Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ১০ ১৪২৮ ||  ০৯ রমজান ১৪৪২

প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম: অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ      

মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২৭, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:০৬, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১
প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম: অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ      

১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে ‘বানান সংস্কার সমিতি’ গঠন করেছিল তার সভাপতি ছিলেন রাজশেখর বসু। তিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ (তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৩৭) প্রকাশিত হওয়ার ষোল বছর পর, সেকালের অনেক লেখকের রচনায় ঐ নিয়ম লঙ্ঘিত হতে দেখে দুঃখ করে বলেছিলেন: ‘বাঙালীর নিয়মনিষ্ঠার অভাব আছে। রাজনীতিক নেতা বা ধর্মগুরুর আজ্ঞা বাঙালী ভাবের আবেগে সংঘবদ্ধ হয়ে অন্ধভাবে পালন করতে পারে, কিন্তু কোনও যুক্তিসিদ্ধ বিধান সে মেনে নিতে চায় না।’ [বাংলা ভাষার গতি, বিচিন্তা]

কথাগুলি মিথ্যে নয়। কিন্তু তা সত্য হলেও, বাংলা বানানে নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থেমে থাকেনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হয়েছে, বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে তা প্রকাশ ও প্রচার করেছে। ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’, আমাদের ভাষা-সাহিত্যের জাতীয় প্রতিষ্ঠান, বাংলা একাডেমির এমনই একটি প্রচেষ্টার ফসল।

বাংলা একাডেমি এই নিয়ম প্রণয়নে উদ্যোগী হয় ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে। প্রথমে, এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাডেমি একটি বিশেষজ্ঞ-কমিটি গঠন করে। এই কমিটি বানান সম্বন্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে একাডেমির কাছে পেশ করে। নভেম্বর, ১৯৯২ সালে একাডেমি তা ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে ছাপিয়ে মতামত জরিপের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে পাঠায়। পরে, প্রাপ্ত মতামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে, একাডেমি নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে এবং ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে এর তৃতীয় সংস্করণ প্রণীত হয়। আর, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় এর পরিমার্জিত অর্থাৎ চতুর্থ সংস্করণ।

উল্লেখ্য যে, ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বানানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলা একাডেমির প্রথম নয় বরং দ্বিতীয় ও সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার ফসল। এক্ষেত্রে একাডেমি প্রথম প্রয়াসটি চালিয়েছিল ১৯৬৩ সালে। সে-সময় একাডেমি বাংলা বানান ও লিপির সংস্কার সম্বন্ধে একটি সুপারিশমালা প্রকাশ ও প্রচার করে। কিন্তু এদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই ঐ সুপারিশমালা গ্রহণ করেনি। বাংলা একাডেমির পুস্তক-পত্রিকাদিতেও তা অনুসৃত হয়নি। যে-বিশেষজ্ঞগণ একাডেমির সুপারিশমালা প্রণয়নের কাজে যুক্ত ছিলেন তারাও কেউ কখনো নিজেদের রচনায় প্রস্তাবিত বানান-পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। শুধু তা-ই নয়, ঐ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ‘পরবর্তীকালে ভিন্নমত প্রচার করেন।’ [মুনীর চৌধুরী, বাঙলা গদ্যরীতি]

এক কথায়, বাংলা একাডেমির সেই সংস্কার-প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিল শোচনীয়ভাবে। সম্ভবত সে-কারণেই দ্বিতীয় ও সাম্প্রতিক প্রয়াসে একাডেমি বানান-সংস্কারের পরিবর্তে বানানের নিয়ম বেঁধে দেওয়ার কাজ করেছে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে একাডেমি এবিষয়ে বলেছে: ‘আমরা এই নিয়মে বানান বা লিপির সংস্কারের প্রয়াস না করে বানানকে নিয়মিত, অভিন্ন ও প্রমিত করার ব্যবস্থা করেছি।’

বাংলা একাডেমির প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. মনসুর মুসা, তাঁর ‘বানান: বাংলা বর্ণমালা পরিচয় ও প্রতিবর্ণীকরণ’ (২০০৭) গ্রন্থের ভূমিকায়, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম সম্বন্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। বলেছেন, ১৯৯২ সালে একাডেমি যে বানান কমিটি গঠন করেছিল তার একজন সদস্য কর্তৃক প্রণীত ‘আদর্শ বাংলা বানান: নিয়ম ও শব্দকোষ’ (১৯৯০) পুস্তিকায় বিধৃত বানানবিধি ‘কিছু এদিক-ওদিক করে এবং একটি নতুন ভূমিকা লিখে... বাংলা একাডেমীর বানান হিসেবে গ্রহণ করে কাউন্সিলের অনুমোদন নিয়ে’ প্রচার করা হয়েছে। এই অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন নয়। ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে’র প্রথম তিন সংস্করণের যে কোনোটির কপি আর ‘আদর্শ বাংলা বানান’ পুস্তিকা পাশাপাশি রাখলে একাডেমির নিয়মের সঙ্গে ঐ পুস্তিকার নিয়ম অংশের বিবরণের বেশ মিল পাওয়া যায়। যেমন, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের প্রথম তিন সংস্করণের ২.০৯ সংখক বিধি—

‘ও
বাংলায় অ-কারের উচ্চারণ বহুক্ষেত্রে ও-কার হয়। এই উচ্চারণকে লিখিত রূপ দেওয়ার জন্য ক্রিয়াপদের বেশ কয়েকটি রূপের এবং কিছু বিশেষণ ও অব্যয় পদের শেষে, কখনো আদিতে, কখনো যথেচ্ছভাবে ো-কার ব্যবহার করেছেন। যেমন ছিলো, করলো, বলতো, কোরছ, হোলো, যেনো, কেনো (কীজন্য), ইত্যাদি ও-কারযুক্ত বানান লেখা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়া অনুরূপ ো-কার ব্যবহার করা হবে না। বিশেষ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে এমন অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার শেষে ো-কার যুক্ত না করলে অর্থ অনুধাবনে ভ্রন্তি বা বিলম্ব ঘটতে পারে। যেমন: ধরো, চড়ো, বলো, বোলো, জেনো, কেনো (ক্রয় করা), করানো, খাওয়ানো, শেখানো, করাতো, মতো, ভালো, আলো, কালো, হলো।’

আর ‘আদর্শ বাংলা বানান: নিয়ম ও শব্দকোষ’-এর ‘ও’ শীর্ষক নিয়ম হলো—

‘ও
বাংলায় অ-কারের উচ্চারণ বহুক্ষেত্রে ও-কার হয়। এই উচ্চারণকে লিখিত রূপ দেয়ার জন্য ক্রিয়াপদের বেশ কয়েকটি রূপের এবং কিছু বিশেষণ ও অব্যয় পদের শেষে, কখনো আদিতে, কখনো যথেচ্ছভাবে ো-কার ব্যবহার করেছেন। যেমন ছিলো, করলো, খাবো, বলতো, কোরছে, হোলে, যেনো, কেনো (কীজন্য), নোতুন ইত্যাদি ও-কারযুক্ত বানান লেখা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়া অনুরূপ ো-কারের ব্যবহার পরিহার্য। বিশেষ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে এমন অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার অন্তে ো-কার যুক্ত না করলে অর্থ অনুধাবনে ভ্রন্তি বা বিলম্ব ঘটতে পারে। যেমন: ধরো, করো, চড়ো, বলো, বোলো, জেনো, কেনো (ক্রয় করা), করানো, খাওয়ানো, শেখানো, করাতো, মতো, ভালো, আলো, কালো, ইত্যাদি।’

বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের প্রথম তিন সংস্করণের সঙ্গে সর্বশেষ অর্থাৎ পরিমার্জিত সংস্করণের মিল কম, অমিল বেশি। এই সংস্করণে নিয়মের বিবরণ বহু জায়গায় বদলানো হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিবরণ হয়েছে সংক্ষিপ্ত। কোনো কোনো নিয়মের বক্তব্য পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন একাধিক নিয়ম যুক্ত হয়েছে, বাদও গেছে কোনো কোনো নিয়ম। এই অদল-বদল, সংযোজন-সংক্ষেপণ, পরিবর্তন-পরিবর্জনের কারণ সম্পর্কে যদি কেউ অবহিত হতে চান, অথবা নিয়মগুলির বক্তব্য অনুধাবনের জন্য ব্যাখ্যা আশা করেন তাহলে হতাশ হতে হবে তাকে। কারণ এসব ব্যাপারে প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকায় বিশেষ কিছু বলা হয়নি। পুস্তিকার পরিমার্জিত সংস্করণের ‘মুখবন্ধে’ জানানো হয়েছে যে, বানান কমিটির ‘‘সভাসমূহে ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ শীর্ষক পুস্তিকা ছাড়াও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত বাংলা বানানের নিয়ম বিস্তারিত আলোচনার পর ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’-এর পরিমার্জিত সংস্করণ চূড়ান্ত করা হয়।’’

এই বক্তব্যে যে-প্রতিষ্ঠানগুলির নাম এসেছে সেগুলির মধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড আর পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি  তাদের বানানবিধির বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। (দেখুন, পাঠ্য বইয়ের বানান, আনিসুজ্জামান সম্পাদিত, ২০০৫ এবং আকাদেমি বানানবিধি, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি. ২০০৮)। বাংলা একাডেমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা করেনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তার ‘বাংলা বানানের নিয়ম’-এর তৃতীয় সংস্করণের মুখবন্ধে আগের সংস্করণের কোন নিয়ম কেনো বর্জন বা গ্রহণ করা হলো সে-বিষয়ে কৈফিয়ত দিয়েছে। বাংলা একাডেমি তা দেয়নি। একাডেমি ঐসব প্রতিষ্ঠানকে অনুসরণ করলে, নিঃসন্দেহে, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম সমৃদ্ধ হতো, নিয়ম ব্যবহারকারীদেরও সুবিধা হতো।

‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’-এর প্রথম তিন সংস্করণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নীতিমালার অনেক নিয়মেই অস্পষ্ট-অসম্পূর্ণ-ত্রুটিযুক্ত বক্তব্যের সমাবেশ ঘটেছে। এছাড়াও, কোনো কোনো ক্ষেত্রে, নিয়মে বর্ণিত নির্দেশ নিয়মের বিবরণেই লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রমিত নিয়মের চতুর্থ সংস্করণও অপূর্ণতা-অসঙ্গতিমুক্ত হতে পারেনি। এতে ফাঁক আছে, ফাঁকিও আছে। যথেষ্ট পরিমাণে আছে। যেমন: 

প্রমিত বানানরীতির ‘তৎসম শব্দ’ শীর্ষক পরিচ্ছেদের শুরুতে, ১.১ সংখ্যক নিয়মে, বলা হয়েছে, ‘‘এই নিয়মে বর্ণিত ব্যতিক্রম ছাড়া তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের নির্দিষ্ট বানান অপরিবর্তিত থাকবে।’’ এরপর ব্যতিক্রমের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। তবে তালিকাটি যত দীর্ঘ হওয়া উচিত ছিল ততটা হয়নি। যেমন— অধিক প্রচলনের কারণে অনেক তৎসম শব্দে, ব্যাকরণের বিধি লঙ্ঘন করে, আমরা হস-চিহ্ন বর্জন করি। ব্যতিক্রমের তালিকায় বিষয়টি অনুল্লিখিত থেকে গেছে।

একাডেমির বানানরীতিতে ‘অতৎসম শব্দ’ বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘‘তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র’’ এই  চার শ্রেণির শব্দকে। অর্ধ-তৎসম (‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ অনুসারে ভগ্ন-তৎসম) শব্দের কথা এর মধ্যে নেই।

২.৪ সংখ্যক নিয়মে, ঙ-ং  সম্পর্কিত বিধিতে, একাডেমি বলেছে, ‘‘শব্দের শেষে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অনুস্বার (ং) ব্যবহৃত হবে।” এখানে ‘প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্র’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এ প্রশ্ন ওঠার কারণ, ২.২ সংখ্যাক নিয়মের উদাহরণে ‘ব্যাঙ’ শব্দে, ঙ নয়, ব্যবহার করা হয়েছে ং।

নীতিমালার ২.৫ সংখ্যক নিয়ম ‘ক্ষ, খ’ শীর্ষক। তবে এতে ক্ষ সম্বন্ধে কিছু বলা হয়নি। বলা হয়েছে কেবল খ -এর ব্যবহার সম্বন্ধেই। নিয়মটির বক্তব্য এরকম, ‘‘অতৎসম শব্দ খিদে, খুদ, খুদে, খুর (গবাদি পশুর পায়ের শেষ প্রান্ত), খেত, খ্যাপা ইত্যাদি লেখা হবে।’’ একথার মানে কী? এরকম কত শব্দে খ হবে?

একাডেমি তার নীতিমালার, ২.৬ সংখ্যক বিধিতে, জ ও য ব্যবহারের নিয়ম নির্দেশ করতে গিয়ে কেবল বিদেশি শব্দের কথাই বলেছে, অন্যবিধ শব্দের বানান-প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে পুরোপুরি। ২.৮ সংখ্যক বিধিতে শ, ষ ও স -এর ব্যবহারবিধি বর্ণনা করতে গিয়েও একাডেমি একই রকমের কাজ করেছে।

প্রমিত বানানরীতির ‘অতৎসম শব্দ’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে তৎসম-অতৎসম প্রত্যয়, উপসর্গ ইত্যাদি সহযোগে গঠিত মিশ্র শব্দের বানানের ক্ষেত্রে ঐ সব শব্দের তৎসম অংশের বানান অপরিবর্তিত থাকবে কি না এবিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতির প্রথম তিন সংস্করণে, ৩.০১ সংখ্যক নিয়মে, যুক্তবর্ণগুলিকে ‘‘যতদূর সমম্ভ স্বচ্ছ” করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ‘বাংলা একাডেমী বাংলা বানান অভিধানে’ (প্রথম সংস্করণ ১৯৯৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০১, তৃতীয় সংস্করণ ২০০৮) ঐ  পরামর্শ অনুসারে অনেক যুক্তবর্ণের স্বচ্ছরূপ ব্যবহার করা হয়। একাডেমির  বানানরীতির সর্বশেষ  সংস্করণে নিয়মটি নেই। তাছাড়া, এই সংস্করণে নিয়মের বিবরণ ছাপার কাজে যুক্তবর্ণের প্রথাসিদ্ধ রূপই ব্যবহার করা হয়েছে, বানান অভিধানে নির্দেশিত রূপ নয়। এসব দেখে মনে হয়, প্রমিত নিয়মের পূর্ববর্তী সংস্করণগুলিতে যুক্তবর্ণ ‘‘যতদূর সম্ভব স্বচ্ছ’’ করার যে নীতির কথা আছে তা থেকে একাডেমি সরে এসেছে। কিন্তু, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ (এটুআই) প্রকল্পের উদ্যোগে, বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের সহযোগিতায় নির্মিত ‘শাপলা’ নামের যে-ফন্টটি  ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ তারিখে ইন্টারনেটে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে তাতে যুক্তবর্ণের প্রথাসিদ্ধ রূপের পরিবর্তে স্বচ্ছ রূপ লক্ষ করা যায়। আবার, একাডেমির বহুলালোচিত ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে’(২০১৬)ও অনেক যুক্তবর্ণের স্বচ্ছ রূপ ব্যবহৃত হয়েছে। অবশ্য এই অভিধানে যুক্তবর্ণের স্বচ্ছরূপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শাপলা ফন্ট অনুসরণ করা হয়নি। শাপলা ফন্টের যুক্তবর্ণ আর আধুনিক বাংলা অভিধানে ব্যবহৃত যুক্তবর্ণ আকৃতিতে-অবয়বে সব ক্ষেত্রে একরকম নয়।

১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি যে-বানানবিধি প্রণয়ন করেছিল তা একাডেমির বইপত্রে অনুসৃত হয়নি। অনুসরণের জন্য বিশেষ কোনো উদ্যোগও তখন নেয়া হয়নি একাডেমির পক্ষ থেকে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম যাতে বইপত্রে অনুসৃত হয় সেজন্য একাডেমি চেষ্টা চালিয়ে আসছে ১৯৯২ সাল থেকেই। কিন্তু নিয়ম মানার ব্যাপারে একাডেমির লেখক-সম্পাদকদের আন্তরিকতার অভাব আছে। দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। প্রথমে ‘বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধান’র কথা বলা যাক। প্রমিত নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন বহু বানান স্থান পেয়েছে এই অভিধানে। ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’র কথাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। রাইজিবিডি.কম-এ বিগত ১৫ জুলাই ২০২০ তারিখে প্রকাশিত ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক অভিধান: বানান-প্রতর্ক’ শীর্ষক  প্রবন্ধে অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর দেখিয়েছেন যে, “বাংলা একাডেমির ২০১২ সালের ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ অনুসারে ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ প্রণীত হয়েছে বলে এর ‘মুখবন্ধ’-এ ঘোষণা করা হলেও এ দুয়ের মধ্যে অনেক ব্যত্যয় লক্ষ করা যায়।”

তিনি দৃষ্টান্তসহ ‘ব্যত্যয়’গুলির একটি তালিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, “যে দৃষ্টান্তগুলো দেওয়া হলো, প্রতিটি ক্ষেত্রে এর চেয়ে অনেক দৃষ্টান্ত অনুল্লিখিত থাকল।” ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে’র সম্পাদক জামিল চৌধুরী। জনাব চৌধুরী বাংলা একাডেমির বানান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন সদস্য। এই কমিটির আরেকজন সদস্য গোলাম মুরশিদ। তিনি ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ (২০১৩)-এর সম্পাদক। অভিধানটির ভূমিকায়, রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে, তিনি “বিশ শতকের প্রথমার্ধের” বানান ব্যবহার করেছেন, আধুনিক বাংলা বানানের একাধিক নিয়ম (নিয়মগুলি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মেও আছে) উদ্ধৃত করে সেগুলির কড়া সমালোচনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, অভিধানের মধ্যে বানান ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন— পুরানো আর নতুন এই দুই বানান-পদ্ধতির কোনোটিই অনুসরণ করেননি। তিনি লিখেছেন:

‘... বানান-বিপ্লবের বন্যায় বাংলা ভাষার পুরনো নিয়ম-রীতির অনেক বেড়া, অনেক সাজসজ্জা সম্প্রতি ভেসে গেছে। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার করা বানান পদ্ধতি দিয়ে কাজকর্ম বেশ চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু বানান-বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করেন। তারই ভিত্তিতে তাঁরা কয়েকখানি বই প্রকাশ করেন বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। তাতে তাঁরা খুঁজে খুঁজে বের করেছেন, ১৯৩৬ সালের সুপারিশের ওপর তাঁরা নতুন আর কী কী সুপারিশ করতে পারেন। অসংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে সমস্ত দীর্ঘ ঈ এবং দীর্ঘ ঊ আর ণ-এ ব্যবহার, তাঁদের মতে, অবান্তর হয়ে গেলো। তার থেকেও বৈপ্লবিক তাঁরা যা করলেন, তা হলো: তাঁরা খুঁজে বের করলেন, কোন কোন সংস্কৃত শব্দে হ্রস্ব এবং দীর্ঘ উভয় স্বর ব্যবহার করা যায়। যেমন, এই ভূমিকায় আমি লিখেছি ‘সারণী’। তাঁদের মতে এটি লেখা উচিত ‘সারণি’। ‘শ্রেণী এবং ‘শ্রেণি’ উভয়ই নাকি শুদ্ধ। অতিসাম্প্রতিক কালের আগে পর্যন্ত শ্রেণীই লেখা হয়েছে। এখন ‘শ্রেণী’র বদলে ‘শ্রেণি’ লিখলে যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে তা বিবেচনা না-করেই অনেকে নতুনের কেতন ওড়ানোর আনন্দেই নতুন বানানে ‘শ্রেণি’ লিখতে চান। সুগন্ধী তাঁদের মতে সুগন্ধি। রচনাবলী রচনাবলি। দেশী দেশি। সার্বজনীন সর্বজনীন। আমরা এ অভিধানে অতোটা আধুনিক হতে পারিনি। তাই বলে আমি এই ভূমিকা বিশ শতকের প্রথমার্ধের যে-বানান রীতিতে লিখেছি, তাও এ অভিধানে অনুসরণ  করিনি।’

বাংলা একাডেমির প্রমিত নিয়ম অনুসারে প্রণীত ‘বাংলা একাডেমী বাংলা বানান-অভিধান’র প্রথম সংস্করণের (১৯৯৪) ‘প্রসঙ্গ-কথা’য় একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য একটি অভিন্ন বানান পদ্ধতি সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে তোলা।’ একাডেমির সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কি? এ প্রশ্নের একটা উত্তর পাওয়া যায় বানান-অভিধানের তৃতীয় সংস্করণের ‘প্রসঙ্গ-কথা’য় একাডেমির সে-সময়কার মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের বক্তব্যের মধ্যে। তিনি বলেন, ‘এই অভিধানে বাংলা একাডেমী যথাসম্ভব বিকল্প বর্জন করে বাংলাদেশে সম-ধরনের বানান প্রচলন করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটি করা সম্ভব হয় নি।’ কথাগুলি ২০০৮ সালের। তারপর ১২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। পরিস্থিতি বদলেছে কি? না, বদলায়নি। একাডেমির বানানপদ্ধতি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি। দেশের  বহু সঙ্ঘ-সংস্থা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, পত্রপত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া আর বানান ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষকে প্রমিত বানানে অভ্যস্ত করে তোলা যায়নি। এর কারণ কি? আমাদের বিবেচনায় এর একটা বড় কারণ হলো, একাডেমির নিয়ম একাডেমির বইপত্রেই ঠিকমতো মানা হয় না। আর একটা কারণ, একাডেমি এমন বানানরীতি প্রণয়ন করতে পারেনি যা দিয়ে বাংলা বানানের সকল সমস্যা-সঙ্কুল এলাকায় নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এসবের পাশাপাশি ‘বাঙালীর নিয়মনিষ্ঠার অভাব’ তো আছেই। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা তাই খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ

 

পড়ুন এ বিষয়ক অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরের আরো একটি নিবন্ধ
বাংলা একাডেমি আধুনিক অভিধান : বানান-প্রতর্ক

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়