‘চোর’ অপবাদ দিয়ে নির্যাতন, ববি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
গোপালগঞ্জ ও বরিশাল প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
শুভ বৈরাগী
জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে প্রেমিকার বাড়িতে গিয়ে ‘চোর’ অপবাদ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করা এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) সকালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ঘর থেকে শুভ বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার হয়। মারা যাওয়ার আগে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শুভ প্রেমিকা ও তার পরিবারকে নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মোল্লা আফজাল হোসেন জানান, আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এক-দুইদিন আগে আত্মহত্যার ঘটনাটি ঘটেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।
মারা যাওয়া শুভ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের (২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বৈরাগী বৌলতলী গ্রামের প্রয়াত সুখলাল বৈরাগী ও শেফালী বৈরাগী দম্পতির ছেলে। শৈশবেই বাবা-মাকে হারিয়ে তিনি বোন ও ভগ্নিপতির আশ্রয়ে বড় হন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শারমিন আক্তার জানান, শুভ তাদের বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন।
স্বজনরা জানান, গত ১ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে শুভ তার মৃত্যুর জন্য প্রেমিকা ও প্রেমিকার পরিবারকে দায়ী করেন। স্ট্যাটাসে শুভ লেখেন, “আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রেমিকা, তার বাবা, কাকা, জেঠুসহ তার পরিবারের সবাই।”
ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, কোটালীপাড়া উপজেলার কাফুলাবাড়ি গ্রামের এক তরুণীর সঙ্গে শুভর প্রায় দুই বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে ওই তরুণীর জন্মদিন উপলক্ষে সরাসরি শুভেচ্ছা জানাতে তার বাড়িতে যান শুভ। এ সময় তরুণীর পরিবারের সদস্যরা তাকে ‘চোর’ অপবাদ দিয়ে মারধর করেন এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করে।
শুভ তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, সম্পর্কের কথা স্বীকার করার পরও তরুণীর পরিবারের সদস্যরা তাকে মারধরসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং জোরপূর্বক একটি ‘মিথ্যা ভিডিও’ ধারণ করেন। ওই ভিডিওতে তাকে দিয়ে স্বীকার করানো হয় যে, তিনি চুরি করতে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ও অভিযোগ তার এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
শুভ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে আরও লেখেন, “তারা সত্যকে আড়াল করে আমাকে মিথ্যা চোর অপবাদ দিয়ে সকলের কাছে দোষী করেছে। এতে আমার মান-সম্মান নষ্ট হয়েছে। আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারব না। তারা আমাকে জানে মারার চেয়েও বেশি মেরে ফেলেছে।”
তিনি লেখেন, আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় প্রেমিকার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। টাকা আজ না থাকলেও ভবিষ্যতে হতে পারতো—তবে এই অপমানের পর বেঁচে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন শুভ। মৃত্যুর জন্য তিনি প্রেমিকা, তার বাবা, কাকা ও জেঠুকে সরাসরি দায়ী করে যান।
শুভর অকাল মৃত্যুতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। প্রতিবেশীরাও মেধাবী এই শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না।
আশ্রয়ণ কেন্দ্রের প্রতিবেশী অনিল বিশ্বাস বলেন, “৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর শুভ আমার বাই সাইকেল নিয়ে কাফুলাবাড়ির দিকে যেতে চায়। আমি বলি, রাতে সাইকেল চালিয়ে গেল দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সে বলে, দুর্ঘটনা ঘটবে না। এই বলে আমার বাই সাইকেল নিয়ে চলে যায়। আমি সকাল ৮টা পর্যন্ত দেখি, শুভ ফেরেনি। পরে জমিতে কাজ করতে যাই। বিকেল ৪টায় এসে দেখি শুভ বারান্দায় সাইকেলে তালা দিয়ে রেখেছে। চাবি জানালা দিয়ে আমার ঘরে ছুঁড়ে ফেলে রেখেছে। সে মাঝে-মধ্যে আসত আবার চলে যেত। আমি মনে করেছি, সে বরিশাল চলে গেছে। পরে তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এ মেধাবী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।”
নিহতের সহপাঠী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রাসেল, মো. তানজির রহমান ও ইব্রহিম খান জানান, তারা ৪৬জন শিক্ষার্থী বরিশাল থেকে এসেসেন। তারা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানান।
গোপালগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনিসুর রহমান বলেন, “লাশ উদ্ধারের পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ মাঠে নেমেছে। পরিবারকে মামলা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার মূল কাহিনী উদঘাটন সম্ভব হবে।”
ঢাকা/বাদল, পলাশ/মাসুদ