মা-বাবা ও শিশুর লাশ উদ্ধার
চিকিৎসার খরচ জোগাতে ঋণ, হতাশা থেকে ট্র্যাজিডি
মাদারীপুর প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
মাদারীপুর শহরের একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে মা, বাবা ও আট মাসের শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের পর জানা যাচ্ছে করুণ গল্প। প্রেমের সম্পর্ককে পরিণতি দিতে ধর্ম ত্যাগ করে চিন্ময় শিকদারকে বিয়ে করেছিলেন ইসরাত জাহান সাউদা। তবে, ভালোবাসার সেই সংসার শেষ পর্যন্ত থেমে গেল তিনটি লাশ উদ্ধারের মধ্যে দিয়ে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বিপুল চিকিৎসা ব্যয়, ঋণের বোঝা ও তীব্র মানসিক হতাশা থেকেই এ ট্র্যাজিডি। স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর চিন্ময় তার আট মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকার মৃত বীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী সান্তনা রানীর বাসায় সাড়ে তিন বছর ধরে ভাড়া থাকতেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব কলাগাছিয়া এলাকার যতিন শিকদারের স্ত্রী মিষ্টি। গত রবিবার বিকেলে যতিনের প্রথম স্ত্রীর ছেলে চিন্ময় শিকদার তার স্ত্রী ইসরাত জাহান সাউদা ও আট মাসের কন্যাসন্তানকে নিয়ে ঢাকা থেকে মাদারীপুরে আসেন এবং সৎ মা মিষ্টির বাসায় ওঠেন।
রবিবার রাতে খাবার খাওয়ার পর চিন্ময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। গভীর রাত পর্যন্ত ওই ঘর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে মিষ্টি জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ‘৯৯৯’-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে সোমবার ভোরে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে কক্ষটি থেকে মা-বাবা ও শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ঢাকার উত্তরায় একটি স্কুলে পড়ার সময় নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা গ্রামের এরশাদ মিয়ার মেয়ে ইসরাত জাহান সাউদার সঙ্গে চিন্ময় শিকদারের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পরিবারের অমতে ইসরাত ধর্ম পরিবর্তন করে চিন্ময়কে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তার নাম রাখা হয় ‘ইশা’। শুরুতে তাদের সংসার সুখে কাটলেও কিছুদিন পরই পরিবারটিতে নেমে আসে অভাব ও অশান্তি।
মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, ইশা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। কয়েক দিন আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল।
চিন্ময় শিকদারের চাচি জানিয়েছেন, আইসিইউতে থাকা অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হতো। ইশার চিকিৎসার পেছনে সব মিলিয়ে প্রায় ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করেন চিন্ময়। বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
চিন্ময়ের চাচি আরো জানান, বিয়ের পর দুই পরিবার বিষয়টি মেনে নিলেও ইশার বাবা-মা মাদারীপুরে খুব একটা আসতেন না, মূলত মোবাইল ফোনেই যোগাযোগ রাখতেন।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক ভাবনা বলেছেন, “ঋণের বোঝা ও হতাশা থেকে প্রথমে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন চিন্ময়। পরে আট মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, প্রকৃত ঘটনা জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মূল বিষয় জানা যাবে।”
মাদারীপুর সদর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, “ইসরাত জাহান সাউদা ধর্মান্তরিত হয়ে চিন্ময়কে বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রীর চিকিৎসার খরচের কারণে চিন্ময় তীব্র হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই হতাশা থেকেই স্ত্রীকে হত্যার পর তিনি সন্তানসহ আত্মহত্যা করেছেন। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।”
ঢাকা/বেলাল/রফিক