ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৬ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ২ ১৪৩৩ || ১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ছোট হয়ে আসছে এস আলমের দুনিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৫২, ১৬ জুন ২০২৬   আপডেট: ২১:১৭, ১৬ জুন ২০২৬
ছোট হয়ে আসছে এস আলমের দুনিয়া

ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন

মোহাম্মদ সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, তার চারপাশের পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে আসছে। এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরীয় ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল, বহু-বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন- কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যার বেশিরভাগই পাচার করা অর্থের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মে মাসের মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে, একটি আদালত সাইপ্রাসে এস আলম ও তার স্ত্রীর যৌথ মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি জব্দ করে, বাংলাদেশের একটি আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেয়, এবং সিঙ্গাপুরের তদন্তকারীরা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যায়। এস আলমের সম্পদের পরিমাণ শুধুমাত্র সেই নগর রাষ্ট্রেই ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত) ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এখন এস আলম গ্রুপের সাথে যুক্ত কুয়ালালামপুরের দুটি বিশিষ্ট হোটেলের দিকেও নজর যাচ্ছে, যার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হলেন আলম।

সম্ভবত এস আলমের আন্তর্জাতিক পোর্টফোলিওর সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশগুলোর একটি কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে জালান সুলতান ইসমাইল এবং জালান আম্পাং-এর সংযোগস্থলে অবস্থিত — রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং সংলগ্ন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার।

একই জমির মালিকানায় অবস্থিত এই দুটি হোটেলের মালিক হলো ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি (পূর্বে কানালি লজিস্টিকস এসডিএন বিএইচডি), যা এস আলাম গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত বলে জানা যায়। ২০১৬ সালে, আইজিবি বিএইচডি (কেএল:আইজিবিবি), যা তখন আইজিবি কর্পোরেশন বিএইচডি নামে পরিচিত ছিল, মূল রেনেসাঁ হোটেল সম্পত্তিটি ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে বিক্রি করে দেয়।

ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের উপর একটি কোম্পানি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডি এই কোম্পানির ১০০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। অন্যদিকে, পরবর্তী কোম্পানিটির উপর অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, ওং ওয়াই চেওং, পু সিন ই এবং আরিভালাগন চোকালিঙ্গাম এর পরিচালক এবং এটি সিঙ্গাপুরের ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন। ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের উপর আরেকটি অনুসন্ধানে এর প্রধান কার্যকলাপ হিসেবে অ-আর্থিক এবং বীমা সম্পর্কিত কার্যকলাপে নিযুক্ত সংস্থাগুলোর জন্য একটি হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি এর শেয়ারহোল্ডার। চু কি শিয়ং এর পরিচালক হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং তিনি হিলড্রিক্স ক্যাপিটালের সিইও, নির্বাহী পরিচালক এবং প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তাও।

২১ মে তারিখের নথি অনুযায়ী, হিলড্রিক্স ক্যাপিটালের পোর্টফোলিওতে মালয়েশিয়ার রাবার কম্পাউন্ড প্রস্তুতকারক ও পরিবেশক জিআইআইবি হোল্ডিংস বারহাদ (কেএল:জিআইআইবি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ১-এর সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহায়ক সংস্থা এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) প্রাইভেট লিমিটেড। সংস্থাটি ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ অংশীদারিত্বের মালিক ছিল। পরবর্তীতে কিছু শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার পর সংস্থাটি আর উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার ছিল না। দুর্নীতির তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ভীতি প্রদর্শন, আইনিবিরোধ এবং আর্থিক ক্ষতিসহ একাধিক কারণে জিআইআইবি সংবাদ শিরোনামে রয়েছে। সম্প্রতি, ৪ মে জিআইআইবি-র শেয়ারের দাম এক সকালেই ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে বুরসা মালয়েশিয়া সংস্থাটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। 

মার্চ মাসে, হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি সিঙ্গাপুরের বিনোদন সংস্থা এমএমটু এশিয়া লিমিটেডের প্রধান উদ্ধারকারী বিনিয়োগকারী হিসেবে এগিয়ে আসে। সংস্থাটি এমএমটু এশিয়ার সাথে একটি টার্ম শিট স্বাক্ষর করে। এর আওতায় ১৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার (৪৭ মিলিয়ন রিঙ্গিত) মূল্যের শেয়ার প্লেসমেন্ট এবং ১০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ আন্ডাররাইটেড রাইটস ইস্যুর মাধ্যমে নতুন মূলধন বিনিয়োগ করা হবে। চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

এই পদক্ষেপটি এমন সময়ে নেওয়া হয় যখন এমএমটু এশিয়া—যারা কন্টেন্ট ও মিডিয়া প্রযোজনা এবং বিতরণের সাথে জড়িত এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ক্যাথি সিনেপ্লেক্সের মালিক—সিঙ্গাপুরের ইনসলভেন্সি, রিস্ট্রাকচারিং অ্যান্ড ডিসোলিউশন অ্যাক্টের অধীনে পুনর্গঠন সংক্রান্ত আদালত-অনুমোদিত স্থগিতাদেশের আওতায় পরিচালিত হচ্ছিল। ক্যাথি গত সেপ্টেম্বরে উভয় দেশেই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

এদিকে, ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কারের জন্য রেনেসাঁ হোটেলটি বন্ধ করে দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি মালয়েশিয়ায় ম্যারিয়টের প্রথম ডুয়াল-ব্র্যান্ডেড প্রপার্টি হিসেবে পুনরায় চালু হয়: ওয়েস্ট উইং-এ রেনেসাঁ এবং ইস্ট উইং-এ নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন। ম্যারিয়টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলোতে উভয় হোটেলই তাদের মালিক হিসেবে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের নাম উল্লেখ করে চলেছে।

এই পর্যায়ে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে, মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বা সম্পত্তিগুলোর ওপর কোনো ফ্রিজিং অর্ডার জারি করা হয়েছে। তবে, সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং জার্সি পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক তদন্তের ব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ একাধিক বিচারব্যবস্থায় সম্পদ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় গ্রুপটির সাথে যুক্ত মালয়েশীয় মালিকানাধীন সম্পদগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

এই সময়কালটি কূটনৈতিক রহস্যের এক চমকপ্রদ মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। জানা গেছে, বিদেশ সফরের প্রথম আমন্ত্রণটি এসেছিল ভারত থেকে, এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর কাছ থেকে আমন্ত্রণ আসে। গত সপ্তাহে নিশ্চিত হওয়া খবর অনুযায়ী, কুয়ালালামপুরে তার দুই দিনের এই সফরটি ২১ ও ২২ জুন অনুষ্ঠিত হবে এবং দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর

কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, এই সফর নিয়ে গত ২৪ মে বাংলাদেশের হাই কমিশন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। একই সপ্তাহে ১৯ মে সাইপ্রাস আলমের সম্পত্তি জব্দ করে। মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয় এবং ১ জুন আনোয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণটি নিশ্চিত করেন। যে আলোচ্য সূচিটি এখনো চূড়ান্ত করা হচ্ছে, তাতে অভিবাসন, শ্রম সমস্যা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষাগত সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী যে তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকেই বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ—কেএল-এর অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ একটি মোড়ে অবস্থিত ম্যারিয়ট ব্র্যান্ডের দুটি বিখ্যাত হোটেল রয়েছে, তা এমন একটি কাকতালীয় ঘটনা যা পর্যবেক্ষকরা সম্ভবত উপেক্ষা করবেন না।

এই সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আরেকটি অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের বাজার পুনরায় চালু করা। মালয়েশিয়ায় চাকরি নিশ্চিত করার জন্য শ্রমিকরা বিপুল পরিমাণ ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে। ফলে আধুনিক কালের ঋণ-দাসত্বের অসংখ্য প্রতিবেদনের পর ২০২৪ সাল থেকে এই বাজারটি বন্ধ রয়েছে।

২০২৩ সালে বিষয়টি চরমে ওঠে, যখন শ্রমিকরা প্রত্যেকে ৬ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করে মালয়েশিয়ায় এসে আবিষ্কার করেন যে নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া চাকরিগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। ২০২৪ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া যখন তার দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশী কর্মী, যারা এজেন্টকে অর্থ প্রদান করেছিল, তারা চাকরি হারায়।

নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কঠোর অভিযানের মধ্যে এই এজেন্টরা নিখোঁজ হয়ে গেছেন। এই এজেন্টরা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার, যেখানে রাজনীতিবিদ এবং নিয়োগকারী এজেন্টরা বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানি থেকে লাভবান হওয়ার জন্য হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করত।

একজন শ্রমশক্তি নির্বাহী বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে করিডোর খুলে দেওয়া তারেক রহমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক, কারণ প্রবাসী থেকে পাঠানো রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি।

ওই কর্মকর্তা ‘দ্য এজ’কে বলেন, “কিন্তু বাংলাদেশ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের বর্তমান ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে চায় না। তারা চায়, মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে নির্বাচিত হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ সীমাবদ্ধ না রেখে, মালয়েশীয় সরকার যেন বাংলাদেশের আরো বেশি কোম্পানির জন্য এই সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয়।”

এ প্রসঙ্গে, বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডির মাধ্যমে সরবরাহকৃত বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ‘ফরেন ওয়ার্কার সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’-এর অধীনে স্বীকৃত বর্তমান ১০২টি কোম্পানির তালিকার পরিবর্তে বাংলাদেশ সরকার ৪৩২টি নিয়োগকারী সংস্থাকে খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।

বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা হলেন দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম আবদুল নর। তিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক। শেখ হাসিনার পতনের পর, নতুন বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালে আমিনুল ও তার সহযোগী রুহুল আমিনের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। বিষয়টি এখনো সরকার-থেকে-সরকার পর্যায়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে বা অন্য কোনোভাবে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক অপরাধ সংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা, তা এখনো দেখার বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক স্পষ্টতই একটি উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যে দিয়ে চলছে, ঠিক এমন এক সময়ে যখন এস আলমের মালয়েশীয় মালিকানার ওপর নজরদারি এবং মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ শ্রম করিডোর খুলে দেওয়ার চাপ তীব্রতর হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ‘দ্য এজ’-কে জানিয়েছে, কুয়ালালামপুরের মোট ৯১৯টি কক্ষবিশিষ্ট দুটি হোটেল আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বিক্রির জন্য বাজারে তোলা না হলেও, কয়েক বছর আগে একটি নির্দিষ্ট দামের কথা ভাবা হয়েছিল। বিষয়টি একটি চুক্তিকে সম্ভব করে তুলতে পারত — দুটি সম্পত্তির জন্য ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত। বেশ কয়েকজন এজেন্ট জানিয়েছেন, এই দাম সম্ভবত অনেক বেশি এবং ৮৫০ মিলিয়ন থেকে ৯৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের মধ্যে একটি মূল্যায়ন আরো যুক্তিসঙ্গত হবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের শ্রম বাজারের ক্ষেত্রে, এজেন্টদের হাতে শত শত কোটি রিঙ্গিত যাচ্ছে বলে জানা গেছে, যদিও প্রকৃত নিয়োগ খরচ তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

মালয়েশিয়া ‘নিয়োগকর্তা-প্রদান’ নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় এর বাস্তবায়ন কঠিন রয়ে গেছে।

মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি রামানন রামকৃষ্ণন গ্রাম পর্যায়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের শোষণ নির্মূল করতে ‘তুরাপ’ নামে একটি নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছেন। তুরাপও বেস্টিনেটের একটি উদ্যোগ।

তবে, এটি বাংলাদেশে এবং মালয়েশিয়ার কিছু অংশীজনের মধ্যে সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। তারা এটিকে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন যার মাধ্যমে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ কয়েকটি কোম্পানির হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকবে।

বিশ্বব্যাপী নজরদারি আরো কঠোর হচ্ছে

১৯ মে, নিকোসিয়া জেলা আদালত সাইপ্রাসের পারেক্লিসিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন একটি দোতলা আবাসিক সম্পত্তির ওপর জব্দাদেশ জারি করে। বাংলাদেশের উদ্যোগে শুরু হওয়া পারস্পরিক আইনি সহায়তা পদ্ধতির অধীনে সাইপ্রাসের অর্থ পাচার প্রতিরোধ ইউনিট ‘মোকাস’-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ জারি করা হয়।

এই তদন্তে দেশ থেকে ৮ বিলিয়ন ইউরোর (৩৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত) বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে বলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে অভিযোগ রয়েছে- এস আলমের সাথে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো—যার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত। এস আলম গ্রুপ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়েছিল, যার মধ্যে অনেকগুলোই পরবর্তীতে খেলাপি হয়। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই অর্থ সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং জার্সিতে নিবন্ধিত কোম্পানি ও ট্রাস্টের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছিল কিনা।

এই তদন্তের একটি অংশে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত কোম্পানি অ্যাক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালও জড়িত, যেটি আলম ২০১৬ সালে অ্যাক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড কেনার মাধ্যমে অধিগ্রহণ করেছিলেন। আলম সেই বছরই ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ নামক বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রকল্পের মাধ্যমে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব লাভ করেন, যা পরবর্তীকালে সাইপ্রাস সরকার বন্ধ করে দেয়।

সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশের তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আলম এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম খতিয়ে দেখছেন। কুইন ইমানুয়েল আরকহার্ট অ্যান্ড সালিভান-এর নেতৃত্বে থাকা আলমের আন্তর্জাতিক আইনি দল কোনো ধরনের অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে যে তার বিনিয়োগগুলো বৈধ বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন করা হয়েছিল।

সাইপ্রাসে সম্পদ জব্দের আদেশের পরের দিন, বাংলাদেশের একটি আদালত আলমকে আরেকটি ধাক্কা দেয়। ২১ মে, চট্টগ্রাম মানি লন্ডারিং আদালত-১ এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ৮৪ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা (প্রায় ৬০ লক্ষ ইউরো) ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় আলম এবং তার স্ত্রী, পুত্র ও ভাইসহ ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের দেওয়ানি কারাদণ্ড দিয়েছেন। গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের কথিত ১৩৪টি বাস ক্রয়ের জন্য এই ঋণটি দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধনকুবেরকে দণ্ড দিল। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপ বিপুল আর্থিক ক্ষমতা অর্জন করেছিল। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে আলম ও তার পরিবারকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি এবং ধারণা করা হয় তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছেন।

১ বিলিয়ন ডলারের সিঙ্গাপুর সাম্রাজ্য এখন তদন্তের আওতায়

২০২৩ সালে আলম সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং দেশটি তার অফশোর হোল্ডিংগুলোর কেন্দ্রীয় কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশি তদন্তকারীরা অভিযোগ করেছেন, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে তহবিল স্থানান্তর বা বিনিয়োগ করে এই নগর রাষ্ট্রে হোটেল, বাড়ি, রিটেইল প্রপার্টি এবং কর্পোরেট শেয়ার অধিগ্রহণের মাধ্যমে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার মূল্যের একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।

পূর্ববর্তী সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আলমের সাথে সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি অধিগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ৩২৮ কক্ষের হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর, ১০০ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে লিটল ইন্ডিয়ার রিটেইল স্পেস এবং ২০১৯ সালে ১২৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে আইবিস নোভেনা।

এদিকে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার একটি আদালত আলমের ৪০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, তার স্ত্রীর ছয়টি অ্যাকাউন্ট এবং সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত আটটি কোম্পানির শেয়ার জব্দ করার আদেশ দেয়। তার ছেলে আশরাফুল ও আহসানুল আলম, শ্যালক আহমেদ বেলাল এবং বোন মাইমুনা খানমের সাথে যুক্ত অতিরিক্ত অ্যাকাউন্টগুলোও জব্দ করা হয়েছে। এই দম্পতির যৌথ মালিকানাধীন দুটি সিঙ্গাপুর কোম্পানিতে থাকা প্রায় ৬৮ লাখ সিঙ্গাপুীয় ডলারের বিনিয়োগও আটকে দেওয়া হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তাদের বাংলাদেশি প্রতিপক্ষ, বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি লিখে এস আলম গ্রুপের দেশীয় ও বৈদেশিক সম্পদের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে। বাংলাদেশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ আলাদাভাবে অভিযোগ করেছে, আলম বিদেশে প্রায় ১২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার পাচার করেছেন, যার মধ্যে কানালি লজিস্টিকস নামক একটি সিঙ্গাপু-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও অর্থ পাচার অন্তর্ভুক্ত, যা পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় তার রিয়েল এস্টেট সম্পদ অর্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আলমের সিঙ্গাপুরের আইনজীবী, ওং পার্টনারশিপ, বাংলাদেশের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছে এবং যুক্তি দিয়েছে যে সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়াটি ‘বেআইনি, স্বেচ্ছাচারী ও বৈষম্যমূলকভাবে’ চালানো হয়েছে এবং এটি বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

সমন্বিত পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে

ঘটনাপ্রবাহ—চট্টগ্রামে আদালতের রায়, নিকোসিয়ায় সম্পত্তি জব্দ এবং সিঙ্গাপুরে ক্রমবর্ধমান চাপ—বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের ভাষায় দেশের ইতিহাসে অন্যতম ব্যাপক আর্থিক অপরাধের একটির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ারই প্রতিফলন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটি জানায়, শেখ হাসিনা প্রশাসনের আমলে অর্থ পাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপসহ ১০টি প্রধান ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছ থেকে ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা (প্রায় ৬৮৩ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার) মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে তৈরি একটি শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়ে থাকতে পারে।

জানা গেছে, আলম ও তার পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য দুইবার আবেদন করেছেন। গত নভেম্বরে, বাংলাদেশের হাইকোর্ট প্রথম নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনটি গ্রহণ স্থগিত করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি নতুন আবেদন দাখিল করা হলেও পরবর্তীতে একটি স্থগিতাদেশের মাধ্যমে তা আটকে দেওয়া হয়, ফলে আলম পরিবার আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমতি দিলে তা কথিত পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার, দেশীয় সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ এবং চলমান আন্তর্জাতিক সালিশি কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান রক্ষার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

যে ব্যক্তি একসময় অন্তত পাঁচটি বাংলাদেশি ব্যাংক, একটি শিল্পগোষ্ঠী এবং কুয়ালালামপুর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক ঝলমলে হোটেল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন, তার কাছে পৃথিবীটা এখন অনেকটাই ছোট হয়ে আসছে।
 

ঢাকা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়