সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণে : হিলি টু হাওড়া
ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম
চলন্ত ট্রেন থেকে বাইরের দৃশ্য
ফেরদৌস জামান : ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছিলাম ভারতের কিছু প্রদেশ সমৃদ্ধির দিক দিয়ে খোদ ইউরোপের কোনো কোনো দেশের সমতুল্য। যার মধ্যে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ু অন্যতম। শিল্প, শিক্ষা, চিকিৎসা, আইটি ও অন্যান্য শাখায় ভারতের এ রাজ্যগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় খুব শক্তিশালী অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে কর্ণাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু ও তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাই (তৎকালীন মাদ্রাজ)।
ভারতের উন্নত এই জায়গা দুটি ভ্রমণ করে আসেন আমার মেজো ভাই। দেড়-দুই মাসের ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে সে কি বর্ণনা! বৃত্তান্ত শুনে যারপরনাই হিংসা হয়েছিল। কেন এত ছোট আমি, আর একটু বড় হলেই তো ভাইয়ের সঙ্গে যেতে পারতাম। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর ২০০৩ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ ভারতের দুই রাজ্য তামিলনাড়ু ও কর্নাটক যাওয়ার সুযোগ হয়। ব্যাঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবে পড়াশুনা শেষ করেছেন রেশাদ ভাই। শিক্ষা সনদ উত্তোলনে তিনি ব্যাঙ্গালুরু যাবেন। সুযোগ বুঝে তার সঙ্গে যাওয়ার জেদ ধরে বসি। বাড়ি থেকে মিলল সম্মতি। এপ্রিলের প্রচণ্ড গরমে একদিন রওয়ানা দিলাম। দিনাজপুরে হিলি স্থল বন্দরের কাস্টমস, ইমিগ্রেশনে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিকেলের মধ্যে সীমান্ত পার হয়ে চলে যাই ওপারে। ডলার ভাঙাতে উপস্থিত হই রেশাদ ভাইয়ের পরিচিত স্টলটায়। স্টলগুলোর সঙ্গে দালালদের মধুর যোগাযোগ।
হাওড়া ব্রিজ
উল্লেখ্য, সীমান্তে দালালদের শক্ত নেটওয়ার্ক তখনও ছিল। সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতা থেকে শুরু করে ডলার ভাঙানো এবং কলকাতার বাসে উঠিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সমস্ত দায়িত্ব তাদের। বেঞ্চে বসতে দিয়ে প্রথমে আমাদের জন্য চা বলা হল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন উটকো লোক নিকটে এসে বলে- কয়টা দেব দাদা? এক কাজ করি সেভন-আপের বোতলে ৪/৫টা ঢেলে দেই, রাস্তা তো বহুত একেবারে সারা রাত। তার কথার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না! আমার বোকা বনে যাওয়া চেহারা দেখে রেশাদ ভাই হেসে বলে, ওদের কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।
হাওড়া রেলস্টেশন
ঠান্ডাজনিত রোগের উপশমে ওই সময় বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যেত ভারতের একটি বিশেষ ওষুধ। ততদিনে এখানকার যুব সমাজের মধ্যে অন্য আর এক বিশেষ রোগের উপশমে ওষুধটির বিশেষ জায়গা করে নেওয়া সারা! বিশেষ ওই ওষুধ, মানে ফেনসিডিলের কথাই বলছিলেন লোকটি। উচ্চশিক্ষার জন্য মধ্যবিত্তের সন্তানরা বর্তমানের মত তখনও ইউরোপ, আমেরিকা মুখী হয়ে ওঠেনি। উচ্চশিক্ষা বলতে অনেকেরই ঝোঁক ছিল ব্যাঙ্গালুরু বা চেন্নাইয়ের দিকে। ওই সমস্ত শিক্ষার্থীদের বড় এক অংশের হিলি-কলকাতা সারা রাতের বাস জার্নিতে অমন একটা সেভেন-আপের বোতল না হলে পোশাত না। যা হোক, দ্বিতীয় দফায় খানিক হেঁটে আমাদেরকে নিয়ে বসতে দেওয়া হয় টিনের বেড়ার এক রোস্তোরাঁয়। চা দিতে বলে একজন বাসের টিকিট আনতে গেলেন। ঘোর তখনও কাটেনি, কোথায় ছিলাম আর কোথায় এলাম! মাঝে মাত্র একটি সীমান্ত রেখা, রেস্তোরাঁ থেকে পেছন দিকে যার দূরত্ব আধা কিলোমিটারও নয়। অথচ, এতটুকু ব্যবধানেই সংস্কার, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেমন এক ভিন্নতা বিরাজমান। তা যে আমার দেশ থেকে খুব বেশি দূরের বা অপরিচিত, ঠিক তেমনটিও নয়। এমন সব ভাবনার মধ্যেই চলে আসে এক গ্লাস করে দুধ চা। খরিদ্দার বলতে আমরা দুজন এবং পাশের টেবিলে বসা স্থানীয় একজন। চোখের নিচ থেকে মুখের বাঁ পাশটায় যার স্পষ্ট পোড়া দাগ। শুরু থেকেই লক্ষ্য করি লোকটি টান টান হয়ে মাথা সোজা করে কেবল সম্মুখে তাকিয়ে রয়েছে। কিছুক্ষণ পর তার খাবার চলে আসে। বড় স্টিলের থালার মাঝে এক কচ রুটি, কম করে হলেও ৬/৭টা হয়ে থাকবে। সঙ্গে ছোট বাটিতে কিছু আলুর চিপস্। খাওয়া শুরু করলেন। অমন খাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করার আগ্রহকে বশ মানিয়ে রাখা গেল না? কৌশলে গভীরভাবে তা দেখতে থাকি। খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিল চিপস্ আর চিপস্ নেই, নেতিয়ে গেছে। ওই দিয়েই ধীর গতিতে একে একে সাবাড় করে দিলেন সমস্ত রুটি। খাওয়া শেষে একটা ঢেকুর তুলে বড় চোখে এই প্রথম এদিক সেদিক দেখলেন। ভাবলাম এবার হয়ত এক কাপ চা বলে মুখে একটা বিড়ি ধরাবেন। না, মোটেও তা করেননি। ৫/৭ মিনিট পর তার সামনে রাখা হল এক থালা ভাত, আর বাটিতে সামান্য পরিমাণ আলুঘণ্ট। পাঠক, এরপর আর বলতে চাই না। প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু ঘটনা থাকে, যা বহুদিন মনে থাকে। অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হলেও আমার ক্ষেত্রে উল্লেখিত ঘটনা তেমনই।
সন্ধ্যা ৬টায় বাস। বিষ্ণুপ্রিয়া পরিবহণের সবচেয়ে বিলাসবহুল বাস! চেহারা দেখে তাকে বিলাসবহুল বলার কোনো সুযোগ নেই। ভেতরে ওঠার পর তা আরো পরিস্কার হয়ে যায়। বাস তো নয় যেন কবুতরের খোপ। এপ্রিল মাসের গরম কিন্তু বিলাসবহুল বাসে কোনো ফ্যান নেই, জানালাও ছোট ছোট। আব্বা এবং সেজোভাই তাদের অভিজ্ঞতা থেকে এসব আগেই বলেছিলেন। এও বলেছিলেন, পথে একবার হলেও গাড়ির চাকা ফেটে যাবে। এক ঘণ্টার মধ্যে বালুর ঘাট পৌঁছে যাই। ৩০ মিনিট বিরতির পর যাত্রা শুরু হল সারা রাতের জন্য। ভেতরে বসে অনুভূত হয় যেন ১০০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে বাস। ভাল করে বাইরে লক্ষ্য করলেই ঘোর কেটে যায়, গতি সর্ব সাকূল্যে ৬০-৬৫ অধিক নয়। রাত ৩টায় কৃষ্ণনগরে বিরতির পর ধু ধু পাথারের মাঝে বিকট শব্দে ফেটে যায় পেছনের একটি চাকা। চাকা ফেটে যাওয়া এবং যানজটের কারণে কলকাতা পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল। ধর্মতলা টার্মিনাল থেকে একটা অ্যাম্বাসেডর কার নিয়ে ছুট দিলাম ফেয়ারলী প্যালেসের দিকে। সেখান থেকে ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে। এরই মধ্যে দেখা হয়ে যায় স্কুলবন্ধু রেজওয়ান খাঁনের সঙ্গে। তারও গন্তব্য ব্যাঙ্গালুরু। ফরেন কোটায় টিকিট কাটতে ব্যর্থ হওয়ার পর দালালের আশ্রয় নিতে বাধ্য হলাম। কারণ সেদিনই রওয়ানা করতে না পারলে কলকাতায় থাকতে হবে দুইদিন। এরই মধ্যে দুপুর হয়ে গেছে। টিফিন খাওয়ার জন্য আশপাশের অফিস আদালত থেকে অনেকেই ভিড় জমিয়েছে ফুটপাথের দোকানে। ফ্রুট সালাদ এবং রসগোল্লার পসরা সাজিয়ে বসেছে অস্থায়ী দোকানিরা। কলকাতার মানুষ রসগোল্লা এবং নানা রকম মিষ্টি খেতে ভীষণ পারদর্শী। একেকজনের খাওয়ার চিত্র দেখে যে কেউ বলে দিতে পারে রসগোল্লা তাদের কতটা প্রিয়। খাওয়ার জন্য বাটি-চামচের প্রয়োজন পড়ে না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাগজে নিয়েই খেতে পারে তারা। এত তৃপ্তি করে খায় যে, কামড় বসাতেই দুগাল বেয়ে রস ঝরে পরে। অমন দৃশ্য দেখে আমারও রসগোল্লা খাওয়ার লোভ হল। বলতে বলতেই রেজোয়ান দুহাতে করে বয়ে আনে রসে টইটুম্বুর বেশ কয়েকটা রসগোল্লা। যদিও খানিক আগেই খেয়েছি ফ্রুট সালাদ। পাতা দিয়ে তৈরি বাটিতে পেঁপে, কলা, আপেল, শসা, কেশর আলুসহ বেশ কয়েক প্রকার ফলের সমাহার। দাম মাত্র পাঁচ রুপি। সালাদ আর গোল্লা দিয়েই সারা হল দুপুরের খাবার।
হাওড়া রেলস্টেশন
দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত টিকিট হাতে পাই। টিকিট হাতে পেয়ে পরখ করতে চাইলে হাফপ্যান্ট পরা দালাল বলে, ওসব দেখার দরকার নেই, সব ঠিক আছে, এবার জলদি গিয়ে লঞ্চ ধর। তারপর দুহাত কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার জানিয়ে বলে, তাড়াতাড়ি বিদায় হ, আর আমাকে মুক্তি দে দাদা! কিছুই বুঝতে পারলাম না, টিকিট কাটতে এলাম ট্রেনের আর ধরতে বলে কি না লঞ্চ! নিকটেই নদী ঘাট, কয়েক মিনিটের মধ্যে দৌড়ে গিয়ে তিনজনে উঠে পরলাম লঞ্চে। ততক্ষণে ছেড়েই দিয়েছিল প্রায়। বসার জায়গা না পেয়ে পেছনের উন্মুক্ত জায়গাটায় দাঁড়াতে হল। এর মধ্যে জেনে গেলাম লঞ্চে উঠার মানে। সময় ও টাকা উভয় বাঁচিয়ে হাওড়া রেল স্টেশনে পৌঁছার সহজ উপায় এটি। ডান পাশে চোখে পড়ে সিনেমায় দেখা লোহার তৈরি খুঁটিবিহীন সেই হাওড়া ব্রিজ। নদীর অপর প্রান্তে নদীর কিনারে ব্রিটিশ আমলের বড় লাল দালানটিই হাওড়া স্টেশন। আফসোস হলো, পর্যাপ্ত সময় না থাকায় কলকাতাটাকে ঠিক মত এক নজর দেখতেও পারলাম না! ধর্মতলা থেকে ফেয়ারলী প্যালেস যাওয়ার পথে দেখার একটা সুযোগ ছিল বটে কিন্তু ঘুমের কারণে তা আর হল কই। আগের রাতে ঘুমবিহীন বাজে জার্নির পর অল্প আরামেই চোখ দুটোয় ঘুম চলে আসে। চালক দাদা নামতে বললে চোখ মেলে দেখি ফেয়ারলী প্যালেসে পৌঁছে গেছি।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬/রুহুল/শাহনেওয়াজ
রাইজিংবিডি.কম
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী