ঢাকা     বুধবার   ১৮ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৫ ১৪৩২ || ২৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

‘একটি কুকুর ছানা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল’

নিউজ ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৯, ১৮ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৭:২৪, ১৮ মার্চ ২০২৬
‘একটি কুকুর ছানা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল’

সময়টা ২০১৭ সাল। রাজশাহীর মাসকাটাদিঘীর দেওয়ান পাড়া মোড়ে একটি মা কুকুর মরে পড়ে আছে। আর তার চারটি ছানা দুধ খাচ্ছে। এর মধ্যে একটি বেশ দুর্বল। তার একটা পা খেয়ে ফেলে ছুঁচো। অনেকেই এই দৃশ্য দেখে চলে গেলেও সালাহউদ্দিন নীল পারেননি। সুস্থ তিনটি বাচ্চা বেঁচে গেলেও পা হারানো কুকুর ছানাটি কীভাবে বাঁচবে সে চিন্তা ভর করে তার ওপর।

অসুস্থ কুকুর ছানাটিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন সালাহউদ্দিন। শুরু করেন যত্ন। একটু একটু করে সুস্থ হয়ে ওঠে কুকুর ছানাটি। সালাহউদ্দিন বলেন, “প্রথম উদ্ধার করা সেই কুকুর ছানাটিকে বাঁচিয়ে তুলতে গিয়ে আমি বুঝেছি জীবন আসলে কী? কেন আমি পৃথিবীতে এসেছি? তখন থেকেই আমি পশু-পাখির রেসকিউ কাজ শুরু করি। এটাই আমার কাজ, এটিই আমার জীবন হয়ে ওঠে।”

আরো পড়ুন:

৩৭ বছর বয়সী সালাহউদ্দিন বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণাগারে চাকরি করেন। বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার সমসাদীপুর এলাকায়। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ২০১০ সালে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এর আগে, ঢাকায় আইসিডিডিআরবি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এবং ব্র্যাকে কাজ করেছেন। তবে, ২০১৭ সালে তিনি যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সামান্য বেতনের টাকায় পশু-পাখি উদ্ধার করে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় তিনি দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গবেষণা শেষে ৩টি ইঁদুর ছানা ক্যাম্পাসে ছেড়ে দিচ্ছেন। সেগুলো এতোই ছোট যে অন্য কোনো প্রাণি তাদের খেয়ে ফেলতে পারে। তাই সালাহউদ্দিন সেগুলো বাড়িতে নিয়ে আসে।

এসব কাজের জন্য শুরুতে বেশ বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। সালাহউদ্দিন বলেন, ‘অনেকেই-তো আমাকে পাগলও বলতো। এমনকি বিয়ের আগে আমার বাড়িতে ছিল ২৪টি বিড়াল ও ২০০টি সুইস অ্যালবিনো জাতের ইঁদুর। নতুন বউ বাসায় এসে এসব দেখে মন খারাপ করতে পারেন। তা ভেবে বিড়ালগুলো অন্যদের দিয়ে দিয়েছিলাম। আর ইঁদুরগুলো লুকিয়ে রাখি এক বন্ধুর বাড়িতে।”

কুড়িয়ে পাওয়া এই জাতের ইঁদুর পুষতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তার বাড়িতে একটি ইঁদুরের খামার দাঁড়িয়ে যায়। সেখান থেকে কিছু আয়ও হতে থাকে। পরে সালাহউদ্দিনের স্ত্রী এসব শুনে বললেন, “খারাপ কী? ইঁদুরগুলো বাড়িতে নিয়ে আসো।” এরপর ইঁদুরগুলো আবার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে ইঁদুর সরবরাহ করেন তিনি। তার খামারে কাজ করছেন ১৮ জন কর্মী। 

ইঁদুরের পাশাপাশি চলতে থাকে বণ্য প্রাণী উদ্ধার ও সুস্থ করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার কাজ। এর মাঝে তিনি সাপ উদ্ধারের জন্যও প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে কাজটা করি, সেটা অনেকটা নার্সের মতো। রাজশাহীর ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। কোনো বিপন্ন প্রাণি পেলে আমি তাদের ফোন করি। আমি নিজে ট্রিটমেন্ট দিই না, কারণ আমি ডাক্তার নই। ভিডিও কলে অবস্থা দেখাই, তারা যা করতে বলে সেটাই করি। খুব জরুরি হলে ক্লিনিকে নিয়ে যাই। এসব চিকিৎসার খরচ নিজের পকেট থেকেই দিই।”

“কিছুদিন আগে রাজশাহীর বাখরাবাজ গ্রাম থেকে ফোন আসে আমার কাছে, একটি চিল আহত অবস্থায় পড়ে আছে, ডানা ভেঙে গেছে। কেউ কেউ সেটিকে চিড়িয়াখানায় দিতে চেয়েছিল, কিন্তু চিড়িয়াখানা-তো এভাবে নেয় না”, এমনটাই বলেছিলেন সালাহউদ্দিন। পরে তিনি চিলটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। চিকিৎসা দেন। চিলটির নাম দেন তিনি ‘ইরিডিয়াম’। ডানার পালকগুলো নষ্ট হয়ে পাখাগুলো বেরিয়ে ছিল। প্রায় দুই মাস চিকিৎসা দেয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে।

চিকিৎসার পর তিনি দুইবার চিলটিকে ছেড়ে দেন। কিন্তু সে যায় না, আশপাশেই থাকে। তৃতীয়বার ছেড়ে দিলে সে উড়ে যায়। সালাহউদ্দিন ভাবেন, চিলটি হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু দুইদিন পর আবার ফিরে আসে। তিনি বলেন, “এর আগেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, প্রাণিগুলোকে অবমুক্ত করা হলেও যেতে চায় না। এরকম একটি হুতুম প্যাঁচাকে সুস্থ করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলেও সে যায় না। তিনবার ফিরে আসে প্যাঁচাটি।” এমনকি তার সাথে সাথে প্যাঁচাটিও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতো বলে জানান তিনি। বসে থাকতো গবেষণাগারে। ফেরার সময় আবারো একসাথে ফিরতো বাড়িতে।

বিষয়টি দেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহ রেজা পরামর্শ দেন, প্যাঁচাটিকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেখা যেতে পারে। খাবার বন্ধ করে দিলে প্যাঁচাটি শেষ পর্যন্ত চলে যায়। কিন্তু সালাহউদ্দিন এখনো সেটিকে মিস্ করেন। তিনি বলেন, “রেসকিউ করা যেমন আনন্দের। তেমনই তারা চলে গেলেও খারাপ লাগা কাজ করে।”

সালাহউদ্দিন এ পর্যন্ত ৫৩টি বিপন্ন পাখি, ২০০টি কুকুর, ২৫০টি বিড়াল, ১৫০টি সাপ এবং ১২টি বিপন্ন প্যাঁচা উদ্ধার করেছেন। সেগুলো সুস্থ হয়ে প্রকৃতির মাঝে ফিরে গেছে।

সালাহউদ্দিন মনে করেন, রাজশাহীতে প্রাণী রেসকিউ করার চ্যালেঞ্জ অনেক। নিরাপদ আশ্রয় নেই, হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। অনেকেই প্রাণি ভালোবাসেন, কিন্তু সময় বা সুযোগ হয়ে ওঠে না তাদের। তাই তিনি নিজের তহবিল ও সময় দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভবিষ্যতে তার লক্ষ্য রাজশাহীতে একটি স্থায়ী রেসকিউ সেন্টার গড়ে তোলা। যেখানে আহত প্রাণিরা নিরাপদে থাকবে, চিকিৎসা পাবে; সুস্থ হয়ে প্রকৃতিতে ফিরে যাবে।

[ফিচারটি লিখেছেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিনিকেশন এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়াম সাঈদ, অপু কুমার, অনিন্দিতা পান্ডে তনু, সাধ্য সাচী, জাফর ইবনে সিদ্দিক শামিল]

ঢাকা/জান্নাত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়