ঢাকা     রোববার   ৩১ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪৩৩ || ১৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

কালীগঞ্জে সৌদি অতিথির হৃদয়জয়ী সফর

গাজীপুর (পূর্ব) প্রতিনিধি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৫৬, ৩১ মে ২০২৬   আপডেট: ১১:০০, ৩১ মে ২০২৬
কালীগঞ্জে সৌদি অতিথির হৃদয়জয়ী সফর

কখনো কখনো একটি সফর শুধু ভ্রমণের সীমারেখায় থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষে মানুষে সম্পর্কের এক জীবন্ত গল্প। দূর দেশের একজন মানুষ যখন হাজার মাইল পথ পেরিয়ে বন্ধুর ডাকে ছুটে আসেন, তখন সেটি আর নিছক অতিথি আগমন নয়; বরং বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং আন্তরিকতার এক অনন্য অধ্যায় হয়ে ওঠে।

গাজীপুরের কালীগঞ্জে শনিবারের (৩০ মে) সকালটা ছিল ঠিক তেমনই এক গল্পের সাক্ষী।

আরো পড়ুন:

একদিন আগে, শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে জাঙ্গালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হঠাৎ করেই মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে। মাঠের চারপাশে উৎসুক চোখ, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের কৌতূহল- সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আকাশ। কিছুক্ষণ পর হেলিকপ্টারের শব্দ ভেসে আসতেই যেন পুরো এলাকা প্রাণ ফিরে পায়। ধীরে ধীরে মাঠে অবতরণ করেন সৌদি আরবের নাগরিক আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি।

গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এমন দৃশ্য বিরল। তাই মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। তবে হেলিকপ্টারের চাকচিক্যের চেয়েও স্থানীয়দের বেশি মুগ্ধ করেছে তার এই আগমনের পেছনের গল্পটি- যা হলো নিছকই গভীর বন্ধুত্ব।

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি ইসমাঈল হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের টানেই সাত দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন আব্দুর রহমান। সফরকালে তিনি কোনো অভিজাত হোটেলে নয়, বরং পরিবারের একজন সদস্যের মতো জায়গা করে নেন বন্ধু ইসমাঈলের গ্রামের বাড়িতে।

পরদিন সকাল থেকেই শুরু হয় তার কালীগঞ্জ ভ্রমণ।

মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামের দেলোয়ার হোসেন শেখ, জামালপুর ইউনিয়নের আশাদুল্লাহ এবং বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের নুর ইসলামের বাড়িতে একে একে যান তিনি। প্রতিটি বাড়িতে তাকে ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। কোথাও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা, কোথাও তোরণ নির্মাণ, আবার কোথাও শুধু আন্তরিক হাসিমাখা মুখ। অতিথিকে বরণ করে নিতে কারো যেন কোনো কমতি ছিল না।

গ্রামবাংলার আতিথেয়তার ঐতিহ্যও ধরা পড়ে পুরো আয়োজনজুড়ে। ডাবের পানি, কলা, আপেল, কমলা থেকে শুরু করে মৌসুমি ফল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ও তালের শাঁস-সবকিছু দিয়েই আপ্যায়ন করা হয় তাকে।

তবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হন দুপুরের খাবারের আয়োজনে।

দেলোয়ার হোসেন শেখের বাড়িতে তার জন্য পরিবেশন করা হয় দেশীয় নানা স্বাদের খাবার। টেংরা, শিং, কৈ, মলা, পুঁটি ও চিংড়ি মাছের সঙ্গে ছিল দেশি মুরগি, খাসি এবং গরুর মাংস। বাংলাদেশের গ্রামীণ রান্নার স্বাদ যেন একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল সেই ভোজে।

খাবার শেষে অপেক্ষা করছিল আরেকটি বিশেষ অভিজ্ঞতা।

বাড়ির পাশের একটি লিচুবাগানে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে গাছ থেকে নিজ হাতে লিচু পেড়ে খাওয়ার আনন্দে যেন শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস ফিরে আসে তার মধ্যে। বারবার চারপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখছিলেন, ছবি তুলছিলেন, আর স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করছিলেন। গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও মানুষের ভালোবাসা যে তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, তা তার হাসিতেই স্পষ্ট ছিল।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি বলেন, “বন্ধু ইসমাঈল হোসেনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছি। বাংলাদেশ সম্পর্কে যতটা ধারণা ছিল, বাস্তবে এসে দেখলাম দেশটি তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। এখানকার মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক ও অতিথিপরায়ণ। বন্ধুর বাড়িতে এসে কখনো মনে হয়নি আমি বিদেশে আছি। মনে হয়েছে আমি নিজের পরিবারের মাঝেই আছি। বাংলাদেশের প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। সুযোগ পেলে আবারো এখানে আসতে চাই।”

তিনি আরো বলেন, “হেলিকপ্টারে মাঠে অবতরণের মুহূর্তটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।”

এই সফর আনন্দ এনে দিয়েছে সৌদি প্রবাসীদের পরিবারগুলোর মাঝেও।

দেলোয়ার হোসেন শেখের পিতা বরুজ শেখ বলেন, “আমার দুই ছেলে এবং মেয়ের জামাই সৌদি আরবে থাকেন। আমাদের বাড়িতে সৌদি আরব থেকে একজন অতিথি এসেছেন-এটি আমাদের জন্য গর্ব ও আনন্দের বিষয়।”

তবে সফরটি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ বা পারিবারিক আড্ডাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

শনিবার বিকেলে জাঙ্গালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জাঙ্গালিয়া জায়ান্টস ক্লাব আয়োজিত দেড় লাখ টাকা পুরস্কারের ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর জজ কোর্টের এপিপি গাজী শাহ মোহতাশেম আজমল সোহেল। উদ্বোধন করেন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মোল্লা।

দিনের শেষভাগে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ফাইনাল ম্যাচে ট্রাইব্রেকারে পুবাইল বাজার স্পোর্টিং ক্লাবকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় পিরুজালী ফুটবল একাদশ। দলের গোলরক্ষক তুহিন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। প্রধান অতিথি তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

সফরের পরবর্তী গন্তব্যও নির্ধারিত। আজ রবিবার (৩১ মে) সকালে কালীগঞ্জ থেকে কুমিল্লা এবং পরে সিলেটে দুই বন্ধুর বাড়ি সফর করবেন তিনি। এরপর আবার কালীগঞ্জে ফিরে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

কাগজে-কলমে এটি হয়তো একজন বিদেশি নাগরিকের সাধারণ ভ্রমণ, কিন্তু কালীগঞ্জের মানুষের হৃদয়ে এটি দীর্ঘকাল দাগ কেটে থাকবে মানুষে মানুষে ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে। এটি এমন এক গল্প, যেখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি আর হাজার মাইল দূরত্বও বন্ধুত্বের কাছে হার মেনে যায়।

ঢাকা/রফিক/ফিরোজ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়