ঢাকা     বুধবার   ২৯ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১৫ ১৪২৯ ||  ২৮ জিলক্বদ ১৪৪৩

সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

ইয়াসির আরাফাত তূর্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৪, ১৬ মে ২০২২  
সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

‘আমি তাকে এমন একটি প্রস্তাব দেবো, সে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।’ প্রখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক মারিও পুজোর ‘গডফাদার’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাফিয়া ডন ভিটো কর্লিয়নির বিখ্যাত সংলাপ এটি।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্রের কুশিলবদের দেখা যায় যে, তারা সব সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে সরলমনা মানুষকে রাজনৈতিকভাবে শোষণ করতে তৎপর। ধর্ম বিশ্বাসের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে দেশের অর্ধশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত লোকজন কখনো এড়িয়ে যেতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মানুষের ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দালাভের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। 

এ দেশে কট্টর পাকিস্তানি চিন্তাধারার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদীরা ধর্মের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে পপুলিস্ট পলিটিক্সের চর্চা করছে শুরু থেকেই। সময়ে-অসময়ে তারা সাম্প্রদায়িক গুজব ছড়িয়ে সরকারকে জিম্মি করারও চেষ্টা করেছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- দেশ ও জাতির কল্যাণে তারা কোনো অবদানই রাখেনি! দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদ্রাসায় কী ঘটছে অনেকেরই অজানা নয়। ইসলামের নাম ভাঙিয়ে মনগড়া ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা তুলনামূলক ধর্মীয় আবেগপ্রবণ সদ্যকৈশোর পেরোনো তরুণদের মগজধোলাই করছে। বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বয়ান করছেন অনেকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বয়ানে নারীর প্রতি তাদের পশ্চাদপদ দৃষ্টিভঙ্গিজাত কদর্য চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তাদের বয়ানে বিশ্বমানবতার সম্মানজনক ভালোবাসাপূর্ণ মানবিক সহাবস্থানের কথা নেই। তারা এগুলো বিশ্বাসও করে না। মানবতার মুক্তির পরিবর্তে দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণকে অগ্রাহ্য করে শুধু সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষ ছড়ানোই যেনো তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ডিজিটাল মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এসব অর্বাচীন বক্তাদের ঝগড়াটে দম্ভোক্তিপূর্ণ বয়ান ছড়িয়ে পড়ছে। 

সাম্প্রতিক বিশ্ববাস্তবতায় সবার হাতে রয়েছে স্মার্ট ফোন। তরুণরা বিশেষ করে করোনাকাল পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় অটোপাশ ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মতো বাস্তবতা তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের হাতের কাছে থাকা স্মার্টফোনে টিকটক, ফ্রিফায়ার, পাবজিসহ ভিডিও গেমসহ নানা সস্তা বিনোদনের জন্য কার্যত মোহবন্দী হয়ে নিজেদের সময়, উদ্ভাবনী শক্তি ও মেধার অপচয় করে চলেছে। ফলে ইতোমধ্যে একটি বইবিমুখ তথা জ্ঞানবিমুখ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগটি নিচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষ। তারা ধর্মের প্রচার বা প্রসারের জন্য নয়, মূলত পপুলিস্ট রাজনীতির ফায়দা লোটার জন্যই ধর্মকে অস্ত্র বানিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রশাসনকে ধর্মীয় আবেগের বেড়াজালে জিম্মি করতে তৎপর। বাংলাদেশের সহজ-সরল নাগরিকদের মধ্যে ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও নারীবিদ্বেষ সৃষ্টির মাধ্যমে সুকৌশলে এ দেশে সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে চলেছে এ যুগের রাজাকার দুর্নীতিবাজ ৮ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি।

রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ডধারী পাকিস্তানের কৃতদাস বিএনপি জামাত সাম্প্রদায়িক মাফিয়ারা শুধু আওয়ামী লীগের ক্ষতি সাধনের জন্য বাংলাদেশের ক্ষতি করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ জনগণকে ধর্মের দোহাই দিয়ে অনেকটা মোহাবিষ্ট করে ফেলে এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি। তাদের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ধর্মের শান্তি ও সৌহার্দ্যের বাণী প্রচার করা নয়, মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে দেশকে লুটেপুটে খাওয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। যার কদর্য মানবতাবিরোধী ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বরূপ উপলব্ধি করা আবশ্যক।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লার কাছে গত বুধবার শতাধিক ইসলামি বক্তার বিভিন্ন তথ্য দিয়ে ‘ধর্ম ব্যবসায়ীদের’ দুর্নীতি তদন্তের আহ্বান জানায় ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন।’ এতে অবশ্য প্রচণ্ড ক্ষোভ ও আপত্তি জানিয়েছেন তালিকাভুক্ত একাধিক দুর্নীতিবাজ বক্তা। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টিকারী এসব ধর্মীয় নেতার সন্দেহভাজন আর্থিক লেনদেন ও বিদেশে অবৈধভাবে অর্থপাচারের তথ্য উঠে এসেছে। যা মূলত এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের লেবাসবদ্ধ লালসালুর মজিদ চরিত্রটিকেই উন্মোচিত করেছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এমনই এক ধরনের মাফিয়াতন্ত্র ঢুকে পড়েছে যার নাম 'সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র'। কেননা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এদেশের সহজ সরল মানুষের ব্রেনওয়াশ করে এমনভাবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বীজ বপন করে যা প্রথম দিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মভীরু নাগরিকরা অগ্রাহ্য করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস বা দাঙ্গা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গত দুর্গাপূজায় কুমিল্লায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরান রেখে আসতেও দ্বিধাবোধ করেনি এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। তারা বহুকাল ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করে চলেছে। এদেশের পাকিস্তানি কৃতদাস বিএনপি জামাতের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে, স্বাধীনতা হরণে বহুকাল ধরে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি বাঙালির শ্রেণিশত্রু যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও তাদের কুলাঙ্গার উত্তরসুরীরা এখনো বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ কারণেই তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির সাথে মিল না থাকা সত্ত্বেও ভঙ্গুর অস্থিতিশীল সম্পূর্ণ পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির দেশ শ্রীলঙ্কার দুরবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করে স্বর্গসুখ খুঁজে পায়। 

দেশমাতৃকার প্রতি ন্যূনতম ভালোবাসা ও অনুরাগ জাগ্রত থাকলে বিএনপি কখনোই লবিস্ট নিয়োগ করে দেশের বৈদেশিক ঋণ সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার অপতৎপরতা চালাতো না। বিদেশী জঙ্গিদের সাথে গোপন আঁতাত রেখে দেশের মানুষকে অধিকারবঞ্চিত করতো না। এই অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য বীর বাঙালির গর্বিত উত্তরাধিকার হিসেবে বাংলাদেশের নবতারুণ্যকে একটি প্রগতিশীল, উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শপথগ্রহণ করতে হবে। 

শেকড়সন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারুণ্যের মন ও মগজে ধারণ করতে হবে আউল বাউল লালনের দেশ, জারি, সারি, মুর্শিদী ও ভাটিয়ালি গানের দেশ, বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ, ষড়ঋতুর দেশ, লাখো শহীদের রক্তস্নাত শ্যামল প্রকৃতির লীলাভূমি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে।
 
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়