ঢাকা     শনিবার   ১৪ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ৩০ ১৪৩২ || ২৫ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

পাহাড়ি স্বর্গ বগা লেকে 

সুমন্ত গুপ্ত  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:০৩, ১৪ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৮:০৫, ১৪ মার্চ ২০২৬
পাহাড়ি স্বর্গ বগা লেকে 

অনেকদিন থেকে পরিকল্পনা করছিলাম কোথাও ঘুরতে যাবো; দূরে কোথাও। কিন্তু কাউকে সে ভাবে পাচ্ছিলাম না সঙ্গী হিসেবে। তখনই আচমকা একদিন হামিদ ভাই বলল, চলেন বান্দরবান যাই। আমার পরিচিত একটা গ্রুপ যাচ্ছে তাদের সঙ্গে। আমাকে আর আটকায় কে? জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে অফিসে ছুটি আছে। ছুটির দিন আমরা আপাতত বগা লেক  যাচ্ছি ফাইনাল হলো। হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ খোলা হলো। আমরা নয়জন ছিলাম। আমি শুধু হামিদ ভাইকে চিনতাম। বাকি সাতজনই আমার অপরিচিত বিভিন্ন ব্যাংকের। 

রাতের ট্রেনে চেপে আমরা সকালে এসে পৌঁছলাম চট্টগ্রাম শহরে। ট্রেন থেকে নেমে আমরা সোজা চলে গেলাম খাবার হোটেলে পেটে দানাপানি দেওয়ার নিমিত্তে। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাতটা বাজতেই আমরা পাহাড়তলিতে মিলিত হলাম। বাকিরা সেখানেই অপেক্ষা করছিল। পাহারতলি থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা, সেখান থেকে বহদ্দরহাট। বহদ্দরহাট থেকে বান্দরবানের বাস পাওয়া যায়। সেখান থেকেই টিকিট করলাম আমরা। আগের রাতে তেমন ঘুম হয়নি, এ কারণে পথের প্রায় সবকিছু মিস করে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চলে গেলাম বান্দরবান পর্যন্ত। সেখান থেকে রুমা। 

রুমার পুরো পথে উঁচুনিচু পাহারের ঢাল বেয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল। রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে চলা গাড়িতে বিভিন্ন রকম গান আনন্দযাত্রাকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছিল। আকাশে শুভ্র মেঘ আর সূর্যের আলোর লুকোচুরি খেলা পাহাড়ের সৌন্দর্য কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। সাপের মত আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তার দুইপাশে পাহাড়ি গভীর খাঁদ মাঝেমধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। ঘণ্টাতিনেকের মধ্যেই আমরা রুমা বাজার পৌঁছে যাই। আগে থেকে আমাদের গাইড আপন বড়ুয়া রুমা বাজারে অপেক্ষা করছিলেন। নিয়ম মেনে রুমা বাজারে আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নেওয়ার অনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা রওনা হলাম বগালেকের দিকে। 

আপন দাদা বলছিলেন বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিকগণের মতে, আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে উৎপত্তি হয় বগা লেকের। এর উৎপত্তি নিয়েও প্রচলিত আছে নানা গল্পকাহিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গল্পটি হলো, এক সময় বান্দরবানে একটি চোঙাকৃতির পাহাড় ছিল। ওই পাহাড়ের কোলে বাস করত ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরাসহ আরও বেশ কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়। হঠাৎই আদিবাসী গ্রামের গবাদিপশু এমনকি শিশুরাও উধাও হতে থাকে। দুশ্চিন্তায় পড়েন আদিবাসীরা। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পশুসহ শিশুদের সর্বশেষ পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে ওই চোঙা আকৃতির পাহাড়ে। এরপর আদিবাসীরা পাহাড়ের মাথায় উঠে দেখেন, সেখানে বসে আছে বিশাল এক ড্রাগন। 

অপর এক পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হয়েছে বগা লেক ছিল একটি সমৃদ্ধ ম্রো গ্রাম। গ্রামের পাশে একটি সুড়ঙ্গে বড় আকারের সাপ থাকত। এক দিন ওই সাপ গ্রামবাসী ধরে খেয়ে ফেলে। সাপ খাওয়ায় নাগরাজার প্রতিশোধের কারণে গ্রামবাসীসহ গ্রামটি দেবে গিয়ে বগা লেকের সৃষ্টি হয়। এখনো অনেক বম, ম্রোর বিশ্বাস, হ্রদের গভীরে থাকা নাগরাজ লেজ নাড়ালে হ্রদের পানি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। 

যাই হোক, রাস্তা ভালো হওয়ায় আগে হেটে যেতে হলেও এখন বগা লেক পর্যন্ত গাড়ি যায়। তবে এই পথটি বাংলাদেশের সবচেয়ে খাড়া পথ। রুমা বাজার থেকেই আমাদের অ্যাডভেঞ্চারের শুরু। আমরা চলছি এগিয়ে অসাধারণ সর্পিল পথ। বগা লেক যাওয়ার পথটা যে কোনো অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীকে আকর্ষণ করবে। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে ছুটে চলে আমাদের গাড়ি। দূরে মেঘেদের দলের ছুটোছুটি দেখে নিজেকে পাখি মনে হলো। পথ তো নয় যেন মেঘের ভেলায় পাখির চোখে পাহাড় দেখা। রুমা থেকে পথ খুবই খাড়া, আর একটু পরপরই ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি কোণে উপরে উঠে আর নিচে নামে আমাদের চার চাকার বাহন। প্রথমবার আমার একটু ভয় লাগলেও পাহাড়-মেঘ-খাদের ভয়ংকর সৌন্দর্য বেশ উপভোগ্য। 

আমরা যখন বগা লেকে পৌঁছলাম তখন থেকেই একটু একটু বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টির জন্য বগা লেকের পানির সবুজ রং একটু বেশিই সবুজ লাগছিল। কোনো ভাষাতেই সেই রূপ বর্ণনা করা যাবে না। পাহাড়ের এত উপরে বিশাল লেকের সৌন্দর্য অবাক করার মতো। আসলে ছবিতে বা রিভিউতে আমরা যা দেখি অথবা পড়ি তার চেয়ে হাজারগুন বেশি সুন্দর এই লেক। 

আমরা এবার পায়ে হেঁটে চলেছি। প্রকৃতিপ্রেমী সকলের একবার হলেও বগা লেকের সৌন্দর্য স্বচক্ষে দেখা উচিত। নীল আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি, নিচে স্বচ্ছ সবুজ পানি, চারপাশে পাহাড়ের বেষ্টনী বগা লেকের সৌন্দর্যের অন্যতম কারণ। আমাদের কটেজ ছিল লেকের পাশেই। বারান্দা থেকে যে ভিউ পাচ্ছিলাম তা রেখে বাইরের বৃষ্টিতে যেতে ইচ্ছা করছিল না। পুরো লেকটাই দেখতে পাচ্ছিলাম। সঙ্গে সামনের পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা মেঘরাশি। কিন্তু বৃষ্টিটাকে মিস করতে চায়নি কেউ। সঙ্গীরা সবাই লেকের পানিতে গোসল করার পরিকল্পনা নিয়েই এসেছে। যদিও লেকে নামা পুরোপুরি নিষেধ। আমি সাঁতার জানি না। ফলে লেকের পানিতে নামার প্রশ্নই ওঠে না। 

আমরা যখন কটেজ থেকে বের হলাম তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো আবার। বাংলাদেশের বৃষ্টি আর তাও পাহাড়ে! বাকিটা কল্পনা করে নিলেই সবচেয়ে ভালো হয়। লেকের পাশের উঁচু পাহারটা তখন মেঘে ছেয়ে গেছে। সন্ধ্যায়ও বৃষ্টি ছিল তাই কটেজেই থাকতে হলো। সন্ধ্যার গাড়ো আঁধার, আঝোর বৃষ্টিকে ভৌতিক করে তুলল। স্তব্ধ পরিবেশ। অদ্ভুত সৌন্দর্যের চাদরে ঢাকা সুশৃঙ্খল গ্রাম, নির্জন পাহাড়ের বেষ্টনীতে বেশ উপভোগ্য মনে হলো আমাদের কাছে। এদিকে বৃষ্টি একটু কমতেই আমরা গিয়ে বাইরে বসলাম। লেকের পাড়ে শুরু হলো গানের আসর। অমিতদা, আমিন ভাই, স্বপন ভাইদের সুমিষ্ট কণ্ঠের সঙ্গে আমিও গলা মেলালাম। 

ছেলেবেলায় গ্রামে উঠানে বসে সবাই মিলে এভাবে গল্প করতাম। চাদের মিষ্টি আলো আর তারাভরা আকাশ আমাদের আড্ডার সঙ্গী। এরপর আমাদের রাতের খাবারের সময় হয়ে এলো। পরদিন ভোরে নির্জন পাহাড়ে ভোর দেখার লোভ সামলাতে না পেরে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম ভোর সাড়ে চারটায়। সাথে চিন্ময়দা, রুবেল ভাই, হামিদ ভাইসহ পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক বেরিয়ে পড়লাম। স্বচক্ষে দেখা ছাড়া বগা লেক ও তার আশেপাশের সৌন্দর্য বর্ণনা করা অসম্ভব। সকালের স্নিগ্ধ শীতল হাওয়ায় পাহাড় ঘুরে দেখা এক অন্যরকম ভালো লাগায় মন ভরিয়ে তুলল। আমরা এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যপথে। 

কীভাবে যাবেন    

প্রথমে আপনাকে বাসে অথবা ট্রেনে চট্টগ্রাম আসতে হবে। সেখান থেকে বান্দরবান। এ ছাড়া ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান সরাসরি যাওয়া যায়। এসি, নন-এসি বাস আছে। প্রতিদিন রাত দশটায় অথবা সাড়ে দশটায় রাজধানীর কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে এসব বাস বান্দরবানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে যেতে হবে রুমা। রুমা বাজারে থাকার জন্য কিছু হোটেল আছে, তবে দিনের মধ্যেই বগা লেক চলে যাওয়া উচিত। এ জন্য রুমা বাজারে অবশ্যই বিকাল চারটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে। চারটার পর সেনাবাহিনী কোনো গাড়ি বগা লেকে যাওয়ায় অনুমতি দেয় না বিশেষ নিরাপত্তার কারণে।  

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়