ঢাকা     সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪ ||  ফাল্গুন ২০ ১৪৩০

উৎসব আনন্দে একদিন

তানজিদ শুভ্র || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০১, ৩০ নভেম্বর ২০২৩  
উৎসব আনন্দে একদিন

গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ আঙিনা গত মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) দিনব্যাপী পিঠা উৎসব আর উদ্ভাবনী মেলায় মুখরিত ছিলো। মাঠের স্টলে যেমন ভীড় ছিলো, তেমনি পুকুর পাড় কিংবা জলছায়ায় ছিলো বন্ধু, সহপাঠী সবার আনন্দ মুখর আড্ডা। পিঠা উৎসব যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিলো।

কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও অনেক অভিভাবক, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষার্থীসহ অনেকেই ভীড় করেন এই আয়োজনে। কেউ এসেছেন একা আর কেউ বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে, কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে।

কথা ছিল দুদিন হবে আয়োজন; একদিন উদ্ভাবনী মেলা, আরেকদিন পিঠা উৎসব। অনিবার্য কারণবশত একদিনেই হলো দুই আয়োজন। দ্বিগুণ উৎসাহ উদ্দীপনায় শিক্ষার্থীদের সরব অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মতো।

আমার তত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত রোববার। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় যাওয়ার পর আনোয়ার স্যারের কল। পরদিন অর্থ্যাৎ সোমবার (২৭ নভেম্বর) সকাল সকাল বিভাগে উপস্থিত থেকে কাজ করতে হবে মঙ্গলবারের (২৮ নভেম্বর) পিঠা উৎসবের জন্য। সোমবার সকাল ১০টার পর উদ্ভিববিদ্যা বিভাগে পৌঁছে দেখলাম এক পাশে বড় আপুরা ব্যস্ত সময় পার করছিলেন সাজানোর জন্য রঙ্গিন কাগজ নিয়ে। কেউ কাগজ কেটে ফুল, ময়ূর, ঘুড়ি বানাচ্ছিলেন, আবার কেউ চরকিসহ নানান ডিজাইন তৈরি করছেন। অন্যদিকে উদ্ভাবনী মেলার জন্য প্রজেক্ট রেডি করা হচ্ছিলো। সঙ্গে ছিলেন মালিহা ম্যাম।

আমি যাওয়া মাত্রই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো রঙ কিনে আনতে। পিঠার পসরা বসাতে মাটির বাসনে রঙ করা হবে। যেমন কথা তেমন কাজ। রঙ কিনতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে বিভিন্ন দোকান ঘুরে নিয়ে আসি। এরপর মাটির পাত্রগুলো ধুয়ে ভবনের ছাদে নিয়ে গেলাম শুকাতে। প্রচন্ড রোদ, তাকানো দায়। এই রোদের মাঝেই ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে কলেজের অন্যতম অংশ দীঘির দিকে তাকিয়ে রইলাম। শুকিয়ে যাওয়ার পর সেসব নিয়ে ফিরলাম ডিপার্টমেন্টের এক রুমে। এরপর শুরু হলো আপুদের নিপুণ হাতে বিভিন্ন নকশা করার কাজ।

শুধু কি এসবেই হয়! আরও রঙিন কাগজ কেটে বেশ কয়েকটি জিনিসও বানিয়ে রাখা হলো। ওদিকে বাকি থাকা প্রজেক্টও গোছানো হয়েছে। এসব তালাবদ্ধ রুমে রেখে আপুরা বাসায় ফিরল মূল আকর্ষণ পিঠা বানানোর তাড়ায়। আর আমি আর তানিম ভাই আয়োজনের ব্যানার বানাতে গেলাম। সর্বাত্মক সহযোগিতায় ছিলেন বিভাগের প্রিয় মুখ আনোয়ার স্যার।

মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) সকাল। এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙেনি, নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে বের হয়ে, ব্যস্ত রাজধানীর যানজট পেড়িয়ে ডিপার্টমেন্টে পৌঁছাই সকাল ৯টার পর। ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই-আপুদের স্বতঃস্ফুর্ত প্রচেষ্টায় তখন স্টল সাজানোর কাজ চলছিল। আমিও যোগ দিলাম তাদের সঙ্গে। একদিকে রঙিন কাগজ, বেলুন আর ফুলে সজ্জিত হলো আমাদের স্টল আরেকদিকে সামনের দুই টেবিলের এক তেবিলে মাটির পাত্রে কলাপাতার মাঝে রূপ ছড়াচ্ছিল বাহারি ধরনের পিঠা পুলি।

প্রায় অর্ধ শতাধিক পিঠা শোভা পাচ্ছিল প্রদর্শনীতে। পাশের আরেক টেবিলেই ছিল আমাদের বিভাগের তিনটি প্রজেক্ট। সৌর শক্তি, জৈব বিচিত্র্য নিয়ে দুটো প্রজেক্টের পাশে দৃষ্টি কেড়েছে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্রিয়া কৌশল। প্রশংসিত হয় অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ বিচারকমণ্ডলীদের কাছেও।

কন্ট্রোল রুম সহ মাঠে মোট ২১টি স্টল বরাদ্ধ ছিলো। এতে অংশ নিয়েছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক (সম্মান), স্নাতক (পাশ) শ্রেণির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীসহ বিএনসিসি, রোভার ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা।

বাহারি নামের ভিন্ন ভিন্ন পিঠায় আকৃষ্ট হয়ে দর্শনার্থী ও ক্রেতার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। অতিরঞ্জিত কোনো অফার ছাড়াই সাশ্রয়ী মূল্য তালিকায় আস্থা ছিল আগতদের। বেলা গড়িয়ে দুপুর হতেই আমাদের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ‘কুহেলিকা’ স্টলের বিক্রি শেষের দিকে চলে যায়।

আমাদের স্টলের পাশাপাশি অন্যান্য স্টলেও বেচা-বিক্রি, দর্শনার্থীদের ভীড় ছিলো চোখে পড়ার মতো। মাঠের পূর্ব কোণে নজর কাড়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফটো ফ্রেম, ভীড় ছিল হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ফটো বুথেও। সব ডিপার্টমেন্টের স্টলে ছিলো নিজস্বতার শৈল্পিক ছোঁয়া। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করেছিল প্রাণীবিদ্যা বিভাগের ‘পরিবেশ বান্ধব ও আত্মনির্ভরশীল বাড়ি’ এবং কিডনির কার্যাবলী নিয়ে উপস্থাপন।

সকালের শুরুতে অধ্যক্ষ মহোদয়ের উদ্ভোধন করার মাধ্যমে শুরু হয় আয়োজন। অংশগ্রহণকারীদের পুরস্কার প্রাপ্তি অবধি ছিলো আনন্দ মুখর। সবার চোখে মুখের উচ্ছ্বাস, আনন্দ ছিলো দেখার মতো। আন্তরিকতায় আবদ্ধ করে রেখেছিলো সিনিয়র ভাইয়া-আপুরা আর সহপাঠী, বন্ধুরা। এখানে স্নাতক শ্রেণির সাপ্তাহিক ভিন্ন দিনে একেক শ্রেণির ক্লাস থাকায় এমন উৎসবে সিনিয়র-জুনিয়রদের মিলনমেলায় রূপ নিয়েছিল।

পিঠা পুলির ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে সামনের মানুষটির আগ্রহকে সম্মান জানিয়ে শেষে দেখা গেল, স্টলের ভেতরে থাকা সদস্যদের পিঠা খাওয়ারও সুযোগ হয়নি। এমনকি স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কোনো দলগত ছবিও নাই আমাদের স্টলে। আমরা হতাশ না হয়ে ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দলবদ্ধ ছবি তুলে আত্মতুষ্টি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। স্মৃতিতে দীর্ঘদিন মনে থাকুক এমন উৎসব মুখর দিন।

লেখক: শিক্ষার্থী, স্নাতক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ,  ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।

/মেহেদী/

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়