মা ছেলের একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা, লালপুরে আলোচনায় ফুলঝুড়ি বেগম
নাটোর প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ডানে ফুলঝুড়ি বেগম, বামে ছেলে মনিরুল ইসলাম
সংসারের চাপে থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। সপ্তম শ্রেণির গণ্ডি পেরোনোর আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় ফুলঝুড়ি বেগমকে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৯ বছর। কিন্তু মনের ভেতরে লালিত শিক্ষার স্বপ্ন মুছে যায়নি। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছেন নাটোরের লালপুর উপজেলার গৃহিণী ফুলঝুড়ি বেগম। এবার তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ছেলের সঙ্গে একই কেন্দ্রে। একই প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা দিচ্ছেন দুজন। মা-ছেলের একসঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফুলঝুড়ি বেগম নাটোরের লালপুর উপজেলার নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ও তার ছেলে মনিরুল ইসলাম মোহরকয়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার ট্রেডের শিক্ষার্থী। উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে তারা একসঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন মা-ছেলেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করত। কখনো ছেলে মাকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো মা ছেলের সঙ্গে বসে অনুশীলন করছেন। এমন দৃশ্য এলাকায় অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালে পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার কারণে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালেই ফুলঝুড়ি বেগমের বিয়ে হয়। এরপর সংসার, সন্তান লালন-পালন ও অভাব-অনটনের কারণে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কমেনি। সন্তানদের পড়াশোনা করাতে গিয়ে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নপূরণে তিনি উদ্যোগী হন। বিশেষ করে ছেলে মনিরুল ইসলামের উৎসাহে নতুন করে বই হাতে তুলে নেন তিনি।
ফুলঝুড়ি বেগম বলেন, “সংসারের নানা কারণে সপ্তম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। কিন্তু পড়ার ইচ্ছাটা সবসময় ছিল। ছেলের পড়াশোনা দেখতে গিয়ে আবারও সাহস পাই। পরে ছেলের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হই। প্রথমদিকে একটু লজ্জা লাগলেও শিক্ষক ও পরিবারের সহযোগিতায় এগিয়ে যেতে পেরেছি। এখন ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারছি—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকেই মনে করেন বয়স হয়ে গেলে আর পড়াশোনা করা যায় না। আমি বলতে চাই, ইচ্ছা থাকলে যে কোনো বয়সেই শিক্ষা অর্জন সম্ভব। মেয়েদের বিয়ের পরও পড়াশোনা বন্ধ হওয়া উচিত নয়।”
মনিরুল ইসলাম মায়ের এই সাহসী উদ্যোগে ভীষণ গর্বিত। তিনি বলেন, “মা শুধু আমার মা নন, তিনি এখন আমার সহপাঠীও। আমরা একসঙ্গে ক্লাস করেছি, পড়েছি এবং এখন একসঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছি। বন্ধুরা বিষয়টি জেনে অবাক হয়েছে। আমি চাই মা ভালো ফল করুক।”
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল নয়। ফুলঝুড়ি বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম ভ্যান চালানোর পাশাপাশি গরু-ছাগল পালন করে সংসার চালান। সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বড় মেয়েকে নার্সিং পড়িয়েছেন, বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করছেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, “অভাবের সংসার হলেও আমি সবসময় চেয়েছি আমার সন্তানরা লেখাপড়া শিখুক। স্ত্রীও আবার পড়াশোনা শুরু করতে চেয়েছিল। আমি তাকে বাধা দিইনি। এখন স্ত্রী আর ছেলে একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে—এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তাহানুর ইসলাম বলেন, “শিক্ষা গ্রহণে বয়স কোনো বাধা নয়—ফুলঝুড়ি বেগম সেটিই বাস্তবে প্রমাণ করেছেন। একজন মা তার সন্তানকে অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি নিজেও শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। এটি সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।”
“বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী সামান্য কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। সেখানে একজন গৃহিণী দীর্ঘ ২৯ বছর পর আবার শিক্ষাজীবনে ফিরে এসে পরীক্ষা দিচ্ছেন—এটি সত্যিই প্রশংসনীয়,” বলেন তিনি।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন বলেন, “এটি শুধু লালপুর নয়, সারা দেশের জন্য নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় উদাহরণ। বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না। ফুলঝুড়ি বেগম প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে সবই সম্ভব। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, মা-ছেলের এই ঘটনা সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে যেসব নারী নানা কারণে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি, তাদের জন্য এটি নতুন করে স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।
ঢাকা/আরিফুল//
ঈদুল আজহায় ছুটি ৭ দিন, প্রজ্ঞাপন জারি