ঢাকা     রোববার   ০৭ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪৩৩ || ২১ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

চীনের প্রেসিডেন্টের উত্তর কোরিয়া সফরের নেপথ্যে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪০, ৭ জুন ২০২৬   আপডেট: ১২:৪৫, ৭ জুন ২০২৬
চীনের প্রেসিডেন্টের উত্তর কোরিয়া সফরের নেপথ্যে কী?

উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

হঠাৎ করেই উত্তর কোরিয়া সফর করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আজ রবিবার (৭ জুন) পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার এই বৈঠকটি একটি বিশেষ কারণে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। 

রবিবার (৭ জুন) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা। 

আরো পড়ুন:

প্রতিবেদনে বলা হয়, কারণটি এটি নয় যে জিনপিং-কিম বৈঠক করছেন: মাত্র এক বছর আগেই বেইজিংয়ে এই দুই নেতার দেখা হয়েছিল। সে সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীন বিশাল সামরিক প্যারেডের আয়োজন করেছিল। 

তবে এবারের চমকটি হলো স্বয়ং জিনপিংয়ের সফর করার সিদ্ধান্ত। 

২০১৯ সালের পর থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়া সফরে যাননি। সাম্প্রতিক বছরগুলোকে তিনি বিদেশ ভ্রমণ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন। আজকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের মতো বিশ্ব নেতারা সাধারণত নিজেই তার সঙ্গে দেখা করতে বেইজিংয়ে আসেন।

ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র অ্যানালিস্ট উইলিয়াম ইয়াং আল-জাজিরাকে বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে যে শি জিনপিং আসলে ইদানীং বিদেশে খুব একটা ভ্রমণ করেননি। এখন উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- বিদেশি নেতারাই তার সঙ্গে দেখা করতে বেইজিংয়ে ছুটে যাচ্ছেন।”

“এমন পরিস্থিতিতে শি জিনপিং যখন নিজে পিয়ংইয়ং সফরের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা প্রমাণ করে যে চীন এই সফরকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।”

তবে ইয়াং জানান, বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের কারণেই হয়তো জিনপিং এখন এই সফরে যাচ্ছেন।

ঐতিহাসিকভাবে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিং সবসময় প্রধান অংশীদারের ভূমিকা পালন করে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল কমিটি অন নর্থ কোরিয়ার ২০২২ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া তার বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্যই চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে এই সমীকরণটি বদলে যেতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সৈন্য সরবরাহ করেছে, যা পর্যবেক্ষকদের মতে মস্কোর যুদ্ধযাত্রাকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির অনুমান অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে সৈন্য মোতায়েন এবং ‘কামান, গোলা, গাইডেড ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ রপ্তানির জন্য মস্কো উত্তর কোরিয়াকে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। 

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, উত্তর কোরিয়া এর মধ্যে মাত্র ৫৮ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলার মূল্যের ‘পণ্য’ পেয়ে থাকতে পারে। এর মানে হলো, এই অর্থপ্রদানের সিংহভাগই হয়তো এসেছে ‘স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি বা সংশ্লিষ্ট সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ও উপাদানের’ আকারে, যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সহজে শনাক্ত করা কঠিন।

যদিও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, তবুও উত্তর কোরিয়া যেভাবে নতুন সামরিক প্রযুক্তি লাভ করছে, তা নিয়ে বেইজিং বেশ সতর্ক ও চিন্তিত বলে জানান ইয়াং।

তিনি বলেন, “উত্তর কোরিয়াকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে বেইজিং সবসময়ই খুব সতর্ক। কারণ তারা মনে করে না যে, একটি সামরিকভাবে শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া তাদের নিজস্ব স্বার্থের অনুকূলে যাবে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া যদি সামরিকভাবে অতিরিক্ত সাহসী হয়ে ওঠে, তাহলে তা কোরীয় উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং স্থিতিশীলতার জন্য বিঘ্ন ঘটাতে পারে।”

উত্তর কোরিয়া বছরের শুরু থেকে ইতিমধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও ইউএস নেভাল ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত মে মাসে তারা একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্মোচন করেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কিম জং উনের একটি নতুন ‘অস্ত্র-গ্রেডের পারমাণবিক উপাদান’ তৈরির কারখানা পরিদর্শনের ছবি প্রকাশ করা হয়। পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘জ্যামিতিক হারে’ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যেই এই কারখানাটি ব্যবহার করা হবে।

১৯৫০ সাল থেকে কারিগরিভাবে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে, কারণ ১৯৫৩ সালের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে এই সংঘাত কেবল স্থগিত করা হয়েছিল। ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অসামরিকীকৃত অঞ্চল কোরীয় উপদ্বীপকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে।

বিগত বছরগুলোতে এই দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করেছে। ২০২৪ সালে এসে এই উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে, যখন কিম দুই কোরিয়ার দীর্ঘদিনের পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্যটি পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এরপর থেকে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে, চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফর ‘কোরীয় উপদ্বীপের সমস্যাগুলো সমাধানে একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে’- যা ইঙ্গিত করে যে সিউল হয়তো চীনের নেতাকে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার জন্য অনুরোধ বা তদবির করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রীকরণ মন্ত্রী চুং ডং-ইয়ং গত মাসে সাংবাদিকদের আলাদাভাবে বলেছিলেন যে, তিনি আশা করছেন দুই নেতা চলতি বছরের শেষের দিকে কিম এবং ট্রাম্পের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা করবেন।

এছাড়া পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য নিরাপত্তা উন্নয়ন নিয়েও জিনপিং উদ্বিগ্ন হতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক সহযোগিতা চুক্তির খবর, যা গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ‘শাংরি-লা সংলাপে’ উত্থাপিত হয়েছিল।

চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক ওঠানামা করলেও, জাপানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বেশ তিক্ত। এর পেছনে রয়েছে ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে চীনের ওপর সাম্রাজ্যবাদী জাপানের আগ্রাসন ও দখলের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ক্ষোভ। এছাড়া সম্প্রতি টোকিও যেভাবে তাদের সামরিক বাহিনীকে কার্যত বিস্তার করছে, তা নিয়েও বেইজিং তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে।

ফলে একদিকে রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া অক্ষের অতি-সক্রিয়তা, আর অন্যদিকে মার্কিন সমর্থনে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক জোট- দুইয়ে মিলেই এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তড়িঘড়ি পিয়ংইয়ং সফর করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট।

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়