বিএসএফের পুশইন-চেষ্টা
শূন্যরেখায় ৬ মাসের শিশু, কোনো দেশ দায় নিচ্ছে না তার
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
দুই দেশের সীমান্তের মাঝে শূন্যরেখা। সেখানে নেই আহার-নিদ্রা এবং গোসল ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। দিনের বেলায় প্রচণ্ড রোদ। আছে বৃষ্টি-বজ্রপাতের আশঙ্কা। সেখানেই ছয় মাস ও আড়াই বছর বয়সী দুই শিশুকে নিয়ে টানা দুই দিন ধরে অবস্থান করছেন এক দম্পতি। তাদের সঙ্গে আছেন আরো দুই যুবক।
এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের কাছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রচণ্ড রোদে মাথার ওপর সামান্য প্লাস্টিকের ছাউনি টাঙিয়ে তার নিচে অবস্থান করছেন ওই ছয়জন। তাদের শরীরে ক্লান্তি, চোখে-মুখে বিষণ্নতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন-চেষ্টার শিকার ওই ছয়জনকে ১০৬০ আন্তর্জাতিক পিলার-সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় রাখা হয়েছে। এর সামান্য দূরে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া। সেই কাঁটাতারের বেড়ার পাশে ঝালুর চর বিএসএফ ক্যাম্প। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেশ দূরত্বে আছে খাল। আশপাশে নেই কোনো ঘর-বাড়ি বা দোকানপাট।
তাদের অবস্থান ঘিরে একদিকে বিএসএফ আর অন্যদিকে বিজিবি অস্ত্র হাতে দিচ্ছে পাহারা, যাতে তারা কোনো দেশে ঢুকতে না পারেন।
বিএসএফ মাঝে-মধ্যে তাদেরকে খাবার দিচ্ছে। দেখতে আসা গ্রামবাসী দু’-এক প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে আসছেন। এভাবেই খেয়ে না খেয়ে কাটছে তাদের সময়।
ছয় মাসের শিশুসহ পুশইনের শিকার ছয়জনকে দেখতে সারাদিনই ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু। টানা তিন ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ৬ মাসের শিশুকে এভাবে আটকে রাখায় হতবাক তারা।
গয়টাপাড়া সীমান্তের কাছের গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, “শিশু দুটির ওপর অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। শিশুরা তো কোনো পাপ করেনি। তাহলে কেন রোদ-বৃষ্টিতে তাকে পড়তে হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।” এ ঘটনার দ্রুত সমাধান করতে দুই দেশের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পুশইন-চেষ্টার সংবাদ সংগ্রহ করতে এসে গণমাধ্যমকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান তুহিন বলেন, “এটা মানবাধিকার লংঘন। ৬ মাসের শিশু পুশইনের শিকার হবে কেন? কেন তাকে দিনের পর দিন ফাকা মাঠে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে পড়ে থাকতে হবে। মানুষের বিবেক কোথায়?”
দুই দেশ বিষয়টি দ্রুত সমাধান না করলে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা কাঁটাতারের গেট খুলে ছয়জনকে পুশইন করার চেষ্টা চালায়। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি ও স্থানীয়রা বাধা দিলে তারা অবস্থান নেন শূন্যরেখায়।
গত রবিবার সকাল ৭টার দিকে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ৬ জন ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে ৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয়রা বাধা দেন। বাধার মুখে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ গজ ভেতরে সীমান্তের শূন্যরেখা লাগোয়া ভারতের অংশে অবস্থান নেন তারা।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত রবিবার দুপুরে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর থেকে গয়টাপাড়া, ভন্দুরচরসহ রৌমারী উপজেলা সীমান্তে সতর্ক অবস্থানের রয়েছে বিজিবি সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
গয়টাপাড়া বিওপির ক্যাম্পের হাবিলদার মাসুদ রানা বলেছেন, “যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।”
ঢাকা/বাদশাহ্/রফিক