জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হয়ে ঘর ছাড়ে সেই তরুণরা
জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র অন্যতম অর্থ যোগানদাতা শাহ মো. হাবিবুল্লাহ এবং বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হওয়া তিন তরুণসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এসব তরুণকে ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
সোমবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, রোববার (৯ অক্টোবর) রাতে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১০ এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কেরাণীগঞ্জ থেকে শাহ মো. হাবিবুল্লাহ, নেয়ামত উল্লাহ, মো. হোসাইন, রাকিব হাসনাত ওরফে নিলয়, মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫টি উগ্রবাদী পুস্তিকা, প্রায় ৩০০ লিফলেট এবং ৫টি ব্যাগ জব্দ করা হয়।
জঙ্গি সংগঠনে ভেড়ানোর জন্য তরুণদের টার্গেট করত সংগঠনের সদস্যরা। তারা বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের বিভিন্ন ভিডিও দেখানো এবং বিভিন্ন অপব্যাখ্যা দিয়ে এসব তরুণকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করত। রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন অনিয়ম, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বিভিন্ন তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়ার মাধ্যমে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে উৎসাহী করে তুলত।
জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে হোসাইন ১ বছর আগে, সাইফুল দেড় মাস আগে এবং রাকিব ২ মাস আগে বাড়ি ছাড়ে। নিরুদ্দেশ হওয়া এসব তরুণকে সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পটুয়াখালী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। তাদের বিভিন্ন সেইফ হাউজে রেখে বিভিন্ন চর এলাকায় শারীরিক কসরত ও জঙ্গিবাদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আত্মগোপনে থাকার কৌশল হিসেবে তাদের রাজমিস্ত্রী, রং মিস্ত্রী, ইলেক্ট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন পেশার কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণের সংখ্যা ৫০ এর বেশি। তারা দেড় মাস থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ। কয়েকজনের পরিবার জানে যে, তারা চাকরির জন্য বিদেশে অবস্থান করছে। নিয়মিত পরিবারকে অর্থও দিতো তারা। প্রাথমিকভাবে সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে তাদের নাম ও ঠিকানা পাওয়া গেছে। তবে, নাম-ঠিকানায় কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। তারা বিভিন্ন সংগঠনের ছত্রছায়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে আত্মগোপনে থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খন্দকার আল মঈন জানান, হাবিবুল্লাহ কুমিল্লায় কুবা মসজিদের নামাজ পড়াতো। এছাড়া, সে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করত। সে ২০২০ সালে নেয়ামত উল্লাহর মাধ্যমে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ায় যুক্ত হয়। সে সংগঠনটির অন্যতম অর্থ যোগানদাতা। তার নেতৃত্বে কুমিল্লা অঞ্চলে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সে সংগঠনের জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করত ও উগ্রবাদী কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহ করত। পার্বত্য অঞ্চলের নাইক্ষ্যংছড়িতে সে প্রায় দুই বছর একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেছে। বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ছাত্র সংগ্রহ করে তার মাদ্রাসায় রাখত হাবিবুল্লাহ। এ পর্যন্ত ১৫-২০ জন সদস্য সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছে সে।
নেয়ামত উল্লাহ কুমিল্লার একটি মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করত। সে ২০১৯ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে সংগঠনে যুক্ত হয়। সে সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পাশাপাশি নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণদের তত্ত্বাবধান করত। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া তরুণদের আশ্রয় দিতো নেয়ামত উল্লাহ।
হোসাইন ইলেকট্রিশিয়ান এবং রং মিস্ত্রী। সে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। এক বছর ধরে সে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত।
সাইফুল রাজমিস্ত্রী। সে আগস্ট মাসে জঙ্গিবাদে উদ্বুব্ধ হয়ে নিরুদ্দেশ হয়। সে নোয়াখালীর এক ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদী এ সংগঠনে জড়িত হয়।
২৩ আগস্ট কুমিল্লা সদর এলাকা থেকে ৮ তরুণ নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় ২৫ আগস্ট কুমিল্লার কোতয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। র্যাব তাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায়।
মাকসুদ/রফিক