ঢাকা     রোববার   ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৩ ১৪৩৩ || ৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সাংবাদিকতায় পড়াশোনা: পেশায় অনীহা ৯০% শিক্ষার্থীর, কেন এই অনাগ্রহ

ফাহমিদুর রহমান ফাহিম, রাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৩৪, ২৬ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ১১:৩৯, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
সাংবাদিকতায় পড়াশোনা: পেশায় অনীহা ৯০% শিক্ষার্থীর, কেন এই অনাগ্রহ

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকতা, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। এটি কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং জনমত গঠন, সামাজিক পরিবর্তন এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশাব্যঞ্জক হলেও, শিক্ষাজীবন শেষে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিতে তারা দ্বিধাবোধ করেন বা অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান। এই বিভাগের শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা পেশায় নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু, এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতায় অনাগ্রহের কারণগুলো কি? এর পেছনে কি সামাজিক বাধা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, পারিবারিক চাপ, কর্মঘণ্টার দীর্ঘতা, নাকি পেশাগত চ্যালেঞ্জ কাজ করছে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আরো পড়ুন:

বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ মেধাবী শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের জায়গা হলেও, বাস্তব চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। এক সময়ের রোমাঞ্চকর এবং চ্যালেঞ্জিং এই পেশার প্রতি এখনকার শিক্ষার্থীদের আগ্রহে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, এই বিভাগে অধ্যয়নরত প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই স্নাতক শেষ করে সাংবাদিকতাকে নিজেদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছেন না। মূলত জীবনের ঝুঁকি, শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তাহীনতা এবং সেই তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বেতন কাঠামো এই বিমুখতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা বা সাইবার আইনের মতো আইনি জটিলতা এবং প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর বাইরে একটি বড় অংশ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই বিভাগে ভর্তি হন, যাদের মূল লক্ষ্য থাকে বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি চাকরি। সব মিলিয়ে পেশাদারিত্বের অভাব আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সাংবাদিকতা বিভাগকে মেধাবীদের কেবল একটি 'ট্রানজিট পয়েন্টে' পরিণত করেছে।

এ বিষয়ে কথা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের সাথে। তাদের মতে, সাংবাদিকতা বিভাগে পড়েও ৯০% শিক্ষার্থী সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিতে চান না। এর অন্যতম কারণ জীবনের ঝুকি, অনিরাপত্তা, বেতন কাঠামো, হয়রানি ইত্যাদি।

কথা হয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ফারজানা তন্নির সাথে। তিনি বলেন, “অনেকে মনে করেন সাংবাদিকতা একটা ইন্টারেস্টিং জব, এটা সত্য তবে যে যে কারণে এটাকে ইন্টারেস্টিং ধরা হয়, এর ভেতরের তথ্য জানলে সেটা আর থাকে না। আমি যেহেতু এটা নিয়ে পড়াশোনা করছি এবং নিয়মিত জানছি এ বিষয়ে। আমি যে যে কারণে এটাকে ইন্টারেস্টিং মনে করতাম, এখন সেটা আর মনে হয় না। এটা নানা কারণে হতে পারে। বাংলাদেশের পলিটিক্যাল কালচার, নিরাপত্তা, সাংবাদিকতার স্যালারি সবকিছু মিলিয়ে আমার ইন্টারেস্ট চলে গেছে।” 

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মোর্শেদ বলেন, “সাংবাদিকতা পেশাটা একটা খুবই ঝুকিপূর্ণ পেশা। কারণ যখন সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরা হবে, তখন যারা দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যাক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে যায় এবং তখনই একজন সাংবাদিক ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় পরে যায়। বাংলাদেশে এমন কোনো আইন নেই যেখানে কোনো সাংবাদিককে শারীরিক, মানসিকভাবে হেনস্তা করলে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া, এটার কোনো নির্ধারিত সময় নেই। বলতে গেলে ২৪ ঘন্টায় একজন সাংবাদিককে ব্যস্থ থাকতে হয়।”

চতুর্থ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী সাম্মি আক্তার জুথি বলেন, “একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে আমি মাঠে কাজ করেছি। সেখানে আমি দেখেছি নারীদেরকে একটু নেগলেক্ট করা হয়, অন্য নজরে দেখে। অনেক সময় মেয়ে সাংবাদিকদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সেও যে কাজ করতে পারে, তার যে যোগ্যতা আছে সেটাকে কেও দাম দিতে চাই না। এসবসহ আরো নানা কারণে আসলে মেয়েরা এসব পেশার প্রতি অনিহা প্রকাশ করছে। এছাড়া, স্যালারিটাও ঠিকমত পাওয়া যায় না। অনেকসময় ৩-৪ মাসের স্যালারি আটকে থাকে। যার কারণে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়েও সাংবাদিকতাকে তারা পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন না।”

মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইরফান তামিম বলেন, “আমাদের যে সিস্টেমটা এটাই আসল সমস্যা। এখানে যার সাংবাদিকতায় ইচ্ছা নেই তাকে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়তে হয় এবং যার ইচ্ছা আছে বা ছিলো সে নানা কারণে এ বিভাগে পড়তে পারে না। তাকে অন্য বিভাগে পড়তে হয়। যে জায়গায় যে যোগ্য আমরা তাকে সেখানে আনতে পারি না।  যার কারণে ব্যাক্তির কর্মদক্ষতা যেমন কমছে একই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাদিয়া হক বলেন, “বিভিন্ন বড় বড় হাউজে আমরা দেখি আমাদের সাংবাদিকতার যে অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড তা খুব একটা দরকার পড়ে না। যে কেও অন্যান্য বিভাগ থেকে পড়েও এখানে কাজ করতে পারে। এখানে যে সাংবাদিকতা নিয়ে যে ৪-৫ বছর পড়াশোনা করছে সেও সাংবাদিক আবার যে কখনো এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেনি সেও সাংবাদিকতা করছে। এত বছর একটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পরও যদি সেভাবে গুরুত্ব  না পাওয়া যায়, এজন্য অনেকে ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলে, সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পিছুপা হন।”

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের জিসান বলেন, “বাংলাদেশে সাংবাদিক পেশার যে ধারা চলে এসেছে যেখানে কোনো ধরণের ডিগ্রি লাগে না, পড়াশোনা লাগে না একটা মোবাইল আর বুম থাকলেই সে সাংবাদিক। যার ফলে দেখা যাচ্ছে সাংবাদিকতার সে মানটা নাই। এছাড়া, অনেকে এতবছর একটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পর সে মানের স্যালারি পাইনা। সেক্ষেত্রে অনেকে এটাকে পেশা হিসেবে নিতে চান না। তারা সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ে অন্যান্য চাকরিতে যোগদান করেন।”

এ বিষয়ে রাবি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন বকুল বলেন, “আমাদের বিভাগটা একটা মাল্টিডাইমেনশনাল সাবজেক্ট। এখানে সাংবাদিক ছাড়াও আরো নানা জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। এখানে যোগাযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে, জনসংযোগে কাজ করার সুযোগ আছে। এছাড়া, নানা ধরণের পেশায় যাওয়ার সুযোগ আছে। আমাদের বিভাগ থেকে সাংবাদিকতা বাদেও অন্যান্য পেশায় যারা যায় তারা অনেক ভালো করে। এখান থেকে যারা সাংবাদিকতায় গেছে তারাও অনেক ভালো করেছে।”

তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশের পরিপেক্ষিতে সাংবাদিকতা পেশাটা ঝুকিপূর্ণ। এই পেশাটা শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বেই ঝুকিপূর্ণ। এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে, এই ঝুকিটা যারা নিতে পারবে না তাদের জন্য এটা খুব একটা সুবিধাজনক হবে না। এখানে পেশাদারিত্বটা গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির নিরাপত্তা, ঝুকি, বেতন এগুলোকে পাশে রেখে সাংবাদিকতা করতে হবে। এটাকে শুধু পেশা বলা যাবে না এটা এক ধরনের দায়িত্ব। সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করতে হবে।”সাংবাদিকতা পেশার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যারা সাংবাদিকতায় আসবেন তাদেরকে এক ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই আসতে হবে। বর্তমান সময়ে অনলাইনের যুগে অনেক ভুঁইফোড় সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি অনেক ভালো ভালো সাংবাদিকও আছেন। এই পেশার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু আছে সেজন্য তারা করছেন। গত দুই তিন দশকে আমরা যা দেখছি তাতে মনে হয়েছে সাংবাদিকতা করার জন্য সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করা অত্যন্ত জরুরি।”

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়