Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৮ ||  ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আফগানিস্তান সফরের সেই সময়

সালেক সুফী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪২, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১২:৪২, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
আফগানিস্তান সফরের সেই সময়

সালেক সুফী। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্যাস ও জ্বালানি সেক্টরে কাজের বিপুল অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। আফগানিস্তানেও দীর্ঘ সময় জ্বালানি নিয়ে বিদেশী সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন আফগানিস্তান। দেশটির উন্নয়ন সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে লেখা তার ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হলো আজ

চার বছর আফগানিস্তানে অবস্থানকালে নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষের সঙ্গে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়েছিল। সহকর্মী, ড্রাইভার, সিকিউরিটি কাজে নিয়োজিত এখানকার সাধারণ মানুষকে আমার খুবই বিনম্র মনে হয়েছে। বাংলাদেশিদের জন্য আমি আলাদা ভালোবাসা পেয়েছি তাদের কাছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবাদে আমার অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট নিয়েই আফগানিস্তানে কাজ করেছি। তবে আফগানিরা আমাকে কখনো অস্ট্রেলিয়ান ভাবতো না। সঙ্গে পাকিস্তানি বা ভারতীয় কেউ থাকলে আফগানিরা চুপচাপ থাকতো। তেমন মুখ খুলতো না। কিন্তু আমি একা কোথাও গেলে ড্রাইভার বা নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা থাকতো তারা তখন প্রাণখুলে কথা বলতো। কাবুলের অধিকাংশ মানুষ উর্দু বা হিন্দি জানায় কথাবার্তায় খুব একটা অসুবিধা হতো না।

আফগানিস্তানে মাটির নিচে থাকা বিপুল পরিমান মূল্যবান খনিজ পদার্থ এবং জ্বালানি সম্পদের লোভেই বারবার দেশটিতে ছুটে এসেছে বিভিন্ন পরাশক্তি। কিন্তু ইংরেজ, সোভিয়েত বা সর্বশেষ আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী কেউ আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারেনি। একে তো ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুর্গম এলাকায় লুকিয়ে থেকে গেরিলা যুদ্ধ যুগের পর যুগ  চালিয়ে যাবার সুযোগ; উপরন্তু আফগানিস্তানের আবাল বৃদ্ধ দারুণ স্বাধীনচেতা স্বভাবযোদ্ধা। প্রায় সবাই অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। তবে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীতে বিভক্ত আফগান জনগণ কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি।

ইউএসজিএস-এর সমীক্ষা অনুযায়ী আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং ব্যবহারের প্রধান সমস্যা খনন উপকরণ এবং যন্ত্রপাতি আমদানির অপ্রতুলতা। এ ক্ষেত্রে আফগানিস্তান শুধু ইরান এবং পাকিস্তান-নির্ভর। দুটি মুসলিম দেশ কিন্তু কখনোই আফগানিস্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেনি।

আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের অবস্থান মূলত পাঁচটি পরিণত বেসিনে। এগুলো হলো উত্তরে ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান,তাজিকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা আমু দাড়িয়া, আফগান তাজিক এবং হেরাত বেসিন। পশ্চিমে পাকিস্তান সংলগ্ন হেলমান্দ এবং কাটোয়াজ বেসিন। এগুলোর মধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া শুধু আমু দাড়িয়া বেসিনে ব্যাপক অনুসন্ধানের পর ৮টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করে। তবে ইয়াটিমটাক, খোজ গোগেরদাক ও জারকুডাক- এই তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়ন সাধন করে। এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আফগানিস্তানের উত্তরপ্রান্তে জাওজান প্রদেশের সেবারগান মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। সোভিয়েত রাশিয়া প্রাথমিকভাবে এই তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র উন্নয়ন করে সেবারগান থেকে মাজার শরীফ পর্যন্ত  ৯০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে একটি ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন করে। আমাকে ইউএসএইড-এর ঠিকাদার যখন প্রথম ইউএসডিওডি’র সঙ্গে কাজ করার জন্য নিয়োগ করে তখন আমার দায়িত্ব ছিল গ্যাস ক্ষেত্রসমূহের তথ্য উপাত্ত যাচাই করে উন্নয়ন পরিকল্পনা, গ্যাসকূপসমূহ, গ্যাস ট্রিটমেন্ট প্লান্ট সমূহের পাইপলাইন পরীক্ষা করে রিহ্যাবিলিটেশন এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। সোভিয়েত-বিরোধী যুদ্ধের সময় আফগানিস্তানের বহু গ্যাস ক্ষেত্র এবং স্থাপনাসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নিবিড় সামরিক প্রহরায় কাবুল থেকে ৯০০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম হিন্দুকুশ পর্বতশৃঙ্গ পেরিয়ে মাজার শরীফ প্রদেশ ছাড়িয়ে সেবারগানে নিয়ে যাওয়া হয়। সাত হাজার মিটার উঁচু বরফ ঢাকা হিন্দুকুশ পর্বতমালার উপরে চার কিলোমিটার হিমবাহের টানেল পেরিয়ে যাওয়ার স্মৃতি কখনো ভোলার মতো নয়। সফরে টার্কিস চিকেন রোস্ট, আফগান কাবাবের সেই উপাদেয় খাবারের স্বাদ যেন এখনো জিভে লেগে আছে!

মাজার শরীফে স্বঘোষিত জেনারেল দোস্তামের প্রাসাদে রাত কাটিয়ে পরদিন গ্যাস ফিল্ড পৌঁছে অনেক মান্ধাতা আমলের রিগ, সোভিয়েত বাহিনীর ফেলে যাওয়া ট্যাঙ্ক, ভাঙা যুদ্ধ বিমান দেখলাম। কয়েকটি গ্যাস কূপের অয়েল হেড প্রেসার দেখলাম ৩০০০-৪০০০ পিএসআই। দোভাষীর মাধ্যমে জানলাম দুটি গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস সালফারযুক্ত বিধায় বিশাল একটি ডেসালফারিজাশন প্ল্যান্ট স্থাপন করা আছে। একটি ক্ষেত্রের গ্যাস সনাতন গ্লাইকল প্ল্যান্ট দিয়ে প্রসেস করা হতো যেটি তখনও চালু দেখতে পাই। আমাকে এই সংক্রান্ত অনেক তথ্য ও কাগজপত্র দেয়া হলেও সেগুলো মূলত রাশিয়ান এবং পশতু ভাষায় থাকায় সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। জানানো হলো এগুলো আমেরিকা পাঠিয়ে আমার জন্য ভাষান্তর করে দেয়া হবে। আফগানদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ আমি প্রতিশ্রুতি দেই আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে এসে ওদের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো পুনর্বাসনে আমার মেধা এবং শ্রম বিনিয়োগ করবো। অন্তত কয়েকটি গ্যাস কূপ চালু এবং আমেরিকার সহায়তায় একটি সিএনজি প্রসেস প্ল্যান্ট স্থাপন করে সেবারগান শহরের যানবাহনগুলো রূপান্তর করার ব্যবস্থা করবো।

আফগানিস্তানে আমার প্রথম সফরটি ছিল সব মিলিয়ে ২১ দিনের। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আফগানিস্তানের খনিজ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের সামনে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্ট করেছিলাম আমি। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি কূপ চালু এবং সেইসঙ্গে গ্লাইকল প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন ব্যবহার করে ইউরিয়া সার কারখানাটি কার্যকর করা যায় কিনা তার বিস্তারিত পরীক্ষার বিষয়টি উপস্থাপন করলাম। আফগান খনিজ মন্ত্রী এবং সেখানে উপস্থিত যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত ভূতত্ত্ববিদ ডক্টর আশারফ (যিনি পরবর্তীকালে জার্মানিতে আফগান রাষ্ট্রদূত ছিলেন) আমাকে জড়িয়ে ধরে আফগানিস্তানে দীর্ঘ সময় কাজ করার আমন্ত্রণ জানালেন। আমার প্রেজেন্টেশন কপি তিনি সেইদিন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই মন্ত্রীসভায় উপস্থাপন করলেন। আফগান সরকার ইউএসএইড-এর কাছে সুপারিশ করলো আমাকে যেন দীর্ঘ সময় সেবারগান গ্যাস ক্ষেত্র পুনর্বাসনের কাজে সহায়তার জন্য নিয়োগ করা হয়। দারুণ একটা সময় কাটিয়ে আমি কাবুল থেকে মেলবোর্নে ফিরে এলাম।

সফরে উপহার পাওয়া আফগান আচকান, টুপি ও জেমস্টোন এখনো আমার সুভেনিরের আলমারিতে আছে।

 

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
 

এমএম/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়