হাঁসের বাচ্চায় স্বাবলম্বী যে গ্রাম
অদিত্য রাসেল, সিরাজগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
হাঁসের বাচ্চা।
একসময় দারিদ্র্য ও বেকারত্বে জর্জরিত ছিল সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের মহেশরৌহালী গ্রাম। জীবিকার সন্ধানে অনেককেই অন্যত্র ছুটতে হতো। সময়ের ব্যবধানে সেই গ্রামই আজ দেশের হাঁসশিল্পের এক সফল মডেলে পরিণত হয়েছে। এখন মহেশরৌহালী থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। এই শিল্প ঘিরেই বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম একটি হারিকেন ও ধানের তুষ ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটানোর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেন। শুরুতে অনেকেই বিষয়টিকে অবিশ্বাসের চোখে দেখলেও দীর্ঘ গবেষণা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি সফলতা অর্জন করেন। তার সেই উদ্যোগই পরবর্তীতে পুরো গ্রামের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে হারিকেন ও তুষের জায়গা দখল করেছে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটর। বর্তমানে মহেশরৌহালী গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২০টি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। খামারিদের দাবি, এসব হ্যাচারিতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে।
গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার এখন কোনো না কোনোভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন, পরিচর্যা ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ডিম সংগ্রহ, বাছাই, ইনকিউবেটর পরিচালনা, বাচ্চা পরিচর্যা এবং বাজারজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ফলে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনকারীরা সাধারণত একদিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা প্রতি পিস ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বড় খামারিদের কাছে বিক্রি করেন। তবে, খুচরা বাজারে একই বাচ্চার দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডিম উৎপাদনের জন্য জনপ্রিয় খাকি ক্যাম্পবেল ও ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার চাহিদা বেশি থাকায় এসব জাতের দাম তুলনামূলক বেশি। এছাড়া বর্ষাকাল ও শীত মৌসুমের শুরুতে চাহিদা বাড়ার কারণে বাজারে দামও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, “একসময় গ্রামের মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরাত। এখন প্রায় প্রতিটি পরিবার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবাই উৎপাদন ও সরবরাহের কাজে ব্যস্ত থাকেন।”
উদ্যোক্তা শাহ আলম বলেন, “শুরুটা ছিল খুবই কঠিন। মানুষ বিশ্বাসই করত না যে, কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়া সম্ভব। চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলেই আজ এই অবস্থানে পৌঁছানো গেছে।”
এই গ্রামের উৎপাদিত খাকি ক্যাম্পবেল, বেইজিং ও ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতিদিন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে আসেন। বিশেষ খাঁচায় প্যাকেটজাত করে দেশের প্রায় সব জেলায় সরবরাহ করা হয় এসব হাঁসের বাচ্চা।
সফল উদ্যোক্তাদের একজন জামাল উদ্দিন জানান, মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ছোট একটি ইনকিউবেটর দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দুটি বড় ইনকিউবেটর পরিচালনা করছেন। মাসে প্রায় ৩০ হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন।
আরেক উদ্যোক্তা আলম ফকির বলেন, একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডিম ইনকিউবেটরে রাখা হয়। পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করছি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ.কে.এম. আনোয়ারুল হক জানান, মহেশরৌহালীসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৬০০ খামার গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ মানুষ এখন হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করছে।
হাঁসের ডিম
তিনি বলেন, “স্বল্পসুদে ঋণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়ানো গেলে এই শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।”
একজন মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তা, সাহস ও নিরলস পরিশ্রম কীভাবে একটি গ্রামের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ মহেশরৌহালী। হারিকেনের ক্ষীণ আলো আর ধানের তুষের উষ্ণতায় শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের বিশাল শিল্পে রূপ নিয়েছে। কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির এক অনন্য মডেল হিসেবে দেশের সামনে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সিরাজগঞ্জের এই গ্রাম।
ঢাকা/মাসুদ