চাঁদার দাবিতে হামলা: থমকে ফেনীর উন্নয়ন, অনিশ্চয়তায় বড় প্রকল্প
ফেনী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ফেনীতে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের ঘটনায় পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ ড্রেন নির্মাণসহ একাধিক উন্নয়ন কাজ থমকে গেছে। এতে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘সহনশীল নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প (আরইউটিডিপি)’–এর আওতায় নেওয়া বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) মাধ্যমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের জিরো পয়েন্ট থেকে মহিপাল পর্যন্ত ড্রেন পুনর্নির্মাণ, ফুটপাত নির্মাণ এবং শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়নসহ প্রায় ২৮ কোটি টাকার একটি পাইলট প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল)। গত বছরের ২৭ অক্টোবর কার্যাদেশ দেওয়া হলেও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু করা যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, “কাজ শুরু করতে গেলেই বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমি সড়কে কাজ শুরুর পর পানি উন্নয়ন বোর্ড অনুমতির বিষয় তুলে কাজ বন্ধ করে দেয়। একই রাতে প্রকল্পের মালামাল রাখা স্থানে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। পরে ৩ মার্চ ডাক্তারপাড়া এবং ৫ এপ্রিল শহীদ শহিদুল্লা কায়সার সড়কে কাজ শুরুর সময় আবারও হামলা চালিয়ে যন্ত্রপাতি ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ ওঠে।”
এ ঘটনায় ৬ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাননি সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা দাবি করেন, শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে চাপ ছিল। স্থানীয় একটি রাজনৈতিক পক্ষের তরফ থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়, পরে কাজের অংশীদারিত্বও চাওয়া হয়। পাশাপাশি স্থানীয় কিছু ঠিকাদারের বিরূপ মনোভাবও বাধা তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় ঠিকাদার ও রাজনৈতিক নেতারা। স্থানীয় ঠিকাদার সমিতির সভাপতি সাইফুল হক বলেন, “প্রকল্পটি ফেনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।” তার দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই এসব অভিযোগ তুলছে।
এদিকে জেলা বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলেও তারা তা নাকচ করেছেন। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এয়াকুব নবী বলেন, “প্রকল্প বন্ধ হওয়ার কারণ ঠিকাদারকেই স্পষ্ট করতে হবে।” তার মতে, ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই মূল সমস্যা। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন মামুনও।
অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কাজের অগ্রগতি না থাকায় পৌরসভা থেকে একাধিকবার ব্যাখ্যা চাওয়া হয় এবং চুক্তি বাতিলের সতর্কতাও দেওয়া হয়। জবাবে পিডিএল রাজনৈতিক বাধা, এলাকা বুঝিয়ে না দেওয়া এবং অন্যান্য জটিলতার কথা উল্লেখ করে সময় চেয়েছে। তবে, তাদের আনুষ্ঠানিক জবাবে হামলা বা ভাঙচুরের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করায় বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন বলেন, “প্রকল্প এলাকা বুঝিয়ে না দিলে কাজ শুরুই সম্ভব হতো না।” তার দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের সমস্যার কথা পরিষ্কারভাবে জানায়নি।
ফেনী পৌর প্রশাসক রোমেন শর্মা জানান, এই পাইলট প্রকল্পটি বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। এর সফল বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে আগামী ছয় বছরে ৬০০ কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম। তিনি সতর্ক করে বলেন, “পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে পুরো আরইউটিডিপি প্রকল্পই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
সব মিলিয়ে, অভিযোগ-প্রত্যাঘাত, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতায় গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে ভোগান্তির আশঙ্কায় রয়েছেন ফেনী পৌরবাসীই।
ঢাকা/সাহাব/জান্নাত
পর্যায়ক্রমে চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী