ঢাকা     রোববার   ০৩ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২০ ১৪৩৩ || ১৫ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ডিসি সম্মেলন শুরু আজ 

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৩৭, ৩ মে ২০২৬  
ডিসি সম্মেলন শুরু আজ 

বিএনপি সরকার গঠনের পর আজ শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন। এবার ৮ বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে আসা ১ হাজার ৭২৮টি প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে আলোচনার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে ৪৯৮টি। রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান ও স্পিকারের সঙ্গে পৃথক সাক্ষাতের সূচি থাকায় এবারের সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

রবিবার (৩ মে) সকাল সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে। এরপর দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনা। সমাপনী অধিবেশনও ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে হবে।

আরো পড়ুন:

নিরাপত্তা চান ডিসিরা
দেশের সব জেলা প্রশাসকের বাসভবনে বাবুর্চি নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো লিখিত প্রস্তাবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের জেলাগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’ এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলা সদরে জনবল ও সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু বাস্তবে ক্যাটাগরি নির্বিশেষে সব জেলা প্রশাসকের বাসভবনে বাবুর্চি পদ নেই। 

প্রস্তাবে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসকের বাংলো শুধু তার আবাসস্থল নয়। এটি জেলা প্রশাসকের অনানুষ্ঠানিক কার্যালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ভিআইপি প্রটোকল, মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের সফরসহ নানা রাষ্ট্রীয় কাজে গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক হয় বাংলোতে। গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের আপ্যায়নের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বাবুর্চি না থাকায় প্রশাসককে ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় এসব সামলাতে হয়, যা দাপ্তরিক কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে। 

এ কারণে বাংলোর মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় কাজের প্রয়োজন ও জেলা প্রশাসকের পদমর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ক্যাটাগরি নির্বিশেষে প্রতিটি জেলা প্রশাসকের বাসভবনে একটি করে বাবুর্চি পদ সৃজনের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের বাসভবন ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার প্রস্তাবও এসেছে। এখন অনেক জেলায় বাংলো ও অফিসে প্রয়োজনীয় আনসার সদস্য নেই। সিসিটিভি কাভারেজ অপ্রতুল। রাতের বেলায় বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি থাকে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।

ইউএনওর  প্রস্তাব

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে মালি নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন ভোলার জেলা প্রশাসক। প্রস্তাবের পক্ষে তিনি বলেছেন, সরকারের নির্দেশনায় নাগরিক সেবার পরিবেশ উন্নত করতে এবং কার্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়াতে গত কয়েক বছরে প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় চত্বরে মনোমুগ্ধকর ফুলের বাগান সৃজন করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, সভা-সেমিনারে এসব বাগান কার্যালয়ের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়ায়। 

কিন্তু সমস্যা হলো, এসব বাগান নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইউএনও অফিসে কোনো অনুমোদিত মালি পদ নেই। অফিস সহায়ক বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে মাঝে মাঝে কাজ চালানো হলেও তাদের দক্ষতা নেই। ফলে সঠিক পরিচর্যার অভাবে দামি ফুলের গাছ মরে যায়, বাগান অযত্নে নষ্ট হয়। সরকারের বিনিয়োগ কাজে আসে না। এ অবস্থায় প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একজন করে মালি পদ সৃজন করা জরুরি বলে প্রস্তাবে মত দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে একজন বেকারের কর্মসংস্থান হবে বলেও যুক্তি দেওয়া হয়।

১৭২৮ থেকে বাছাই ৪৯৮ প্রন্তাব 
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, এবারের ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে ৮ জন বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জন জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে মোট ১ হাজার ৭২৮টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করে। এর মধ্যে নীতি-নির্ধারণী গুরুত্ব, আন্তঃমন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টতা, বাজেট ও মাঠ প্রশাসনের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এসব বিবেচনায় ৪৯৮টি প্রস্তাব আলোচনার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। 

বাছাই হওয়া প্রস্তাবগুলো মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ভাগ করে সম্মেলনের কার্য-অধিবেশনের সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাকি ১ হাজার ২৩০টি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পরবর্তী ব্যবস্থার জন্য পাঠানো হবে।

এবারের সম্মেলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো সাংবিধানিক পদধারীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের নির্ধারিত সাক্ষাৎ। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমান বাহিনী প্রধান ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে পৃথক সভা করবেন ডিসিরা। 

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ডিসি সম্মেলনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সূচি ছিল না। সে সময় স্পিকার পদও শূন্য ছিল বলে স্পিকারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়নি। এর আগের সব সম্মেলনেই রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের রেওয়াজ ছিল। এক বছরের বিরতির পর এবার আবার সেই ধারায় ফিরছে ডিসি সম্মেলন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করা বিএনপির এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন। নতুন সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে মাঠ প্রশাসনকে সরাসরি অবহিত করা এবং মাঠের বাস্তবতা সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানানো এই দুই উদ্দেশ্যেই সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

সরকারের নীতিনির্ধারক, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময় এবং মাঠ পর্যায়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য প্রতি বছর এই সম্মেলন আয়োজন করা হয়। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার সময় বাড়িয়ে চার দিন করা হয়েছে।

অন্যান্য প্রস্তাব
বাবুর্চি ও মালি পদ সৃজনের পাশাপাশি আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আছে ৪৯৮টির তালিকায়। এর মধ্যে আছে জেলা প্রশাসকের জন্য জিপ গাড়ির পরিবর্তে স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল এসইউভি বরাদ্দ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, ভূমি অফিসের জনবল সংকট নিরসন, সার্বক্ষণিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি, উপজেলা পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন, হাওর এলাকার জন্য স্পিডবোট, পার্বত্য জেলার জন্য যোগাযোগ ভাতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। 

এছাড়া, জেলা প্রশাসকদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট, দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য অগ্রিম বরাদ্দ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন, এবং সাইবার অপরাধ দমনে জেলা পর্যায়ে বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাবও আছে। 

নির্ধারিত ৪৯৮টি প্রস্তাবের বাইরেও ডিসিরা সম্মেলনের মুক্ত আলোচনা ও কার্য-অধিবেশনে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠ পর্যায়ের নানা সমস্যা ও দাবি তুলে ধরবেন। প্রতিবারই এমন অর্ধশতাধিক অলিখিত প্রস্তাব উঠে আসে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা। সেগুলোও পরবর্তী সময়ে কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

সম্মেলনের ঐতিহ্য 
ডিসি সম্মেলন ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা একটি প্রশাসনিক রেওয়াজ। তখন এর নাম ছিল ‘কনফারেন্স অব কালেক্টরস’। পাকিস্তান আমলে এটি ‘ডেপুটি কমিশনারস কনফারেন্স’ নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন’ নামে এটি নিয়মিত আয়োজন হয়ে আসছে।
 
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এই সম্মেলনকে বলা হয় কেন্দ্র ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধ। এখানে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এই দুই স্তরের মধ্যে সরাসরি সংলাপ হয়। ফলে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মাঠের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আবার সরকারের উন্নয়ন দর্শন ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে মাঠ প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা পায়।

তথ্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোল্লা আহমদ কুতুবুদ দ্বীন জানান, আগামী ৩ থেকে ৬ মে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬।  এবারের সম্মেলনে মোট ৩৪টি কার্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকা/এএএম/ইভা 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়