নারীর বিয়ের আগের ঈদ, পরের ঈদের বিস্তর পার্থক্য
স্বরলিপি || রাইজিংবিডি.কম
নারীর জীবনে ঈদের রং সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। শৈশবের নির্ভার আনন্দ, বিয়ের পর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম, আর পরিণত বয়সে সংসারের দায়দায়িত্ব—সব মিলিয়ে ঈদের অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে ভিন্ন। কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিসের জীবনেও ঈদ উদযাপনের এই পরিবর্তন স্পষ্ট।
নাসিমা আনিসের বিয়ে হয়েছিল মাত্র আঠারো বছর বয়সে। তিনি বলেন, “একদম একটি পরিবেশে বড় হয়ে একেবারে আলাদা আরেকটি পরিবেশে গিয়ে পড়লাম। বিয়ের পরেই শুরু হলো নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।”
বিয়ের আগে তার ঈদ মানেই ছিল ঢাকার কলোনি জীবনের প্রাণবন্ত উৎসব। ১৯৭০-এর দশকের সেই ঈদের স্মৃতি এখনও তার কাছে উজ্জ্বল।
“ঈদে নতুন পোশাক পরে সবাইকে দেখানোর নির্মল আনন্দ ছিল। সমবয়সীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, হাসি-আনন্দে মেতে থাকা—সবকিছুই ছিল খুব চেনা আর আপন,” স্মৃতিচারণ করেন নাসিমা আনিস। কিন্তু বিয়ের পর সেই পরিচিত জগত বদলে যায়। ঢাকায় বেড়ে ওঠা নাসিমা আনিসের সংসার শুরু হয় চট্টগ্রামে। আর ঈদ করতে যেতে হতো শ্বশুরবাড়ি মেহেরপুরে।
শ্বশুরবাড়ির প্রথম ঈদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “সারাদিন ভীষণ মন খারাপ ছিল। বাড়িতে অনেক মানুষ, অনেক অতিথি, অনেক আয়োজন। কিন্তু আমি ছিলাম একা।” গ্রামের সেই বাড়িতে ছিল না বিদ্যুৎ। চারদিকে নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক, নতুন নিয়ম। যদিও শ্বশুরবাড়ির সবাই তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তবুও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অচেনা জায়গায় ঈদ উদযাপন তার জন্য সহজ ছিল না। “কলোনির বাইরে গ্রামে গিয়ে ঈদ করা—সেই অভিজ্ঞতায় মন খারাপ করেই দিন কেটেছিল,” বলেন নাসিমা আনিস।
৪৩ বছরের সংসারজীবনে নাসিমা আনিসের ঈদের রূপ আরও বদলেছে। এখন ঈদ মানেই তার কাছে আনন্দের পাশাপাশি অসংখ্য দায়িত্ব। তিনি বলেন, “নিজের সংসারে ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ঘরের কাজে স্বামীদের কোনো ভূমিকাই নেই। কী রান্না হবে, অতিথি আপ্যায়ন, কার কী পছন্দ—সবকিছুর দায়িত্ব আমার।’’
ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় ঘর গোছানোর ব্যস্ততা। পর্দা ধোয়া, বিছানার চাদর বদলানো, সোফার কভার পরিষ্কার করা—সবকিছুকে নিখুঁত করে তোলার তাড়া সব নারীরই থাকে। এরপর ঈদের দিন ভোর থেকে শুরু হয় রান্নাবান্না আর অতিথি আপ্যায়নের কাজ। “ঈদের দিন তো কোনো সাহায্যকারীও থাকে না। ফলে ঈদ মানেই একটা পেরেশানি। অতিথিদের আপ্যায়ন করতে হবে, তারা চলে গেলে আবার সব গুছিয়ে রাখতে হবে। তবুও এই যে এই উপলক্ষে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয় তাই ঈদ এলে মনে আনন্দ থাকে। সঙ্গে শারীরিক কষ্টও থাকে।’’
নির্ভার কিশোরীবেলার মতো আনন্দ আর ফিরে আসে না। ফেরার উপায় থাকে না অতীতের নিজের বাড়িতে। সেই বাড়ির বিপরীতে নারীর আরেকটি বাড়ি হয়, ঘর হয়, সংসার হয়। এই সব সামলে রাখার ভেতর দিয়ে আনন্দ খুঁজে নিতে শিখে যান এই সমাজের নারীরা।
নাসিমা আনিস যেমনটা বলছিলেন, ‘‘একটা সময় মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কষ্টের হলেও এর মধ্যেই আনন্দ আছে।’’ এখানেই গল্পের শেষ নয়, আরেকটু দূরে এগোতে হবে, যেখানে নারী ক্রমে একা হয়ে পড়েন। এই যে ঈদ মানেই নানা ব্যস্ততা, এই ব্যস্ততার একদিন ছন্দপতন হয়।
নাসিমা আনিস বলেন, ‘‘এবার একটু অসুস্থ। কাজের সাহায্যকারীরা বরাবরের মতো ছুটিতে চলে গেছে। গরুর মাংস ওভাবেই রেখে দিয়েছি। অন্য সময় হলে নানা পদ রান্না করতাম, কিছুই করতে পারিনি।’’ জীবনে চলার পথে ছন্দ হারিয়ে ছন্দ খুঁজে পাওয়া নারীরা এভাবেই একদিন ছন্দহীনতার মধ্যে পতিত হন। তবু ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়।
ঢাকা/তারা//
দেশে কোনো সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য থাকবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী