ঢাকা     শুক্রবার   ৩১ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪৩১

রমনার বটমূলে বোমা হামলা 

২৩ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৪৩, ১৪ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ০৯:৪৩, ১৪ এপ্রিল ২০২৪
২৩ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করা হয়

২৩ বছর আগে রাজধানীর রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এতে ১০ জন প্রাণ হারান। ওই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়েছে ১২ বছর আগে। তবে, ২৩ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক দ্রব্য মামলার বিচার।

মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে ছিল। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই মামলাটি বদলি করে ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এ পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি মামলাটি পাঠানো হয় মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ তে।

মামলাটি এক বছরের বেশি সময়ে ধরে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির পর্যায়ে আছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি এ মামলায় আত্মপক্ষ শুনানির তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু, নিরাপত্তাজনিত কারণে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করেনি কর্তৃপক্ষ। এজন্য মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ এর বিচারক তেহসিন ইফতেখারের আদালত আগামী ২২ এপ্রিল আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। 

মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মামলাটি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন থেকে উত্তোলন করে কয়েকজন সাক্ষীকে পুনরায় জেরা করার আবেদন করেন। মুফতি আব্দুল হাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার আইনজীবী ইদি আমিন পাঁচ সাক্ষীকে পুনরায় জেরা করার আবেদন করেন। যদিও আদালত তা নামঞ্জুর করেন। এরপর আসামিপক্ষ বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে উচ্চ আদালতে যান। পরে মামলাটি যুক্তি-তর্ক থেকে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির পর্যায়ে আসে।

বিস্ফোরক আইনের মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল। আসামিপক্ষের কালক্ষেপণের কারণে মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। তারা কালক্ষেপণ না করলে মামলাটির বিচার এতদিন শেষ হয়ে যেতো। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সংশ্লিষ্টআদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহবুবুর রহমান জানান, পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। সেদিনের ন্যক্কারজনক ঘটনা বাঙালিদের কাছে কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা এ হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রত্যাশা করছি। মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। আসামিদের আদালতে হাজির করামাত্রই মামলাটির বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।  

আসামিপক্ষের আইনজীবী ইদি আমিন বলেন, আসামিরা ন্যায়বিচার পায়নি। এই মামলার বিলম্ব হওয়ার পেছনে আসামিদের কোনো দোষ নেই। রাষ্ট্রপক্ষের কারণে বিলম্ব হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। আসামিদের নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে আদালতে আনা হচ্ছে না। এর ফলে আরও বিলম্বিত হচ্ছে বিচারকার্য। মামলায় যে সাজা হওয়ার কথা, তার চেয়ে বেশি সময় কারাগারে আটক রয়েছে আসামিরা। আমরা ন্যায়বিচার চাই। আসামিরা এই মামলা থেকে খালাস পাবেন বলে আশা করি। 

বিস্ফোরক আইনের মামলার আসামিরা হলেন—আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, শাহাদাতউল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আব্দুল হাই।

আসামিদেরমধ্যে মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আব্দুল হাই পলাতক। অপর সাত আসামি কারাগারে।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে একটি এবং এর পরপরই আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই সাত ব্যক্তি প্রাণ হারান এবং ২০-২৫ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সে ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। এতে ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পুলিশ পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ।

দুটি মামলার মধ্যে প্রায় ১৩ বছর পর হত্যা মামলার রায় হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। রায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।

মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা হলো—মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নান, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলালউদ্দিন, মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আব্দুল হাই।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো—শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা সাব্বির ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ ও হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া।

এদের মধ্যে সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ চার আসামি এখনও পলাতক। আর শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নানের অপর এক মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এজন্য বিস্ফোরক মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান চলাকালে বোমা হামলায় ১০ ব্যক্তি নিহত হন। তারা হলেন—চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার দুবলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে আবুল কালাম আজাদ (৩৫), বরগুনা জেলার বামনা থানার বাইজোরা গ্রামের আবুল হোসেন ওরফে এনায়েত হোসেনের ছেলে জসিম (২৩), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার বিরামকান্দি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে এমরান (৩২), পটুয়াখালীর সদর থানার ছোট বিমাই গ্রামের মৃত অনবী ভূষণ সরকারের ছেলে অসীম চন্দ্র সরকার (২৫), পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার কাজীপাড়া গ্রামের আবুল কাশেম গাজীর ছেলে মামুন (২৫), একই গ্রামের সামছুল হক কাজীর ছেলে রিয়াজ (২৫) ও আবুল হাশেম গাজীর মেয়ে শিল্পী (২০), নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার রথি রুহিত রামপুর গ্রামের আবুল কালামের ছেলে ইসমাইল হোসেন স্বপন (২৭), ঢাকার দোহার থানার চরনটসোলা গ্রামের মৃত আয়নাল খাঁর ছেলে আফসার (৩৫) এবং একজন অজ্ঞাত পুরুষ।

/রফিক/

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়