প্রধান জামাতের জন্য প্রস্তুত জাতীয় ঈদগাহ
দীর্ঘ সময় পর প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাতে অংশ নিতে যাচ্ছেন। তাই, এবার ঈদের প্রধান জামাত আয়োজনে থাকছে বাড়তি সতর্কতা ও নিরাপত্তা। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় হতে যাচ্ছে এ আয়োজন। ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সাজানো হয়েছে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান। এর মধ্যে রয়েছে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, ফ্যান ও এসির ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধাদি। ময়দানের আয়তন প্রায় ২৫ হাজার ৪০০ বর্গমিটার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিআর এন্টারপ্রাইজ ২৮ দিনের পরিশ্রমে এ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
এবারের প্রধান জামাতে ইমামতি করবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কূটনীতিক এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এতে অংশে নেবেন।
জাতীয় ঈদগাহের প্রস্তুতি যেমন হলো
পিআর এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি রাশেদুল হক জানিয়েছেন, মাঠের কাজ শুরু হয়েছিল রমজানের প্রথম দিন। প্রতিদিন শতাধিক কর্মী কাজ করেছেন। প্যান্ডেলের কাঠামোতে ব্যবহার করা হয়েছে ৪৩ হাজারের বেশি বাঁশ এবং স্থিতিশীল রাখতে ১৫ টনের বেশি রশি। বৃষ্টি মোকাবিলার জন্য ১ হাজার ৯০০টি উন্নত মানের ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। আলোকসজ্জার জন্য প্রায় ৯০০টি টিউবলাইট স্থাপন করা হয়েছে।
ময়দানে মোট ১২১টি কাতার তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি বড় ও ৫০টি ছোট কাতার। কাতারগুলো সাজানো হয়েছে আবহাওয়া, পরিবেশ এবং মুসল্লিদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে। মূল প্যান্ডেলের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। আশপাশের খালি জায়গা, সড়ক এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের এলাকা মিলিয়ে ধারণক্ষমতা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ হতে পারে।
ডিএসসিসি প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাঠের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করা হয়েছে। মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য মাটিতে আরামদায়ক কার্পেট বিছানো হয়েছে। তাই, এবার কাউকে বাড়ি থেকে জায়নামাজ আনতে হবে না।
সুবিধা ও পরিবেশ
মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে মাঠে স্থাপন করা হয়েছে ১ হাজার ১০০টির বেশি ফ্যান। এর মধ্যে ৯০০টি সিলিং ফ্যান এবং বাকিগুলো স্ট্যান্ড ফ্যান। ভিআইপি এলাকার জন্য পর্যাপ্ত এসি স্থাপন করা হয়েছে।
ভিআইপি মুসল্লিদের জন্য ৩৩০টি আসন সংরক্ষিত। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ২৫০টি এবং নারীদের জন্য ৮০টি। সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে পুরুষদের জন্য ৩১ হাজার এবং নারীদের জন্য ৩ হাজার ৫০০টি আলাদা স্থান রাখা হয়েছে।
মাঠের ভিতরে একসঙ্গে ১৪০ জনের জন্য অজুর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ১১৩টি ও নারীদের জন্য ২৭টি। পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে মুসল্লিদের জন্য।
স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা
জাতীয় ঈদগাহে মুসল্লিদের জন্য সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দুটি মেডিকেল টিম মোতায়েন থাকবে। জরুরি প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার এবং অন্যান্য সহায়তামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ডিএসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।
নিরাপত্তা
ঈদের প্রধান জামায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকবে পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভিআইপি ও সাধারণ মুসল্লিদের জন্য মোট চারটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভিআইপিদের জন্য একটি। সাধারণ পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা ফটক রয়েছে। নামাজ শেষে মুসল্লিদের দ্রুত বের হওয়ার জন্য মোট ৭টি বহির্গমন পথ রাখা হয়েছে।
পুরো ঈদগাহ এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও প্রস্তুত। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের ধারালো বা দাহ্য পদার্থ সঙ্গে আনতে বারণ করা হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা
মাঠ পরিদর্শন শেষে ডিএসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, আকস্মিক বৃষ্টি বা ঝড়ের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বৃষ্টি প্রতিরোধী শামিয়ানা এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধান জামাত সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে তা সকাল ৯টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে হবে। মসজিদের পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে স্থাপিত মাইকের মাধ্যমে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা ইমামের কণ্ঠ শুনতে পারবেন।
ইতিহাস ও প্রশাসনিক দায়িত্ব
১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে এই মাঠকে জাতীয় ঈদগাহ ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এর ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব পালন করছে। প্রতি বছর এটি দেশের প্রধান ঈদ জামাতের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এবারের আয়োজন আগের বছরগুলোর তুলনায় আরো আধুনিক ও আরামদায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিএসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা আতাউর হোসেন বলেছেন, “জাতীয় ঈদগাহের প্রস্তুতি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। সকল পরিকল্পনা করা হয়েছে মুসল্লিদের সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।”
পিআর এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি রাশেদুল হক বলেছেন, ২৮ দিন ধরে মাঠকে নামাজের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তাই প্রধান লক্ষ্য ছিল। আমরা মাঠের প্রতিটি অংশের প্রস্তুতিতে সতর্ক ছিলাম।
ডিএসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, “ঈদগাহে মুসল্লিদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।”
সেগুনবাগিচার বাসিন্দা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা সেলিম উদ্দীন বলেছেন, “এবার জাতীয় ঈদগাহের ব্যবস্থা অনেক উন্নত। এবার জায়নামাজ বহন করার প্রয়োজন নেই। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়েও আশ্বস্ত করা হয়েছে। ঈদের প্রধান জামাতের জন্য এই আয়োজন প্রশাসন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল।”
ঢাকা/এএএম/রফিক