঈশ্বরদীর কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এক মাসের মধ্যে লিচু বাজারে উঠবে। লিচু পরিবহনের জন্য তিন চাকার যানবাহনই তাদের একমাত্র ভরসা, যা হাইওয়েতে নিষিদ্ধ।”
লিচু পরিবহনের জন্য অন্তত ১৫ দিনের জন্য হলেও এই যানবাহন চলাচলের ব্যাপারে ছাড় দেওয়ার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি তিনি কীটনাশকের মান যাচাই করে বাজারে ছাড়ার দাবি জানান।
কৃষি খাতে সরকারি প্রণোদনার বিষয়ে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “এক কেজি শর্ষে বীজ আর সারের জন্য ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। তার জন্য কৃষককে তিনদিন উপজেলায় ঘুরতে হয়। এরপর শর্ষে হলো কি না, কেউ আর খোঁজ নেন না।” এই জন্য সরকারকে তিনি প্রণোদনার পদ্ধতি পরিবর্তন করার পরামর্শ দেন।
কৃষকদের জন্য ফসলভিত্তিক বিশেষ ঋণের ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “এক কেজি পেঁয়াজের বীজের দাম পাঁচ হাজার টাকা। চাষ করতে আরো ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। তখনই কৃষককে বিভিন্ন এনজিওর কাছে ঋণের জন্য ধরণা দিতে হয়। পরের সপ্তাহ থেকেই এনজিওর লোকজন বাড়িতে কিস্তির জন্য আসে। এরপর পেঁয়াজের দাম পায় না কৃষক। ঋণও আর পরিশোধ করতে পারে না।”
কৃষকের জন্য ঝুঁকি ভাতা দাবি করে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “কৃষককে সাপে কামড় দেয়, স্থানীয়ভাবে কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে যেতে পথে কৃষক মারা যান। এটা হতে পারে না। সব জায়গায় ভ্যাকসিনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”
কৃষকদের ডেটাবেজ তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “২৩০ জন সংসদ সদস্য তাদের পেশা কৃষি লিখেছিলেন। এখন চিত্রনায়ক, নায়িকা থেকে শুরু করে অনেকেই পেশা লেখেন কৃষি। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে কতজন কৃষিকাজ করেন, এর পরিসংখ্যান জানা দরকার। কারা সত্যিকারের কৃষক, সেটি জাতিকে জানাতে হবে।”
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম কৃষিপণ্য দিয়ে তৈরি তোরণ দেখে কৃষকদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করে বলেন, “ঈশ্বরদীর কৃষকরাই দেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটাবেন।” তিনি কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা শুনে সমাধানের আশ্বাস দেন।
ঢাকা/শাহীন/মাসুদ