সংখ্যালঘু সংশ্লিষ্ট ৬৪৫ ঘটনার অধিকাংশই সাম্প্রদায়িক নয়: সরকার
গত এক বছরে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সরকার। তবে অধিকাংশই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে ঘটেনি বলে দাবি করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার বড় অংশই ছিল অপরাধমূলক, ব্যক্তিগত বিরোধ বা সামাজিক সংঘাতজনিত, যার সঙ্গে ধর্মীয় উস্কানির সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে জানানো হয়, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পুলিশের যাচাইকৃত ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), জেনারেল ডায়েরি (জিডি), চার্জশিট এবং সারাদেশের তদন্ত অগ্রগতির নথি পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে বলা হয়, প্রতিটি অপরাধের ঘটনাই উদ্বেগজনক হলেও, তথ্য-উপাত্তের প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত; যা একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ নির্দেশ করে, অন্যদিকে ভীতি বা বিভ্রান্তির বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
পর্যালোচনায় মোট ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে জানিয়ে বলা হয়, “৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রধানত ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ছিল, পাশাপাশি অল্পসংখ্যক অন্যান্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ব্যক্তি বা সম্পত্তিকে প্রভাবিত করে এমন অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত—যার মধ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ, জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত ঘটনাও রয়েছে।”
বলা হয়, “সব ধরনের অপরাধই গুরুতর এবং জবাবদিহিতা দাবি করে; তবে উপাত্ত থেকে এটি স্পষ্ট যে সংখ্যালঘু ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা বিস্তৃত অপরাধমূলক ও অন্যান্য সামাজিক কারণ থেকে উদ্ভূত। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ভ্রান্ত তথ্য প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং আরও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখে।”
প্রতিবেদনে পুলিশের উল্লেখযোগ্য তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে। কয়েকশ ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা রুজু করা হয়েছে, বহু ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যান্য ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় উপাসনালয় বা সাম্প্রদায়িকভাবে সংবেদনশীল বিষয় জড়িত এমন ঘটনাগুলোতে অপরাধ দমন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন এতে দেখা যায়।
জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ এখনও গুরুতর আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতি বছর সারাদেশে সহিংস অপরাধে গড়ে প্রায় ৩,৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে—যা কোনোভাবেই গর্ব করার মতো বিষয় নয়। প্রতিটি প্রাণহানি একটি ট্র্যাজেডি এবং এমন পরিসংখ্যানের মুখে কোনো সমাজেরই আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। তবে একইসঙ্গে, এই পরিসংখ্যানকে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সহিংস অপরাধ ধর্ম, জাতিগত পরিচয় ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সব সম্প্রদায়কেই প্রভাবিত করে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছে উল্লেখ করে বলা হয়, “উন্নত পুলিশিং ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় জোরদার, দ্রুত সাড়া প্রদান এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ফলে ধীর হলেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ আরও কমিয়ে আনতে এবং আইনের আওতায় সবার জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ—যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে জানিয়ে এতে বলা হয়, “প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি নৈতিক কর্তব্য। উপাসনালয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, উসকানি প্রতিরোধ করা, অপরাধমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুজব থেকে সত্যকে আলাদা করা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অত্যাবশ্যক।”
এই প্রতিবেদনটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যে উপস্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, “এতে চ্যালেঞ্জ অস্বীকার করা হয়নি, আবার স্বস্তিদায়ক বলেও দাবিও করা হয়নি। বরং, এটি বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলছে এমন অপরাধ প্রবণতার একটি বাস্তব, প্রমাণ-ভিত্তিক চিত্র তুলে ধরার জন্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। গঠনমূলক পর্যালোচনা, দায়িত্বশীল প্রতিবেদন এবং ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এই তিনটিই আইনশৃঙ্খলার অগ্রগতির অপরিহার্য।”
সাম্প্রদায়িক উপাদানযুক্ত ৭১টি ঘটনার মধ্যে ৩৮টি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা, ৮টি মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, একটি করে মন্দিরে চুরি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে। এছাড়া ২৩টি ঘটনায় প্রতিমা ভাঙার হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট এবং উপাসনালয়ের আঙ্গিনায় ক্ষয়ক্ষতির মতো অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশ ৫০টি মামলা দায়ের করেছে, ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ২১টি ঘটনায় অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক উপাদান নেই—এমন ৫৭৪টি ঘটনার মধ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি, যার সংখ্যা ১৭২টি। এছাড়া চুরি ১০৬টি, ধর্ষণ ৫৮টি, প্রতিবেশী বিরোধ ৫১টি, পূর্বশত্রুতাজনিত ঘটনা ২৬টি এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনা ২৩টি। বাকি ১৩৮টি ঘটনা অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এসব অসাম্প্রদায়িক ঘটনায় পুলিশ ৩৯০টি মামলা দায়ের করেছে, ১৫৪টি ইউডি মামলা রুজু করা হয়েছে এবং ৪৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া, ৩০টি ঘটনায় অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।