ঢাকা     বুধবার   ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৬ ১৪৩৩ || ১১ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা: সুযোগ নাকি হুমকি

ডেস্ক রিপোর্ট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০০, ২৯ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ১৭:০৬, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা: সুযোগ নাকি হুমকি

সংগৃহীত

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিশেষ করে চ্যাটজিপিটর মতো টুলের ব্যবহার দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এআই এখন শুধু প্রযুক্তিগত সহায়ক টুল নয়; এটি সরাসরি শ্রেণিকক্ষ, অ্যাসাইনমেন্ট এবং শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে পরিবর্তন করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন একদিকে শিক্ষাকে দ্রুত, সহজ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করছে, অন্যদিকে একাডেমিক সততা (academic integrity), চিন্তাশক্তি এবং সমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা মূলত তিনটি কাজ; অ্যাসাইনমেন্ট ও রচনা লেখায় সহায়তা, জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝা, তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণায় সহায়তার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করছে।

আরো পড়ুন:

Holmes, Wayne এবং সহ-গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই ‘পারসোনাল লার্নিং’ বাড়াচ্ছে, অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের গতিতে শেখার সুযোগ পাচ্ছে, যা আগে সীমিত ছিল। অন্যদিকে Selwyn, Neil-এর ২০২৬ সালের একটি গবেষণানুযায়ী, এআই শিক্ষাকে ‘দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় পরিণত করছে, যেখানে দ্রুত ফল পাওয়া গেলেও গভীর চিন্তার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

একাডেমিক সততা বনাম এআই নির্ভরতা

সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো; এআই কি শেখাকে উন্নত করছে, নাকি শর্টকাট তৈরি করছে! Zawacki-Richter, Olaf-এর করা গবেষণা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা’ (automation dependency) বাড়ছে, অর্থাৎ তারা নিজের চিন্তার পরিবর্তে এআই’য়ের উত্তরকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করছে।

এর ফলে দুটি বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কপি করার প্রবণতা (plagiarism) বৃদ্ধি ও বিশ্লেষণমূলক চিন্তাশক্তি হ্রাস। তবে, গবেষণায় এটাও বলা হয়েছে, যদি এআই সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এটি লেখার দক্ষতা, গবেষণা ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে পারে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভূমিকার রূপান্তর

এআই’য়ের কারণে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভূমিকা বদলে যাচ্ছে। Luckin ও Rose এর গবেষণা অনুযায়ী, শিক্ষক এখন জ্ঞান সঞ্চারক বা তথ্য পরিবেশক (knowledge transmitter) নয়, বরং শেখার প্রক্রিয়া পরিচালনাকারী (learning facilitator)। অন্যদিকে শিক্ষার্থী এখন তথ্য গ্রহণকারী নয়, বরং বিশ্লেষণকারী ও যাচাইকারী।

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় সমস্যা হলো, অনেক শিক্ষক এখনো এআই ব্যবহারের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি, ফলে শ্রেণিকক্ষে এর ব্যবহার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

নীতিমালার ঘাটতি (Policy Gap)

বাংলাদেশে এখনো এআই ব্যবহারের জন্য কোনো একক জাতীয় শিক্ষা নীতিমালা নেই। ২০২৬ এ Williamson, Ben-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই দ্রুত ছড়ালেও নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেক পিছিয়ে থাকে, যার ফলে ‘অ্যান্ডারগ্র্যাজুয়েট লার্নিং ইকোসিস্টেম তৈরি হয়। বাংলাদেশেও একই চিত্র, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা নিয়ম, পরীক্ষায় এআই ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা নেই ও নৈতিক গাইডলাইন সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজস্বভাবে এআই ব্যবহার করছে, যা কখনো সহায়ক, আবার কখনো অপব্যবহারের দিকে যাচ্ছে।

২০২৬ সালে করা গবেষণাগুলোতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, এআই ব্যবহারে শিক্ষা বৈষম্য বাড়ছে। Selwyn, Neil-এর গবেষণা মতে, শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে ডিজিটাল অ্যাক্সেসের পার্থক্যের কারণে এআই লার্নিং গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। যারা ভালো ইন্টারনেট, ডিভাইস ও এআই টুল ব্যবহার করতে পারছে, তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পিছিয়ে পড়ছে সীমিত সুবিধার শিক্ষার্থীরা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই এখন আর ভবিষ্যৎ নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। এটি শিক্ষাকে দ্রুত, সহজ ও আধুনিক করছে, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করছে নতুন চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে একাডেমিক সততা, দক্ষতা, নীতি এবং সমতার ক্ষেত্রে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের পথ হলো, এআই লিটারেসি বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা। জাতীয় এআই শিক্ষা নীতিমালা তৈরি করা এবং দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

এআই নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এর ব্যবহারের ধরন। সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষা থাকলে এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়