মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে আইন–নীতিতে অগ্রগতি: ফরিদা আখতার
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প সময়ের মধ্যেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই উৎপাদন, সম্পদ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রান্তিক খামারি ও জেলেদের স্বার্থরক্ষায় একাধিক আইন, অধ্যাদেশ ও নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে খাতে গৃহীত কার্যক্রম ও অর্জন তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।
মৎস্য খাতে আইন ও নীতিমালার সংস্কার
উপদেষ্টা জানান, ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও ২০২৬’ জারির মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা, ইলেক্ট্রোফিশিং নিষিদ্ধকরণ এবং অন্যান্য এলাকা-ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা (OECM) আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে। পাশাপাশি ‘জাতীয় মৎস্য নীতিমালা, ২০২৬’, ‘জাতীয় মৎস্য পদক নীতিমালা, ২০২৬’, ‘মৎস্য খাদ্য বিধিমালা, ২০২৪’, ‘মৎস্য সঙ্গনিরোধ বিধিমালা, ২০২৪’ এবং ‘মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, সামুদ্রিক জলসীমায় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা ৬৫ দিনের পরিবর্তে ৫৮ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্র ব্যতীত বাণিজ্যিক ট্রলারে SONAR ব্যবহারে দুই বছরের জন্য স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ খাতে নীতিগত অগ্রগতি
প্রাণিসম্পদ খাতে ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা, ২০২৬’, ‘প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ বীমা নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘জাতীয় কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা, ২০২৬’ ও ‘ভেটেরিনারি ঔষধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ খসড়া আকারে প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা।
উৎপাদন ব্যয় কমাতে প্রণোদনা
ফরিদা আখতার বলেন, “মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে খামারিদের বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট সুবিধা এবং এ খাতে ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি বাজারে মূল্য স্থিতিশীল থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ
জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ভিজিএফের আওতায় নিবন্ধিত উপকারভোগীর সংখ্যা ১৩ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৬ জন থেকে বাড়িয়ে ১৫ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর এলাকার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা সময়ে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আসছেন বলেও জানান তিনি।
ইলিশ ও দেশীয় মাছ সংরক্ষণ
উপদেষ্টা বলেন, “ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ছয়টি অভয়াশ্রম এবং বঙ্গোপসাগরে সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের এবং সমুদ্রে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।”
এছাড়া, বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ সংরক্ষণে সারাদেশে ৬৬৯টি অভয়াশ্রম পরিচালিত হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বাড়াতে রয়েছে সাতটি অভয়াশ্রম।
হালদা নদী ও জাতীয় অবদান
হালদা নদীকে ‘মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। নদীর প্রজনন ক্ষেত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৬টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে হালদা নদী থেকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ৮০০ কোটি টাকার বেশি অবদান রাখছে।
প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা
তিনি জানান, পিপিআর নির্মূলে ৩ কোটি ৬১ লাখের বেশি ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে। ক্ষুরারোগ (FMD) নিয়ন্ত্রণে প্রয়োগ করা হয়েছে প্রায় ৪৬ লাখ ডোজ টিকা। গবাদিপশুর ১৭টি রোগের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৬ লাখের বেশি ডোজ এবং হাঁস-মুরগির জন্য ৫৩ কোটি ৯৫ লাখের বেশি ডোজ টিকা উৎপাদন করা হয়েছে।
এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) প্রতিরোধে স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন ও স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি জুনোটিক রোগ শনাক্ত ও নজরদারির জন্য একটি বিশেষায়িত ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে।
রমজানে সুলভ মূল্যে বিক্রি
রমজান মাসে ২৬ দিন ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ড্রেসড ব্রয়লার ২৪৫ টাকা কেজি, দুধ ৮০ টাকা লিটার, ডিম ৮ টাকা পিস এবং গরুর মাংস ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তা ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ
ফরিদা আখতার বলেন, “২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত COP30 সম্মেলনে প্রথমবারের মতো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু খরা বা বন্যায় সীমাবদ্ধ নয়; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সম্পদের ওপর এর প্রভাব আরো তীব্রভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।” এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পূর্ণাঙ্গ খাতের মর্যাদার দাবি
জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত এখনো ‘কৃষির উপখাত’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, এতে নীতি ও পরিকল্পনায় খাতটি কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায় না। এ কারণে খাতটিকে পূর্ণাঙ্গ খাতের মর্যাদা ও প্রাপ্য সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টা, পরিকল্পনা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের-এর উপস্থাপনায় আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সচিব ইমাম উদ্দীন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঢাকা/এএএম/জান্নাত