ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৯ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৬ ১৪৩২ || ২৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

পঞ্চগড়ে পরিবারহীন ১৬০ শিশুর ঈদ কাটে ভিন্ন বাস্তবতায়

আবু নাঈম, পঞ্চগড় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩০, ১৯ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৩:৩৩, ১৯ মার্চ ২০২৬
পঞ্চগড়ে পরিবারহীন ১৬০ শিশুর ঈদ কাটে ভিন্ন বাস্তবতায়

পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর ১৬০ জন শিশুর অনেকে জানে না বাবা-মা কে। তবে তারা সেখানে নতুন পরিবেশে বড় হচ্ছে।

ঈদ মানে পরিবার, স্বজন আর আনন্দ ভাগাভাগি। কিন্তু পঞ্চগড়ের একটি শিশু নগরীতে এমন অনেক শিশু আছে, যারা জানেই না তাদের পরিবার কোথায়। কেউ ছোটবেলায় হারিয়ে গেছে, কেউবা বাবা-মা হারিয়ে আশ্রয় পেয়েছে এখানে। ফলে তাদের ঈদ কাটে পরিবার ছাড়াই, এক ভিন্ন বাস্তবতায়।

শুককুর আর ফাহিম। একজনের বয়স ৮, আরেকজনের ১২। তারা জানে না, তাদের বাবা-মা কে, কোথায় তাদের বাড়ি। ছোটবেলায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আশ্রয় হয়েছে পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে। ফলে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের অনুভূতি তাদের কাছে অচেনা।

আরো পড়ুন:

শুককুর আলী জন্মের পর থেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বেড়ে উঠতে শুরু করে পথশিশু হিসেবে। একসময় স্টেশন থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এরপর ঠাঁই হয় শিশু নগরীতে। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দের অনুভূতি তার কাছে অচেনা। তবে ঈদের দিন এখানে নতুন পোশাক, একসঙ্গে নামাজ, ভালো খাবার- এ সব তার অনেক ভালো লাগে। 

ফাহিম ৬ বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়ার পর আর খুঁজে পায়নি পরিবারকে। মা আগেই মারা গেছেন, বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ সেই হারানোর দিন থেকে। ফাহিমের কণ্ঠে আবেগ, ‘‘ইচ্ছা ছিল পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব। এখন স্যাররাই আমার পরিবার।’’ 

তার স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে পথশিশুর কঠিন জীবন- বোতল কুড়ানো, অনিয়মিত খাবার। তবে এখানে এসে নতুন জীবন পেয়েছে। খাওয়া, পড়ালেখা, কাপড়- সবই ফ্রি। ঈদও ভালো লাগে। 

শুককুর-ফাহিমের মতো আরো অনেক শিশুর ঠিকানা এখন এই শিশু নগরী। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ১৬০ জন শিশু বসবাস করছে। তাদের মধ্যে কেউ বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে, কারও আছে শুধু মা কিংবা শুধু বাবা। আবার কেউ একেবারেই পরিবারহীন।

১২ বছর বয়সী সাগর ইসলাম এখনো মনে করতে পারে পুরান ঢাকার সেই বাড়ির কথা। ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সাত বছর কাটিয়েছে কমলাপুর এলাকায়। পরে ইউসুফ নামে এক সমাজকর্মীর মাধ্যমে আশ্রয় পায় এই শিশু নগরীতে। সাগর বলে, ‘‘এখানে এসে ভালোই লাগে। ঈদে নতুন কাপড়, আতর, মেহেদি- সবই পাই।’’ 

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে হারিয়ে যাওয়া ১৪ বছর বয়সী সাজ্জাদুল ইসলাম বাইজিদের গল্পও কম কষ্টের নয়। ‘‘মা দোকানে গেছিল, আমি ঘুরতেছিলাম। পরে দেখি মা নাই’’— কণ্ঠে তার চাপা বেদনা। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারকে ভুলতে পারেনি সে।

বাইজিদ বলে,‌ ‘‘সবার মতো আমারও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ইচ্ছা করে।’’ ইমাম মাহাদী (১৪) হারিয়ে যায় ২০১৯ সালে। ঢাকায় এসে পড়ে এবং পথশিশুর জীবনে নানা নির্যাতনের শিকার হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় আশ্রয় পায় এখানে।

মাহাদী বলে, ‘‘এখানে ঈদের নামাজ পড়ি। পড়ালেখা করি। স্যাররাই এখন আমার মা-বাবা।’’ সাত বছর বয়সী জয়নালের গল্প আরও হৃদয়বিদারক। তার দাবি, সন্ত্রাসীদের হাতে তার বাবা-মা নিহত হয়েছে। পরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে একসময় এই শিশু নগরীতে এসে ঠাঁই পায় সে। 

ঈদের আনন্দ থেকে যেন তারা বঞ্চিত না হয়, সেজন্য শিশুদের জন্য নতুন পোশাক, ভালো খাবারসহ বিভিন্ন আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। শুধু আশ্রয়ই নয়, এখান থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগও পায় তারা।

আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন, ‘‘এখানে ১৬০ জন পরিবারবিহীন শিশু আছে। আমরা চেষ্টা করি তাদের একটি পারিবারিক পরিবেশ দিতে, যেন ঈদে তারা কষ্ট না পায়।’’ 

আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় জানান, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা আহছানিয়া মিশনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এখানে শিশুদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘‘প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের প্রস্তুতি নিয়েছি। নতুন পোশাক, ভালো খাবার, এমনকি মাংসের জন্য ছাগলও কেনা হয়েছে। আমরা চাই, তারা যেন পরিবারের অভাব কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারে।’’ 

ঢাকা/বকুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়