Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৭ ১৪২৮ ||  ১৩ সফর ১৪৪৩

‘গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সব সরকারই উদাসীন ছিল’ 

ইমাম মেহেদী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৪, ২৫ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১২:০২, ৩০ মার্চ ২০২১
‘গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সব সরকারই উদাসীন ছিল’ 

ড. আহম্মেদ শরীফ। শিক্ষক, সংগঠক ও গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক। বর্তমানে গাজীপুরে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর ট্রেজারার এবং ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন ও আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’-এর ‘গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর জেলা জরিপ’ গ্রন্থমালার সহযোগী সম্পাদক হিসেবে। গণহত্যা দিবস উপলক্ষে এই গবেষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমাম মেহেদী।

ইমাম মেহেদী: গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণার সঙ্গে আপনি কীভাবে যুক্ত হলেন?

ড. আহম্মেদ শরীফ: আমি ২০১১ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গণহত্যা নিয়ে কাজ করছি। ২৯তম বিসিএস-এর মাধ্যমে নীলফামারী সরকারি কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। সঙ্গত কারণে নীলফামারী জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার জন্য বই সংগ্রহের চেষ্টা করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় তখন পর্যন্ত নীলফামারীর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কোনো বই রচিত হয়নি। বিষয়টি আমাকে অবাক করেছিল। তারপর শুরু করলাম তথ্য সংগ্রহের কাজ। প্রতি শুক্র ও শনিবার কাজের ফাঁকে নীলফামারী জেলার কোনো না কোনো গ্রামে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকি। এভাবে ৩ বছর তথ্য সংগ্রহের পর ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘নীলফামারী ১৯৭১ : গণহত্যা ও নির্যাতন’ গ্রন্থটি।

ইমাম মেহেদী: স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর আমরা পালন করছি। একইসঙ্গে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টাও চলছে। অতীতে এই দাবি তোলা হয়নি এবং বর্তমানেও এটি নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা কিংবা কূটনৈতিক জোর প্রচেষ্টা আপনি লক্ষ্য করছেন কিনা?

ড. আহম্মেদ শরীফ: রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০১৭ সাল থেকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করা হয়। যদিও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২০০৫ সাল থেকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রায় সব সরকারই উদাসীন ছিল। তারা পাকিস্তানের এজেন্ডা পালনে বেশি মনোযোগী ছিল। যে কারণে তারা গণহত্যার বিচার বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে কোনো ফলদায়ক উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য কতগুলো প্রক্রিয়া রয়েছে। একটা গণহত্যাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন স্বীকার করে নেয়, সেটা সংসদের মাধ্যমেই হোক বা নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই হোক, তখন বলা যায় সেটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আবার কোনো গণহত্যার ঘটনা যদি জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলেও সেটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বলা হবে। বাংলাদেশ সরকার ২৫ মার্চ দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তৎপরতা শুরু করছে। কিন্তু তা সাধারণের কাছে দৃশ্যমান নয়। সরকার, দেশের মানুষ ও প্রবাসী জনগোষ্ঠী এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে, এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা করে, প্রামাণ্য দলিল তৈরি করে এবং এ বিষয়ে ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়ে তবেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব।

ইমাম মেহেদী: গণহত্যার সংজ্ঞা ও আইন অনুযায়ী একাত্তর সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হওয়া গণহত্যার সঙ্গে সুদান, রুয়ান্ডা, বসনিয়া, নানকিং, আর্মেনিয়া ও অন্যান্য রাষ্ট্রের গণহত্যার উদ্দেশ্য, ধরন ও প্রকৃতির মধ্যে কি কোনো সাযুজ্য আপনি খুঁজে পেয়েছেন?

ড. আহম্মেদ শরীফ: এটি অনেক বড় একটি প্রশ্ন। অল্প কথায় উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে উপর্যুক্ত দেশসমূহে সংঘটিত গণহত্যার উদ্দেশ্য, ধরণ ও প্রকৃতির মধ্যে সামান্য কিছু পার্থক্য থাকলেও ফলাফল প্রায় একই। তা হলো মানবতার পরাজয়। এইসব স্থানে আগ্রাসী শক্তিসমূহ যে নির্মমতা-নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে তা মানব সভ্যতাকে পিছিয়ে দিয়েছে।

ইমাম মেহেদী: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এই পঞ্চাশ বছরে সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে বাংলাদেশের গণহত্যার সঠিক চিত্র কি উঠে এসেছে? যদি না আসে তাহলে এর দায়ভার আসলে কাদের?

ড. আহম্মেদ শরীফ: গণহত্যার ইতিহাস চর্চা বাংলাদেশে মূলত আঞ্চলিক ও প্রান্তিক পর্যায়ের গবেষকদের দ্বারাই শুরু হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন ও আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’ এক্ষেত্রে পথিকৃৎ। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১০০টি গণহত্যার ওপর ১০০টি বই এবং প্রায় ৪০টি জেলার গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জেলা জরিপ শেষ করেছে। এই গবেষণাগুলো থেকে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সংঘটিত হওয়া গণহত্যার একটি সাধারণ চিত্র পাওয়া যায়। তবে সরকারি উদ্যোগে গণহত্যা বিষয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি।

ইমাম মেহেদী: আমরা ৩০ লক্ষ শহিদ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর কথা বলি, প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা নিয়ে আপনার গবেষণা ও বিশ্লেষণ কী?

ড. আহম্মেদ শরীফ: মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে গবেষণার অভাবে খুব বেশি জানা যায় না। মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষ (২০১৩) প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত ৯০৫টি গণহত্যা ও গণহত্যার নিদর্শনের কথা জানা যায়। ৩০ লক্ষ শহিদের ভিত্তি ছিল এই গণহত্যা ও তার নিদর্শনসমূহ। গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর : জেলা জরিপের ৩২টি জেলার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এই জরিপের পূর্ব পর্যন্ত স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ কোষ দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখিত ৩২টি জেলায় ২১৬টি গণহত্যা সম্পর্কে তথ্য তুলে ধারা হয়েছে। জরিপে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৭৫৬। পূর্বের তুলনায় নতুন গবেষণায় ৫৫ গুণ বেশি গণহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। সুতরাং এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় শহিদের সংখ্যা ৩০ লক্ষের অনেক বেশি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের সংখ্যা সরকারি হিসেবে বলা হয় দুই থেকে আড়াই লক্ষ। এই পরিমাণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বিভিন্ন সংস্থা। ১৯৭২-এ বাংলাদেশে নির্যাতিতা নারীদের চিকিৎসা সেবাদানের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে যে সব সংগঠন এগিয়ে এসেছিল তারা এই ধরনের সংশয় প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস ’৭১-এ নারী নির্যাতনের সরকারি হিসেবটি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে প্রকৃত সংখ্যা ৪ লাখেরও বেশি। মুনতাসীর মামুনের মতে এ সংখ্যা প্রায় ৬ লাখের কাছাকাছি।

ইমাম মেহেদী: গণহত্যার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিচারের মুখোমুখি আজও দাঁড়াতে হয়নি। এমনকি পাকিস্তান প্রকাশ্যে ক্ষমাও চায়নি। গণহত্যার সংজ্ঞা, বিশ্লেষণ ও আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানের বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ এখনও আছে কি?

ড. আহম্মেদ শরীফ: পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী বিশাল প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে নিরীহ বাঙালি জনগোষ্ঠীদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবে তারা এই গণহত্যার জন্য দায়ী। ১৯৬৯ সালের ২৩ মে ভিয়েনায় গৃহীত ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন দি ল অব ট্রিটিজ’-এ কতগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধের উল্লেখ করে বলা হয়েছে এগুলো এমন ভয়ঙ্কর অপরাধ যে কোনো রাষ্ট্র বা কোনো সরকার কখনও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা অভ্যন্তরীণভাবেও ক্ষমা করতে পারবে না। এটিকে বলা হয়েছে ‘জুস কজেনস’ বা সর্বমান্য আইন, যা সকল দেশের প্রতি প্রযোজ্য। জুস কজেনস-এর বিধান অনুযায়ী ‘গণহত্যা’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ কোনো রাষ্ট্র বা সরকার কখনও ক্ষমা করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশনে এভাবেই গণহত্যাকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রদান এবং গণহত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিচার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী করার সুযোগ রয়েছে।

ইমাম মেহেদী: গণহত্যার অন্যতম নিকৃষ্টতম মাধ্যম ধর্ষণ বা সেক্সুয়াল জেনোসাইড। আমি যতটুকু জানি বিশ্বের অন্যান্য দেশের গণহত্যায় সেক্সুয়াল জেনোসাইডকে গণহত্যা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের আইনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেক্সুয়াল জেনোসাইড সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ জানতে চাই। 

ড. আহম্মেদ শরীফ: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বাঙালি নারীদের ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পাকিস্তানিদের রক্ত সংমিশ্রণের মাধ্যমে খাঁটি মুসলমান বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তারা। কারণ পাকিস্তানিরা বাঙালিদের মুসলমান ভাবত না। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন ভিয়েতনামের নারীদের ধর্ষণ করে সেখানে মার্কিন সমর্থকগোষ্ঠী সৃষ্টির উদ্যোগ নেয় যা ভিয়েতনামাইজেশন নামে পরিচিত। পাকিস্তানিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করে পাকিস্তানিকরণ নীতি অনুসরণ করে। 
যুদ্ধে ধর্ষণ একটি ঘৃণ্য অপরাধ। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আইন পাস করেছে। আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচার হচ্ছে। ধর্ষণের দায়ে ট্রাইবুনাল অনেকগুলো রায়ও দিয়েছে। এই আইনটি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।

ইমাম মেহেদী: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা সমীচীন মনে করেন কিনা? এ বিষয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ড. আহম্মেদ শরীফ: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। ৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো হয়ত এজন্যই পাঠ্যসূচিতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসেনি। কারণ তারা পাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ব্যস্ত ছিল। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় আছে। সরকারের প্রতি অনুরোধ যেন তারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠসূচিতে মুক্তিযুদ্ধকে অন্তর্ভূক্ত করে। তা না হলে তরুণ প্রজন্ম দেশের সঠিক ইতিহাস জানবে না এবং তারা উগ্র কোনো আদর্শে সহজেই অনুপ্রাণিত হতে পারে। সঠিক ইতিহাস পাঠের সুযোগ দিয়ে দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গঠন করা সরকারের কর্তব্য।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়