মার্কিন-ইরান চুক্তিতে চাঙা শেয়ার বাজার, কমলো তেলের দাম
দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে। উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধের এই চুক্তি নিশ্চিত করার পরপরই বিশ্ববাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শেয়ার বাজারগুলোতে ব্যাপক উত্থান দেখা গেছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে এসেছে। খবর আল-জাজিরার।
সোমবার (১৫ জুন) সকালে লেনদেনের শুরুতেই জাপানের প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ এক লাফে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং তাইওয়ানের তাইএক্স ২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সূচকও প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। নিয়মিত বাজার সময়ের বাইরে থাকা মার্কিন স্টক ফিউচারগুলোতেও ১ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
এদিকে, বিশ্বব্যাপী তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩ দশমিক ৪০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
সোমবার (১৫ জুন) আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এএনজে-এর এশিয়া গবেষণা প্রধান কানুন গো বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহের শেষের দিকে চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার আভাস দেওয়ায় বাজারে আগেই কিছুটা স্বস্তির বাতাস শুরু হয়েছিল। তবে চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ বাজারে নতুন করে জোরালো গতি এনেছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “তেলের দাম কমে যাওয়াটা বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে, যারা এত দিন মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিল। এখন সবার নজর মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের দিকে, যারা এই সপ্তাহে সুদের হারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।”
রবিবার (১৪ জুন) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে এই শান্তিচুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। জাহাজ কোম্পানিগুলোর উদ্দেশ্যে ট্রাম্প লেখেন, “বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো! তেল প্রবাহিত হতে দিন!”
পরবর্তীতে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে ইরানের সংবাদ সংস্থা ‘মেহের’ জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং মার্কিন ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইরানি হামলা ও মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে গত চার মাস ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ছিল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর তথ্যমতে, এর ফলে বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি দেখা হয়েছিল। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং অনেক দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়।
চুক্তি সম্পন্ন হলেও, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন শিপিং বিশেষজ্ঞরা।
নরওয়েজিয়ান শিপওনার্স মিউচুয়াল ওয়ার রিস্কস ইন্সুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সভেইন রিংবাক্কেন জানান, হাজার হাজার জাহাজ এখনো এই জলপথ এবং এর আশেপাশে আটকা পড়ে আছে।
আল-জাজিরাকে রিংবাক্কেন বলেন, “পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করলেও এটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক মাস সময় লাগবে। ধারণক্ষমতার অভাবে অনেক পণ্যের উৎপাদন লাইন বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উৎপাদন কেন্দ্র এবং বন্দর অবকাঠামোর ক্ষতি।”
তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, “হরমুজ প্রণালিট খুলে দেওয়ার পর এসব কারণে পরিচালনগত ধীরগতি দেখা দেবে। সবশেষে, যদি সেখানে মাইন বিছানো হয়ে থাকে, তাহলে পুরোদমে জাহাজ চলাচল শুরুর আগে মাইন অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। আর এতেও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সেফসি গ্রুপের চেয়ারম্যান এসভি আনচান বলেন, এত কম তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই চুক্তি নিয়ে এখনই উল্লসিত হওয়া কঠিন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ‘এক বছরেরও বেশি’ সময় লাগতে পারে বলে তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন।
আনচান আল-জাজিরাকে বলেন, “আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো কিছুকে এখনই বিশ্বাস করা খুব কঠিন। আমরা দেখছি একটি শান্তি চুক্তি সই হয়েছে, কিন্তু কাগজে কী আছে আর বাস্তব পরিস্থিতি কী, তা আমাদের দেখতে হবে।”
তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, “তারা এই মাইনগুলো কীভাবে সরাবে? বিমাকারীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? আমাদের কাছে এটি এখনো শুধুই একটি খবর এবং আমরা খবরের মতোই এটি পর্যবেক্ষণ করব। আগামী দুই বা তিন দিনে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায়, তা আমরা দেখব।”
ঢাকা/ফিরোজ