ঢাকা     রোববার   ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৩ ১৪৩৩ || ৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

আত্মগোপনে থেকেও বেতন তুলছেন আওয়ামী লীগ নেতা-অধ্যক্ষ

লালমনিরহাট প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:২৮, ২৬ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ১০:৩২, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
আত্মগোপনে থেকেও বেতন তুলছেন আওয়ামী লীগ নেতা-অধ্যক্ষ

টানা প্রায় দুই বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক শরওয়ার আলম। তিনি আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি পলাতক থাকলেও রহস্যজনকভাবে তার বেতন চালু থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৭ সালে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনটি ‘তৃতীয় বিভাগ’ থাকা সত্ত্বেও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান শরওয়ার আলম। পরবর্তীতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে ২০১২ সালে অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রভাষক থেকে অধ্যক্ষ হতে ১২ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হলেও তিনি মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় পদটি দখল করেন। স্থানীয় ও শিক্ষকদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় ক্ষমতার দাপটে এসব অনিয়মকে কেউ চ্যালেঞ্জ করার সাহস পায়নি। প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ টাকার সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আরো পড়ুন:

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হলে শরওয়ার আলম প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দেন। তিনি জুলাই আন্দোলনের একাধিক হত্যা মামলার আসামি। গত বছরের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর অভিযোগ দেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তৎকালীন ইউএনও নূর-ই আলম সিদ্দিকী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী তিন মাস পর বরখাস্তের মেয়াদ শেষ হলে তিনি পুনরায় পূর্ণ বেতন পেতে শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে, বেতনের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘উৎকোচ’ দিয়ে তিনি এই সুবিধা নিচ্ছেন।

অধ্যক্ষ শরওয়ার আলমের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও অনিয়মের অন্ত নেই। ৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ও বর্তমানে গ্রেপ্তার হওয়া সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামানকে নিয়মিত বেতন প্রদান, প্রতিষ্ঠানের ইট ও খোয়া নিজের বাড়িতে পাচার এবং ফ্যান চুরির মামলা আপসের নামে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই বিশৃঙ্খলার কারণে প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। শিক্ষার্থী মাজেদুল জানান, “অধ্যক্ষ না এসেও বেতন পাচ্ছেন দেখে অন্য শিক্ষকরাও অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। দু-একটি ক্লাস ছাড়া আর কিছু হয় না।” 

অভিভাবক নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “সবাই এখন লুটেপুটে খেতে ব্যস্ত, পড়াশোনার দিকে কারো নজর নেই। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের মুখে।”

প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) তমিজার রহমান বলেন, “অধ্যক্ষ স্যার আন্দোলনের শুরু থেকেই নেই। আমরা জানিও না তিনি কোথায় আছেন। তদন্ত কমিটির ভয়েই হয়তো তিনি আসছেন না।”

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ইউএনও স্যারের নির্দেশে আমি বেতনের কাগজে সই করি। সরকার তাকে বেতন দিচ্ছে, তাই আমি দিচ্ছি।”

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, “ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতনের শিট প্রস্তুত করে দেন, আমি শুধু অনুমোদন করি। এখানে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেছেন, যা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঢাকা/সিপন/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়