মাদুরোর জায়গায় ডেলসিকে বসাতে চান ট্রাম্প, কে এই নারী
ডেলসি রদ্রিগেজ মাদুরোর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন রয়েছে। মাদুরো তাকে ‘বাঘিনী’ সম্বোধন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় একটি ‘গোষ্ঠী’ আপাতত দেশটির শাসনভার গ্রহণ করবে। তার ভাষায়, যতক্ষণ না একটি ‘নিরাপদ, সঠিক ও চমৎকার ক্ষমতা হস্তান্তর’ নিশ্চিত করা যায়, ততদিন এই গোষ্ঠীই দেশ পরিচালনা করবে।
ভেনেজুয়েলার ভেতরে কারা এই গোষ্ঠীর অংশ হবেন- এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
ডেলসি রদ্রিগেজ মাদুরোর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তিনিই প্রথম কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাদুরো ও তার স্ত্রীর জীবিত থাকার প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানান।
এই বার্তাটি শুধু অডিও আকারে প্রচার করা হয়, যা দ্রুতই গুঞ্জন সৃষ্টি করে যে রদ্রিগেজ হয়তো ভেনেজুয়েলা ছেড়ে গেছেন। রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি তখন রাশিয়ায় ছিলেন। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্যকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দেন।
ট্রাম্প বলেন, রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র যা চাইবে, তা করতে তিনি প্রস্তুত- এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই বক্তব্য অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কারণ ডেলসি রদ্রিগেজ এবং তার ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ, যিনি বর্তমানে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন; দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো সরকারের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন।
যদিও এমনটা হতে পারে যে নিজের অবস্থান রক্ষার স্বার্থে রদ্রিগেজ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতায় রাজি হয়েছেন; বিশেষ করে ট্রাম্প যখন বলেছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা হামলার জন্যও প্রস্তুত। তবে তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হবে না, যিনি ভেনেজুয়েলায় প্রকৃত পরিবর্তন বাস্তবায়নে আগ্রহী বা সক্ষম।
একনজরে ডেলসি রদ্রিগেজ
মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক সরকারকে কঠোরভাবে রক্ষার কারণে নিকোলাস মাদুরো ডেলসি রদ্রিগেজকে একবার ‘বাঘিনী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন তার ভাই হোর্হে রদ্রিগেজের সঙ্গে, যিনি বর্তমানে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) প্রধান।
কারাকাসে জন্ম নেওয়া ৫৬ বছর বয়সি ডেলসি রদ্রিগেজের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১৮ মে। তিনি ছিলেন বামপন্থি গেরিলা যোদ্ধা হোর্হে আন্তোনিও রদ্রিগেজের কন্যা, যিনি ১৯৭০-এর দশকে বিপ্লবী সংগঠন ‘লিগা সোশ্যালিস্তা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে থাকার পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী ও তেলমন্ত্রীর দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করায় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পরিচালনায় ডেলসি রদ্রিগেজ হয়ে উঠেছেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। এর ফলে দুর্বল হয়ে পড়া বেসরকারি খাতের ওপরও তার বড় ধরনের প্রভাব তৈরি হয়েছে। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তিনি তুলনামূলকভাবে প্রথাগত অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করেছেন।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি অডিও বার্তায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে মাদুরো ও তার স্ত্রীর জীবিত থাকার প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে বর্তমানে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডেলসি রদ্রিগেজ একজন আইনজীবী। তিনি ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রাল দে ভেনেজুয়েলা) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। গত এক দশকে তিনি দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান ঘটান এবং ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যোগাযোগ ও তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ডিজাইনার পোশাকপ্রেমী হিসেবে পরিচিত রদ্রিগেজ ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় ভেনেজুয়েলাকে মেরকোসুর বাণিজ্য জোট থেকে স্থগিত করার পর তিনি আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আইরেসে অনুষ্ঠিত জোটের এক বৈঠকে প্রবেশের চেষ্টা করেন, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২০১৭ সালে তিনি সরকারপন্থি সাংবিধানিক পরিষদের প্রধান হন। এই পরিষদ মাদুরোর ক্ষমতা আরো বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০১৮ সালের জুনে ডেলসি রদ্রিগেজকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন মাদুরো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (তৎকালীন টুইটার) দেওয়া এক ঘোষণায় মাদুরো তাকে বর্ণনা করেন, “একজন তরুণী, সাহসী, অভিজ্ঞ, একজন শহীদের কন্যা, বিপ্লবী এবং হাজারো লড়াইয়ে পরীক্ষিত।”
২০২৪ সালের আগস্টে মাদুরো রদ্রিগেজের দায়িত্বের পরিধি আরো বাড়িয়ে তাকে তেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞার মুখে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প তেল খাত পরিচালনার দায়িত্বও তখন তার ওপর ন্যস্ত করা হয়।
ঢাকা/রাসেল