ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৯ ||  ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষাকার’ আমরা আপনার কাছে চিরঋণী

স্বরলিপি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫৮, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৭:২২, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
‘বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষাকার’ আমরা আপনার কাছে চিরঋণী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশই প্রথম বৃহৎ জাতি-রাষ্ট্র যে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডের জনগোষ্ঠী এমন এক জাতি যারা ২৫ বছরের কম সময়ে দুইবার তাদের রাষ্ট্রীয় সত্তার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহাসিক কাঠামোর আড়ালে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন তত্ত্ব।

অর্থনীতি ও ইতিহাস গবেষক ড. আকবর আলি খান বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধান করে গেছেন জীবনভর। রাজ-রাজাদের ইতিহাস পাশ কাটিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের নৃতত্ত্ব ও গতিধারার লেখক ও গবেষক। গ্রামীণ বসতি গড়নের বিশ্লেষণ, গতিধারা, রাজনৈতিক স্থিতিহীনতার গতিধারা এমনকি এই জনপদে ধর্মান্তরের গতিধারার ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত প্রাধান্য পেয়েছে তার লেখায়।

গ্রামীণ জাতি-গোষ্ঠীর বিভক্তি ও সংঘাতের গতিধারা তুলে ধরার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন বাংলাদেশ-ভূখণ্ডের গ্রামীণ রাজনীতির গুরুত্ব। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গ্রামীণ রাজনীতির প্রচ্ছন্ন প্রভাব কীভাবে পড়ে তাও উঠে এসেছে ড. আকবর আলি খানের লেখায়। সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব এবং এর আচরণের স্থানীক ব্যাখ্যাও মেলে তার লেখায়।

ড. আকবর আলি খান মনে করতেন, ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের মতো বাংলাদেশের বিপ্লবও সাম্প্রতিক-রাজনীতির ডামাডোলে তলিয়ে গেছে। ইতিহাস আর সমাজতত্ত্বের মিশেলে তিনি বাঙালির স্বরূপ সন্ধান করেছেন। তবে তার অনুসন্ধানে অধিক গুরুত্ব পেয়েছে সমাজতত্ত্ব। ‘বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন: ‘আমি ঐতিহাসিকদের পরোক্ষ তত্ত্বের চাইতে সমাজতাত্ত্বিকদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বায়নকে বেশি মূল্য দেই। আমি জানি যে, এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ফলে হয়ত ঐতিহাসিকদের মধ্যে বন্ধুর চেয়ে শত্রুই জুটবে বেশি। তবে আশা করা যায়, সুনির্দিষ্ট তত্ত্বের উপস্থাপন বিতর্কাধীন বিভিন্ন ইস্যুর ক্ষেত্রে স্পষ্টতা আনবে এবং মাথা খাটিয়ে মূলধারার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।’

সোহরাব হাসান ও রাফসান গালিবকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. আকবর আলি খান বাংলাদেশ নিয়ে তার আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে আমি আশাবাদী। ১৯৭১ সালে আমরা যে বাংলাদেশ দেখেছি, তার সঙ্গে তুলনা করলে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এত অগ্রগতি হবে, আমি চিন্তাও করতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও প্রযুক্তির উন্নতির কারণে মানুষের ক্ষমতা অসম্ভব বেড়েছে। বাংলাদেশের নিরক্ষর মানুষটিও যেভাবে একটি মুঠোফোনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেন করতে পারেন, অনেক দেশে এখনো তা অকল্পনীয়। বিল গেটসের মতো মানুষও বাংলাদেশের উন্নয়নে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। যদিও সব ক্ষেত্রে সমানভাবে এগোতে পারিনি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়েও গিয়েছি।’

বাংলাদেশ সংবিধানের মূল চার স্তম্ভ যথাযথ বাস্তবায়ন করা না গেলে বৈষম্য বাড়বে এবং সামাজিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
রাজনৈতিক যে কোনো স্তম্ভের ‘বিবর্তন’ মেনে নিয়ে তিনি আলোচনার অবতারণা করেন। আকবর আলি খান, ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ গ্রন্থের ১০৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চার দশক ছিল সমাজতন্ত্রের অব্যাহত জয়যাত্রা লগ্ন। রাশিয়া, চীন, পূর্ব উইরোপ, কিউবা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। ভিয়েতনামে পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে মহাকাব্যিক সংঘর্ষে পৃথিবীর শোষিত মানুষের সমর্থন নিয়ে সমাজতন্ত্র জয়লাভ করে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের এ বিজয় টিকে থাকতে পারেনি। আশির দশকের শেষ দিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধসে পড়ে।’

বিশ্বায়ন, শিল্পায়ন, ভারতবর্ষে কোম্পানি শাসন পাকাপোক্ত হয় প্রায় এক সময়ে, এক যোগে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতা অর্জন করা বাংলার মানুষ গ্রাম থেকে শহরমুখী হতে শুরু করে। তার আগে শ্রমিকশ্রেণী অধিক হারে গ্রামে বসবাস করত। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো। শহরমুখী মানুষেরা তাদের উৎপাদনের উপকরণগুলিতে মালিক হবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো এবং আবাসস্থলের বিবেচনায় তারা হয়ে পড়ে ছিন্নমূল। সামঞ্জস্যবিধানের চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে,  কিন্তু শহরে তারা শুধু পেশার কারণে একই রকমভাবে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে আসা নিন্মআয়ের মানুষের সঙ্গে একত্রিত হতে থাকলো।

বড় পরিবর্তন বড় ধরনের ‘সামঞ্জস্যের’ আবশ্যিকতা নির্দেশ করে। অথচ ততোদিন বাংলা ভূ-খণ্ডের অর্থনীতি ব্রিটিশ লেজুড়ে অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। উপরে উল্লেখিত পুরো সময়টা অর্থনৈতিক লেজুড়ে হয়েই মোকাবিলা করেছে। 

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭০৪-১৯৭১)’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রে তখন বাংলাদেশ যথেষ্ট সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল বলে মনে হয়। কিন্তু সে উঠতি অর্থনীতি অধোগতি লাভ করে পলাশীর পর থেকে। পলাশীর পূর্বে বাংলাদেশ ছিল একটি বিরাট রপ্তানিকারক দেশ।  এ দেশের রপ্তানিবাণিজ্যে যোগদান করেছে বৃটেনসহ পশ্চিম ইউরোপের প্রায় সকল  নৌ-বাণিজ্যের দেশ। কিন্তু ইংরেজ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলার অর্থনীতিতে বিপর্যয় দেখা দেয়। ইংরেজদের অত্যাচার ও লুণ্ঠন নীতির ফলে অর্থনীতি এমন সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে যে ১৭৬৮ সনের পর ঘন ঘন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ক্রমাগত দুর্ভিক্ষের ফলে দেশের লোকসংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে, লোকশক্তির অভাবে কৃষিক্ষেত্র জঙ্গলে পরণত হয়। ১৮২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্ববাজর থেকে বিদায় নেয় এবং আমদানিকারক দেশ হিসেবে বৃটিশ সাম্রাজ্য-অর্থনীতির লেজুড়ে পরিণত হয়।’

প্রকৃত অর্থে একাত্তরের আগ পর্যন্ত এই অবস্থা থেকে বাংলা ভূ-খণ্ডের মানুষের অর্থনৈতিক উত্তরণ ঘটেনি। স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠার সময়কালে বা স্বাধীন বাংলাদেশ যে জনগোষ্ঠীকে পায় তাদের মধ্যে ‘বাঙালি জাতি সত্তা’ প্রবল। সক্রিয় আছে আঞ্চলিক সত্তা, ভাষা সত্তা ও ধর্ম সত্তাও। মানসিক নৈকট্য অনুভবের জন্য অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মতো এই জনগোষ্ঠীর একটি সত্তাকে প্রতিরোধ করে প্রবল হয়ে ওঠে। এই জাতি সত্তার প্রকৃত রূপ জানতে হলে ড. আকবর আলি খানের গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের গুরুত্ব দেওয়া একটি রাজনৈতিক করণীয়।

ড. আকবর আলি খানের পরার্থপরতার অর্থনীতি, অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি, দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশে বাজেট অর্থনীতি ও রাজনীতিকে উপজীব্য করে বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং স্থানীক করণীয় ঠিক করতে পারে।

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়