অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে রইল বাকি ইংল্যান্ড
খানিকটা শঙ্কা জাগিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাস পরপর ফিরলে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। রানও আসছিল ধীরগতিতে।
তবে সেই চাপ দূর করেন তাওহীদ হৃদয় ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। তাদের দায়িত্বশীল জুটিতে পরাজয়ের কালো মেঘ দূর হয়। মোসাদ্দেক শেষ পর্যন্ত থেকে ম্যাচ শেষ করে আসতে না পারলেও জয়ের বিশ্বাসটা ছড়িয়ে দিয়ে যান। এরপর বাকি কাজটা সেরে দেন তাওহীদ ও মিরাজ জুটি। মেরেডিথের শর্ট বলে মিরাজের ছক্কায় বাংলাদেশ মেতে উঠে বিজয় উল্লাসে।
বৃষ্টিবিঘ্নিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।
২০১১ সালের পর এই প্রথম দ্বিপক্ষীয় সিরিজে মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। এর আগে ২০০৩, ২০০৫, ২০০৮ ও ২০১১ সালে চারটি সিরিজ খেলেছিল দুই দল। প্রতিবারই ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে।
তবে এবার চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৫ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দাপটের সঙ্গে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেসব দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছে, তাদের মধ্যে এখন কেবল ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই সিরিজ জয়ের অপেক্ষা রয়ে গেছে।
২০১৬ সালে সেই সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু শেষ হাসি হাসতে পারেনি বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবার আর কোনো ভুল করেনি তারা। মিরাজ অধিনায়ক হিসেবে ও বাকিরা নিজেদের অবদান লিখে রাখল ইতিহাসের অক্ষয় কালিতে। প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সিরিজ হারানোর স্বাদ। অসাধারণই বটে।
বৃষ্টি এদিনও বাগড়া দিল। তবে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের বিরতি ম্যাচের চিত্র খুব পাল্টায়নি। কারণ টস জিতে ব্যাটিং করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া আগেভাবেই বিপর্যয়ে পড়েছিল। স্কোরবোর্ডে কোনো রান না তুলতেই ৩ উইকেট হারায় তারা। এক হাজারেরও বেশি ওয়ানডে খেলা অস্ট্রেলিয়া প্রথমবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন কিছুর মুখোমুখি। সেই ধাক্কা সামলে ৪২ ওভারে অস্ট্রেলিয়া ১৮৭ রান তুলে নেয়। বৃষ্টিতে তাদের ইনিংস শেষ হয়নি।
ডাকওয়ার্থ লুইস আইনে বাংলাদেশ ৪১ ওভারে ১৯২ রানের চ্যালেঞ্জিং টার্গেট পায়। ৩৫ ওভারে এই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে বাংলাদেশ। ৫ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ে ঘরের মাঠে টানা পঞ্চম ওয়ানডে সিরিজ জিতল।
লক্ষ্য তাড়ায় নেমে তানজিদের উইকেট শুরুতে হারায় বাংলাদেশ। বার্টলেটকে শূন্য রানে ক্যাচ দেন তানজিদ। ওই ধাক্কা সামলে নেন সৌম্য ও নাজুমল। দুজন ৮৬ রানের জুটি গড়েন। সাইফের পরিবর্তে সুযোগ পাওয়া সৌম্য এদিন নিজেকে মেলে ধরেন। থিতু হওয়ার পর নিজের মন মতো শট খেলে উড়তে থাকেন। কাভার ড্রাইভ, স্ট্রেইট ড্রাইভে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পান। জাম্পাকে স্লগ করে মারা ছক্কাটাও ছিল দৃষ্টিনন্দন।
কিন্তু বাড়তি কিছু করতে গিয়েই উইকেট হারিয়ে আসেন। রেনশর বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে ৪২ রানে স্লিপে ক্যাচ দেন। ৫ চার ও ২ ছক্কায় সাজান ফেরার ইনিংস। আশ্চর্যজনকভাবে নাজমুলও থেমে যান একই রানে। ৫৩ বলে ৫ চারে শেষ হয় তার ইনিংস। মেরেডেথের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। ভালো শুরুর পর লিটন গ্রিনের লাফিয়ে উঠা বলে ২১ রানে আউট হন। সেখান থেকে মোসাদ্দেকের ১৫ এবং তাওহীদের ৪০ ও মিরাজের অপরাজিত ২২ রানে বাংলাদেশ পৌঁছে যায় বিজয়ের ঠিকানায়।
বাংলাদেশকে বিজয়ের এই ভিত গড়ে দেন বোলাররা। বিশেষ করে পাওয়ার প্লে’তে নতুন বলে তাসকিন ও মোস্তাফিজুর যা করেছেন তা মন ভরিয়েছে সবার। ব্যাট করতে নেমে শূন্য রানে অস্ট্রেলিয়ার ৩ উইকেট নেই! তাসকিন প্রথম ওভারে ফেরান ম্যাথু শর্টকে। ডানহাতি পেসারের বল ছেড়ে বোল্ড হন শর্ট। পরের ওভারের প্রথম বলে মোস্তাফিজুর তুলে নেন কুপার কোনোলির উইকেট। ওভারের শেষ বলে তার শিকার ম্যাট রেনশ।
ওয়ানডে ক্রিকেটে এমন কিছু চতুর্থবার দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। আগের তিন ঘটনার সর্বশেষটি ছিল আবার বাংলাদেশের। ২০০৩ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের প্রথম তিন ব্যাটসম্যানকে পরপর তিন বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পেসার চামিন্দা ভাস। এর বাইরে পাকিস্তানের দুবার এমন হয়েছিল-১৯৮৩ ও ১৯৯৭ সালে।
শুরুর ওই ধাক্কার পর অস্ট্রেলিয়া কোমড় সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। ৮১ রান তুলতে ৬ উইকেট হারিয়েছে তারা। সেখান থেকে জেভিয়ার বার্টলেট ও মার্নাশ লাবুশানে হাল ধরেন। ১০৩ রানের জুটি গড়েন দুজন। তুলে নেন ব্যক্তিগত ফিফটি।
৪১তম ওভারে তাসকিন এই জুটি ভাঙেন বার্টলেটকে বোল্ড করে। নতুন ব্যাটসম্যান অ্যাডাম জাম্পাকেও টিকতে দেননি। দুই বলে দুই উইকেট তুলে তাসকিন দারুণভাবে বাংলাদেশকে লড়াইয়ে ফেরান। তাসকিন ও মোস্তাফিজুর দুজনই নেন ৩টি করে উইকেট। দুজনেরই ওভার বাকি ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ হলে দুজনের কেউ ফাইফার পেতেও পারতেন। অবশ্য ম্যাচ শেষে এই আক্ষেপ উবে যাওয়ার কথা। অসাধারণ জয়ে সিরিজ জেতার আনন্দ তো ছুঁয়ে গেছে দুজনেরই।
ঢাকা/ইয়াসিন/সাইফ