ঢাকা     রোববার   ১৪ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪৩৩ || ২৯ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ত্রিপুরার এনসিপিতে মিশে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সংসদীয় ব্লক

কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৫২, ১৪ জুন ২০২৬   আপডেট: ২১:৫২, ১৪ জুন ২০২৬
ত্রিপুরার এনসিপিতে মিশে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সংসদীয় ব্লক

রাজনীতি যে চরম সম্ভাবনার খেলা এবং এখানে যে কোনো মুহূর্তে পাশার দান উল্টে যেতে পারে, তার আরো এক বড় প্রমাণ মিলল ভারতের রাজধানীতে। জল্পনা সত্যি করে ত্রিপুরার অপরিচিত রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনলিস্ট সিটিজেন পার্টির (NCP) সঙ্গে মিশে গেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ২২ জন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য।

রবিবার (১৪ জুন) বিকেল থেকে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলের ভাঙন ঘিরে টানটান নাটক শুরু হয় নয়া দিল্লিতে। একদিকে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে একজোট হয়ে বৈঠক করেন ‘বিদ্রোহী’ সদস্যরা ৷ ঠিক সেই সময় আইনি পদ্ধতিতে বিরোধীদের আলাদা ব্লকের স্বীকৃতি ঠেকাতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার ২০ নম্বর আকবর রোডের বাড়িতে অভিষেকের চিঠি নিয়ে পৌঁছান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আস্থা রাখা দুই সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ ও কীর্তি আজাদ ৷

এমন অবস্থায় সংসদে আলাদা ব্লক গঠনের ক্ষেত্রে নানা টেকনিক্যাল এবং আইনি সমস্যায় জড়ানোর সম্ভাবনা ছিল প্রবল।  সংসদে কোন দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদের উপস্থাপন করবেন বিক্ষুব্ধ শিবিরের সংসদ সদস্যরা, তাই নিয়েই দেখা যায় চরম বিভ্রান্তি। 

বিপত্তি এড়াতে শেষবেলায় নজিরবিহীন ও চমকপ্রদ কৌশল নেয় পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্যরা। খাতায়-কলমে তৃণমূলের টিকিটে জিতলেও, নিজেদের পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে  কোনো বড় জাতীয় দল নয়, বরং আইনি জটিলতা এড়াতে তারা দলবেঁধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মাত্র চার বছরের পুরোনো ত্রিপুরার এক প্রায় অপরিচিত আঞ্চলিক দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-তে।

দিল্লিতে বিজেপি শীর্ষনেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্যদেরর ম্যারাথন বৈঠকেই এনসিপিআই নেতৃত্বের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা সম্পন্ন করার পরেই যোগদানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। আপাতত ঠিক হয়েছে, লোকসভায় এই দলের সংসদ সদস্য হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেবেন তৃণমূলত্যাগীরা। যেহেতু এই মুহূর্তে ২৯ জনের মধ্যে ২২ জন সংসদ সদস্য একসঙ্গে দল ছাড়লেন, তাই সংসদের নিয়ম অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের ওপর ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ (Anti-Defection Law) কার্যকর হওয়ার কোনো আইনি সম্ভাবনা নেই।

রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সরকারি বাসভবনে হাজির হন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্যরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাসভবনে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে হাজির ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, অরূপ চক্রবর্তী, সায়নী ঘোষ, মালা রায়, বাপি হালদার এবং প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়।

বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও চমকপ্রদ বিষয় হল, সেখানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিজেপির প্রভাবশালী লোকসভা সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। ফলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিজেপির অন্দরের বোঝাপড়া যে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছে গিয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই বৈঠক থেকেই এই এনসিপি বিকল্প হিসেবে উঠে আসে।

কিন্তু হঠাৎ ত্রিপুরার এই ছোট দলের শরণাপন্ন কেন হতে হলো বিক্ষুব্ধদের? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে তৃণমূল শিবিরের এক বড়সড় আইনি চাল। রবিবার তৃণমূলের পক্ষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাগরিকা ঘোষের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন, যাতে এই বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্যদের ‘নতুন ব্লক’ হিসেবে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া না হয়। প্রয়োজনে তৃণমূল এই বিষয়ে আদালতের দরজায় কড়া নাড়বে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

চিঠিতে অভিষেক উল্লেখ করেছেন, “সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের কয়েকজন সংসদ সদস্য নিজেদের তৃণমূলের একটি পৃথক দল বা অংশ বলে স্বীকৃতি দাবি করে আপনার দপ্তরে চিঠি জমা দিয়েছেন বা দিতে চলেছেন ৷ আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, আপনি অনুগ্রহ করে এই নিবেদনটি নথিবদ্ধ করবেন;  এআইটিসি (AITC)-কে একটি একক রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করবেন— যার প্রতিনিধিত্ব শুধুমাত্র দলের অনুমোদিত নেতা ও হুইপের মাধ্যমেই সংসদে করা হয় এবং এআইটিসি-এর কোনো কথিত পৃথক গোষ্ঠী বা উপদলকে কোনো প্রকার স্বীকৃতি, মর্যাদা বা সুবিধা প্রদান থেকে বিরত থাকবেন; এবং উপরে উল্লিখিত কোনো বার্তা যদি আপনার কাছে তাহলে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের বক্তব্য শুনবেন ৷”

এই পরিস্থিতিতে স্পিকার যদি আইনি জটিলতার কারণে সরাসরি নতুন ব্লকের স্বীকৃতি দিতে দেরি করেন বা অস্বীকার করেন, তবে সংসদ সদস্য পদ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সেই চরম আইনি সংকট এড়াতেই তড়িঘড়ি কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের ছাতাতলায় আশ্রয় নিতে এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিলেন বিক্ষুব্ধরা। 
 

ঢাকা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়