প্রজাহিতৈষী জমিদার রবীন্দ্রনাথ
হাবিবুর রহমান স্বপন || রাইজিংবিডি.কম
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাবিবুর রহমান স্বপন : রবীন্দ্রনাথের জন্ম ধনী এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতামহ প্রিন্স (দ্বারকানাথ ঠাকুর) নামে খ্যাত। আর পিতা হচ্ছেন মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিজে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, স্বল্পকালের জন্য হলেও ইংরেজ সরকারের নাইট উপাধিধারী। লোকচক্ষে অভিজাতকুলতিলক।
তবে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত পরিচয় যে তাঁর নিজের হাতে গড়া সে কথা কম লোকই ভেবে দেখেন। বংশের ধারা রক্ষা করে চলাই যদি অভিলাষ হত তা হলে জোড়াসাঁকোর প্রাসাদ ছেড়ে গ্রাম বাংলার পথে-প্রান্তরে, খাল-বিল-নদী পথে ঘুরতেন না এবং শান্তিনিকেতনের মাটি ও খড়ের ঘরে বাস করতেন না।
অবশ্য লোকের ধারণা সহজে বদলায় না, তারা ভাবে এর সবই ছিল লোক দেখানো বড়-মানুষি চাল। কাজেই অভিজাতের অভিযোগটা তিনি কোন মতেই কাটাতে পারেন নি। সাহিত্যিক হিসাবেও তাঁকে অভিজাত সমাজের মুখপাত্র হিসাবে দেখা হয়েছে।
এক সময় দেশের নবীন লেখকেরা বলেছেন, দেশের জন জীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই, তাই তিনি এ দেশের হতে পারেন না। তাদের ধারণা দেশের চাষী মজুরদের তিনি চেনেন না জানেন না।
রবীন্দ্রনাথ সব অভিযোগই মাথা পেতে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘সম্মানের চির নির্বাসনে সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সংকীর্ণ বাতায়নে-সেখান থেকে সমস্ত দেশটাকে, দেশের মানুষকে আমি দেখতে পাইনি।’ তিনি সম্মানের উচ্চ আসনে বসতে যাননি, সম্মানের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁর বিচার করা হয়েছে।
বিচারে অভিযুক্ত হয়ে তিনি বিনয়ে বলেছেন,-‘তোমরা যাদের চাষী মজুর বল তাদের সঙ্গে আমার কোন পরিচয় ছিল না এমন না। তবে পরিচয়টা যতটা ঘনিষ্ঠ হতে পারতো ততটা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি। তাই তো তিনি লিখেছেন, ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে, ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’
এর পরও বলতে হয় রবীন্দ্রনাথ যতটা তাদের জন্য করেছেন ও ভেবেছেন ততখানি সেদিন ক’জন করেছেন ? চাষী, মজুর, তাঁতীদের উন্নয়নের জন্য তিনি যা তাঁর সময়ে করেছেন তা কে করেছে?
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাঙালি শিক্ষিত সমাজে একটি দোনামোনা ভাব ছিল, এখনও আছে। তাঁকে ফেলতেও পারে না, আবার গিলতেও পারে না। এখনও আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে কত কথা শোনা যায়। অথচ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী জমিদার।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ডিস্ট্র্রিক্ট গেজেটিয়ারে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তার রিপোর্টে বর্ণনা করেন, ‘জমিদার মাত্রই যে হৃদয়হীন হন না তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশিষ্ট কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। ‘নায়েব কর্মচারীরা যাতে প্রজাদের ওপর কোন প্রকার জবরদস্তি না করে সে দিকে তার প্রখর দৃষ্টি ছিল।’
ফসলহানির কারণে ১৩১২ বঙ্গাব্দে এক বছরে তিনি কৃষকদের উদারভাবে আটান্ন হাজার টাকা খাজনা মাফ করেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে গ্রামের রাস্তাঘাট সংস্কার করেছেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। বিভিন্ন গ্রামে যে স্কুল স্থাপন করেন তার জন্য বছরে বরাদ্দ ছিল সাড়ে বারো শ’ টাকা। প্রজাদের মধ্যে যারা অন্ধ বা বিকলাঙ্গ এবং যারা উচ্চ শিক্ষা নিতে চায় তাদের জন্য মাসিক বৃত্তি নির্ধারণ করে দেন। নদী ভাঙ্গনে, ঝড় কিংবা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জমিদার রবীন্দ্রনাথ অর্থ সহায়তা দিতেন।
শাহজাদপুরে অবস্থানকালে আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত এনায়েতপুর থেকে কয়েকজন গ্রামবাসী এসেছিলেন জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা ও নগদ টাকা প্রদান করেন।
রবীন্দ্রনাথ দীন-দরিদ্রের কথা ভেবেছেন, বলেছেন, লিখেছেন। এমন আর কে করেছেন? দেশের অখ্যাত দীন-দুুঃখী দুুর্বল অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে তিনি কতখানি একাত্মবোধ করেছেন তা তাঁর লেখা চিঠি পড়লেই জানা যায়। তিনি একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখ-দুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোট ছোট বিষয় দরকার কত সামান্য কারণে মর্মান্তিক কান্না, কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর। এই সমস্ত ছেলে পিলে গরু-লাঙ্গল-ঘরকন্নাওয়ালা সরল হৃদয় চাষাভুষারা আমাকে কী ভুলই জানে। আমাকে এদের স্বজাতি মানুষ বলেই জানে না।”
গ্রাম্য মহাজনদের কবল থেকে প্রজাদের মুক্ত করবার জন্য এবং যিনি এদেশের কৃষকের উন্নতির জন্য তাঁর নোবেল পুরস্কারের সমুদয় টাকা ব্যয় করে গেছেন কৃষি ব্যাংক করে। কৃষক ও কৃষকের উন্নয়নের চিন্তা যিনি সর্বদাই করতেন এবং নিজে হাতে কলমে শিক্ষা দেয়ার প্রচেষ্টা চালান আজীবন। অথচ এই দরদী মানুষটি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিতদের মুখে অতি অদ্ভুত সব কথা শোনা যায়।
অথচ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক।’ অভিজাত অপবাদটি রবীন্দ্রনাথ কোন মতেই এড়াতে পারেন নি। বংশ গৌরব, অপূর্ব দেহকান্তি, অসামান্য ব্যক্তিত্ব তদুপরি বহুবিধ গুণে তিনি এতই স্বতন্ত্র ছিলেন যে তাঁকে সাধারণ একজন বলে ভাবা কঠিন।
অথচ তিনি এই আভিজাত্য কথাটাকেই একটা নতুন সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, আভিজাত্য বংশ গৌরবে নয়, অর্থ গৌরবে নয়, পদ গৌরবে নয়; এটি মানুষের স্বভাব-জাত উৎকর্ষ, নিত্য দিনের ব্যবহারে যার প্রকাশ। ফুলের যেমন সৌরভ, আভিজাত্য তেমনি মানুষের মনের সৌরভ।
রবীন্দ্রনাথ ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, ‘যদি জমিদারী হস্তান্তরে বাধা না থাকে এবং জমি যদি খোলা বাজারে বিক্রি হয়ই তা হলে যে ব্যক্তি স্বয়ং চাষ করে তার কেনবার সম্ভাবনা অল্পই; যে লোক চাষ করে না, কিন্তু যার টাকা আছে, অধিকাংশ বিক্রয় যোগ্য জমি তার হাতে গিয়ে পড়বেই। তাতে গরীব চাষীর সমস্যার সমাধান হবে না। গরীব চাষীর হাতে জমি দিলেও সে রাখতে পারবে না।
তাই জমিদারী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে পল্লীগ্রামের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে পারলে তবেই চাষী রক্ষা পাবে। প্রতিনিয়ত নিজেকে রক্ষা করবার শক্তি নিজের ভিতর থেকেই উদ্ভাবন করতে পারবে।’
সমবায় প্রথায় চাষে গরীব চাষীর মুক্তি। এ কথা তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। সমস্ত জমি একত্র করে কলের লাঙ্গলে চাষ করার সুবিধার কথা রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রজাদের বুঝিয়েছিলেন।
অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া দেশবাসির মুক্তি যে সম্ভব না তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশক ও বিংশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ যা ছিল বিরাহিমপুর পরগণাভুক্ত), পাবনা (ইউসুফশাহী পরগনাভুক্ত শাহজাদপুর বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলাধীন), রাজশাহী (বর্তমানে নাটোর জেলার পতিসর যা ছিল কালিগ্রাম পরগনাভুক্ত) এবং বীরভূম জেলায় জমিদারির কাজ তদারকি করার সময় রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, গ্রামের জীবনকে কিভাবে ইংরেজ শাসন-শোষণ ক্ষতি করেছে।
ইউরোপে শিক্ষা গ্রহণকালে সেখানকার মানুষ ও অর্থনৈতিক চিত্র অবলোকন করেছেন। ‘নোবেল’ পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে যে অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, তা তিনি এদেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকেই কৃষক, তাঁতী, জেলে, কামার, কুমোরদের উন্নয়নের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের শিক্ষার তাগাদা অনুভব করেন। তাতে তিনি কতটুকু সফল ও বিফল হয়েছিলেন তা আলোচনা করলেই জানা যাবে।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে উপরিল্লিখিত চার জমিদারির দেখাশোনার দায়িত্ব দেন রবীন্দ্রনাথকে। এর পাঁচ বছর পর ১৮৯৬ সালের ৮ আগস্ট উক্ত জমিদারিসমূহের সর্বময় দায়িত্ব দেন (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি)। জমিদারির কাজে তিনি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। পুরাতন বিধি পরিবর্তন করার বিরুদ্ধে ছিলেন পুরাতন কর্মচারিরা। দুর্বোধ্য কার্যপ্রণালী পদ্ধতির পরিবর্তে তিনি যে নতুন বা সহজ পদ্ধতির প্রবর্তন করেন তা অনুকরণ করার জন্য পার্শ¦বর্তী জমিদাররা তাদের কর্মচারিদের পাঠাতেন তা জানার জন্য।
প্রজাদের জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বার ছিল অবারিত। সকাল সন্ধ্যা-রাত্রি যখন-তখন প্রজারা তাঁর সাক্ষাৎ পেতেন। তিনি লিখেছেন, “কোন কোন দিন দরবারে দিন কেটে যেত নাওয়া-খাওয়ার সময় কেটে যেত। তাতেই আমি আনন্দ পেতাম। যতদিন পল্লীগ্রামে ছিলাম ততদিন তাকে তন্ন তন্ন করে জানবার চেষ্টা আমার মনে ছিল। কাজের উপলক্ষে এক গ্রাম থেকে আর এক দূর গ্রামে যেতে হয়েছে, শিলাইদহ থেকে পতিসর, নদীনালা-বিলের মধ্য দিয়ে-তখন গ্রামের বিচিত্র দৃশ্য দেখেছি। পল্লীবাসীদের দিনকৃত্য, তাদের জীবনযাত্রার বিচিত্র চিত্র দেখে প্রাণ ঔৎসুক্যে ভরে উঠতো।
আমি নগরে পালিত, এসে পড়লাম পল্লীশ্রীর কোলে-মনের আনন্দে কৌতুহল মিটিয়ে দেখতে লাগলুম। ক্রমে এই পল্লীর দুঃখ দৈন্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো, তার জন্যে কিছু করব এই আকাঙ্খায় আমার মন ছটফট করে উঠেছিল। তখন আমি যে জমিদার ব্যবসায় করি, নিজের আয়-ব্যয় নিয়ে ব্যস্ত, কেবল বণিক-বৃত্তি করে দিন কাটাই-এটা নিতান্তই লজ্জার বিষয় মনে হয়েছিল।
তার পর থেকে চেষ্টা করতুম-কী করলে এদের মনের উদ্বোধন হয়, আপনাদের দায়িত্ব এরা আপনি নিতে পারে। আমরা যদি বাইরে থেকে সাহায্য করি তাতে এদের অনিষ্টই হবে। কী করলে এদের মধ্যে জীবন সঞ্চার হবে। এই প্রশ্নই তখন আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এদের উপকার করা শক্ত। কারণ এরা নিজেকে বড়ো অশ্রদ্ধা করে। তারা বলত ‘আমরা কুকুর, ক‘ষে চাবুক মারলে তবে আমরা ঠিক থাকি ? ”
মানুষের কল্যাণে তাঁর প্রচেষ্টার যে আন্তরিকতা তা প্রকাশ পেয়েছে এই কথায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে থাকতে একদিন পাশের গ্রামে আগুন লাগলো। গ্রামের লোকেরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। পানির অভাব। আগুন নেভানোর জন্য পাশের গ্রামের মুসলমানরা এলো এবং জমিদারের কর্মচারিরা আগুন আয়ত্বে আনতে ঘরের চালা ভেঙ্গে দিল। এর জন্য গ্রামবাসিদের মারধরও করে কর্মচারিরা। যদিও এভাবেই আগুন নেভানো হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘এরা এতটাই বোকা যে কিসে তাদের উপকার হয় তাই তারা জানে না। ‘অগ্নিকা- শেষ হয়ে গেলে তারা আমার কাছে এসে বললে, ‘ভাগ্যিস বাবুরা আমাদের ঘর ভাঙলে, তাই বাঁচতে পেরেছি।’ তখন তারা খুব খুশি, বাবুরা মারধর করাতে তাদের উপকার হয়েছে তারা তা মেনে নিল। যদিও আমি সেটাতে লজ্জা পেয়েছি।”
এখানেই রবীন্দ্রনাথের বিশাল মনের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্যণীয়। পানির সংকট দেখে জমিদার রবীন্দ্রনাথ প্রজাদের ডেকে বলেন, ‘তোরা কুয়ো খুঁড়ে দে আমি বাঁধিয়ে দেব।’ গ্রামবাসি বলেছিল, আমরা কুঁয়ো খুঁড়ে দেব আর আপনি, স্বর্গে গিয়ে পুণ্য লাভ করবেন।
মানুষের মনের এই অভিব্যক্তিতে কবি জমিদার ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি শিলাইদহে গ্রামবাসিদের বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়। একটি ঘর উঠানো হয়েছিল গ্রামের মাঝে। সন্ধ্যায় সেখানে গ্রামবাসি বই, পুঁথিপাঠ শুনে জ্ঞান অর্জন করবে এই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু নানা অজুহাতে ছাত্র জুটল না। তবে মুসলমান গ্রামবাসি জমিদারকে অনুরোধ করে ‘ওরা যখন স্কুল নিচ্ছে না তখন আমাদের একজন পণ্ডিত দিন আমরা তাকে রাখব। তার বেতন দেব, তাকে খেতে দেব।’ উক্ত স্কুলটি দীর্ঘদিন ছিল।
শিলাইদহ কাচারি বাড়ি থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত উঁচু করে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু গ্রামবাসির গরুর গাড়ি চলাচলের কারণে মাঝে মধ্যেই রাস্তা ভেঙ্গে যেত। সংস্কার কাজ গ্রামবাসি করত না। তাদের বক্তব্য জমিদারবাবু তাদের প্রয়োজনেই রাস্তা সংস্কার করে নিবেন। এতে রবীন্দ্রনাথ দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে লেখেন, “যারা বহুযুগ থেকে এই রকম দুর্বলতার চর্চ্চা করে এসেছে, যারা আত্মনির্ভরে একেবারেই অভ্যস্ত নয়, তাদের উপকার করা বড়োই কঠিন।” তবু তিনি দমে যাননি।
তিনি সমবায়ের শিক্ষা দিতে শুরু করেন। পল্লী পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে সমবায় ভিত্তিতে ফসল বন্টনের কাজ চলে কিছু দিন। পরে এই প্রকল্পও ব্যর্থ হয়। এর কারণ অশিক্ষা। তাই তো জমিদার রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, অশিক্ষিত উপকারের মত এমন সর্বনেশে আর কিছুই নেই। এর পরেও তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে পিছু হটেননি। পল্লীর উন্নয়নের কথা বিবেচনা করেই তিনি ছেলে রথীন্দ্রনাথ, কর্মকর্তা সন্তোষ চন্দ্র মজুমদার ও পরে জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে কৃষিবিদ্যা ও গবাদি পশু পালন বিদ্যা শিক্ষার জন্য বিলেতে পাঠান।
তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গবাদি পশু পালন এবং উৎপাদিত দুধ সমবায় ভিত্তিতে বাজারজাত ও তা থেকে লাভবান হওয়ার উদাহরণ দিয়েছেন। বিশেষ করে ডেনমার্কে দেখা দুগ্ধ সমবায় পদ্ধতিতে তিনি এদেশের গবাদিপশুর উন্নয়নের কথা বলেন। যার প্রতিফলন ঘটেছে শাহজাদপুর এলাকায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠির উন্নয়নের চেষ্টা ছিল তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, কি ভাবে বা কি করলে মানুষের উন্নতি হয়। তিনি বলেছেন, “সমগ্র দেশ নিয়ে চিন্তা করবার দরকার নেই। আমি একলা ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না । আমি শুধু জয় করব একটি বা দুটি ছোট গ্রাম, এদের মনকে পেতে হবে, এদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সেটা খুব সহজ নয়, খুব কঠিন কৃচ্ছসাধন। আমি যদি কেবল দুটি-তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা-অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে”। এভাবেই তিনি গ্রাম উন্নয়নের পথ দেখিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের পথ প্রদর্শক।
লোভ ও শোষণের ব্যবহারিক উপকরণ ও কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞান ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে উন্নত করে মানুষের বৈষয়িক ও মানসিক অগ্রগতির পরিবেশ সৃষ্টির কথা রবীন্দ্রনাথ প্রায় শত বছর পূর্বে ভেবেছিলেন। তিনি সেদিন কৃষি অর্থনীতি তথা উৎপাদন পদ্ধতির যান্ত্রিকীকরণের মধ্যেই ভারতের দারিদ্র্যের সমস্যার সমাধান দেখেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের মতে সেদিনের সমাজে শ্রেণী শোষণ, শ্রেণীহিংসা, ধনবৈষম্য-যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল, তার মূলে ছিল লোভ। তিনি বিশ্বাস করতেন এই লোভ পরিত্যাগ করতে পারলেই সকল সংকটমুক্ত হওয়া যাবে। যন্ত্রের সাহায্যে কাজে যে মানুষের কায়িক পরিশ্রম লাঘব হবে এবং অর্থনৈতিক লাভ হবে তার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন।
জমিদারির কাজে বসে রবীন্দ্রনাথ মানুষের নানা সমস্যার সমাধান করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে। শাহজাদপুরের মাদলা গ্রামের দরিদ্র জেলে রামগতির খাজনা বকেয়া হওয়ায় জমি নিলামে ওঠার উপক্রম হয়। জেলে রামগতি একটি চিতল মাছ নিয়ে জমিদার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি মাছের দাম পরিশোধ করে দেন এবং রামগতির খাজনাও মওকুফ করে দেন।
রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্ব পাওয়ার পর পতিসর ও শাহজাদপুরে দেখলেন প্রজাদের বসার ব্যবস্থা ভিন্ন। তিনি মানুষে-মানুষে বৈষম্য দূর করার আদেশ দেন তার কর্মচারিদের। হিন্দু ব্রাহ্মণরা ফরাসে বসতেন আর মুসলমান ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা দাঁড়িয়ে থাকতেন অথবা নিচে বসতেন। কবি এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। সে সময়ে এই পরিবর্তন জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সকলেই শাহজাদপুরের দুধ, ঘি-মাখন, ছানা পছন্দ করতেন (প্রতিমাসে ঠাকুর পরিবারের জন্য ১৫ সের ঘি যেত শাহজাদপুর থেকে)। এসব সরবরাহ করতেন রাউতারার গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি জমিদারের কাছে আবেদন করেন গো-চারণ ভূমির জন্য। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে পাঁচ শ’ টাকায় এক শ’ বিরানব্বই বিঘা জমি (সোনাই নদীর চরে) গিরিশ ঘোষের নামে পত্তন দেন।
উল্লেখ্য, এই জমি এবং এর নিকটবর্তী এলাকায় মিল্ক ভিটার বর্তমান গো-চারণ ভূমি। গরীব জেলেদের জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথ উন্মুক্ত জলাভূমি দিয়েছিলেন। এর জন্য জেলেদের কোন কর দিতে হয়নি। শাহজাদপুরে তাঁর সহায়তায় দুটি স্কুল স্থাপিত হয়েছিল। সেটাই ছিল ওই এলাকার প্রথম স্কুল।
কৃষকের উন্নতিকল্পে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে কৃষি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা আলু চাষের সূচনা করেন। এখানে তিনি রেশম চাষ করে সূতা তৈরি করেন। পতিসরেও রেশম ও সবজি চাষের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেন। মৃৎশিল্পী এবং কামারদের আর্থিক সহায়তা দেন। কুষ্টিয়ায় স্থাপন করেন বয়ন বিদ্যালয়। কুমারখালী ও শাহজাদপুরে এখন যে তাঁত শিল্প প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার গোড়া পত্তন ও উন্নতি সাধন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি দেশবাসীকে দেশে তৈরি কাপড় পরার পরামর্শ দেন। এতে দেশীয় তাঁত শিল্প বাঁচবে তার সাথে বাঁচবে তাঁতীরা, এই ছিল তাঁর যুক্তি।
ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়ারিয়া প্রভৃতি রোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য তিনি জন সাধারণকে স্বাস্থ্য শিক্ষা দেন ও কয়েকটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন। প্রজারা যেন অযথা ঝগড়া বিবাদে অথবা মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে না পড়ে এর জন্য তিনি সালিশী বিচারের প্রবর্তন করেন। গঠন করেন বিচার সভা।
বিচার কারো পছন্দ না হলে সে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট আপীল সভায় যেতে পারতো। এই আপীল সভার প্রধান ছিলেন জমিদার নিজেই। বিচারের জন্য বাদী বা বিবাদীকে কোন ব্যয় বহন করতে হতো না। কেবল দরখাস্ত করার জন্য বা কাগজ কেনার জন্য সামান্য কিছু মূল্য দিতে হতো। এ ব্যবস্থা প্রবর্তন হওয়ার পর এলাকায় শান্তি-শৃংখলা বজায় ছিল।
কালিগ্রামে হিতৈষী সভা গঠন করা হয়েছিল প্রজাদের কল্যাণার্থে। হিতৈষী সভায় প্রজারা যে টাকা উঠাতেন সম পরিমাণ টাকা দেয়া হতো জমিদারের তহবিল থেকে। এই টাকায় কয়েকটি পাঠশালা, তিনটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং পতিসরে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। উক্ত তহবিল থেকেই উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুকদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা হয়।
পতিসরে নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক। ট্রাক্টর দিয়ে উন্নত চাষাবাদ ছাড়াও ছাতা তৈরি, মাটির সানকি, খোলা তৈরি ও গামছা-শাড়ি-ধুতি ও লুঙ্গি বুনন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। গড়ে তোলা হয় ধর্মগোলা। সেখানে আপদকালে কৃষকেরা ফসল জমা রাখতো, এখান থেকে সেটা তারা প্রয়োজনে ধার নিতে পারতো।
কালিগ্রাম পরগনায় তিনি আমদানি করা উৎকৃষ্টমানের ভুট্টার বীজ এনে চাষ করেন। আলু, টমেটো ও আখের চাষও শুরু করেন। স্থাপন করেন মাটি পরীক্ষার রসায়নাগার। বাড়ির আঙিনায় শাক-সবজি, ক্ষেতের আইলে আনারস, খেজুর গাছ ও কলাগাছ লাগাতে প্রজাদের উদ্বুদ্ধ করেন। এ কাজের জন্য পুত্র রথীন্দ্রনাথকে নিয়োগ করেন।
তিনি তাঁর স্বপ্নের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কৃষির উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বোলপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিদ্যাপিঠ এবং সেখানেই স্থাপন করেছেন শ্রীনিকেতন। বিশ্বভারতী এখন বিশ্বের অন্যতম বিদ্যাপিঠ। শ্রীনিকেতনে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কৃষি, গবাদিপশু পালন, আসবাবপত্র নির্মাণসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া হয়।
জমিদার শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসপটে যে চিত্র ভেসে ওঠে তা থেকে রবীন্দ্রনাথকে আলাদা করা যায় সহজেই। রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ের মানবিক বোধ এবং পারিবারিক দেশজ প্রীতির কারণে তিনি সমসাময়িক জমিদারদের তুলনায় অনেক বেশি উদার ও মানবিক ছিলেন। তাঁর এই উদারতার প্রতিফলন ঘটেছে শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর, বোলপুর সর্বত্র।
বঙ্গ-ভঙ্গ চাননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সর্বদাই হিন্দু-মুসলিম সু-সম্পর্ক কামনা করেছেন। প্রজারা জমিদার রবীন্দ্রনাথকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন তার প্রমাণ মেলে সর্বশেষ কবি যখন পতিসর আসেন এবং বিদায় নেন তখনকার দৃশ্যে। একজন বৃদ্ধ মুসলমান প্রজা অশ্রু সজল কন্ঠে রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, “হুজুর আমরা হিন্দুদের মতো জন্ম জন্মান্তরবাদ মানি না-মানলে খোদার কাছে এই প্রার্থনাই জানাতাম, বার বার যেন হুজুরের রাজ্যেই প্রজা হয়ে জন্ম নেই।”
সর্বশেষ যখন রবীন্দ্রনাথ পতিসর থেকে কলকাতায় চলে যান, এসব দরিদ্র প্রজারা রবীন্দ্রনাথকে আত্রাই স্টেশন পর্যন্ত পায়ে হেঁটে অনুসরণ করে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
হিন্দু-মুসলিম সুসম্পর্ক ছাড়া দেশের মানুষের কল্যাণ সম্ভব না সেটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাইতো তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বয়ন শিল্পের মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চেয়েছেন। সুশিক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তিতেই মানুষের ভেদ-বুদ্ধির প্রকাশ পাবে এমন বিশ্বাস তিনি লালন করতেন। রবীন্দ্রনাথ বার বার আত্মার পরিশুদ্ধতার বিকাশ লাভের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি বিনয় ও মানবতার শিক্ষায় নিজেদের গড়ে তোলার জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের রচনাসমূহ থেকেই জানা যায় তিনি মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এবং প্রাত্যহিক জীবনের সাথে খুবই পরিচিত ছিলেন। এসব লেখা সম্ভব হয়েছিল মানুষের মনের গভীরের কথা জানার কারণেই। তিনি মানুষের চিত্তের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবতার মুক্তির দীক্ষা দিয়েছেন। তাই তো তিনি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বিশ্বকবির। যিনি ছিলেন মানবতার কবি।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬আগস্ট২০১৪/নওশের
রাইজিংবিডি.কম