ঢাকা     রোববার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৯ ||  ০৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

কবি ও কবিতার প্রতি মহানবীর ভালোবাসা

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:০৩, ২৫ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৪:১৭, ২৫ নভেম্বর ২০২২
কবি ও কবিতার প্রতি মহানবীর ভালোবাসা

জাহেলি যুগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পৃথিবীতে আগমন করেন, তখন আরবে ছিল কাব্যচর্চার জয়জয়কার। আরবের অন্যতম কবিদের কবিতা কাবার দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হতো। কবিতার মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা হতো। নবীজিও কবি ও কবিতা ভালোবাসতেন। কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কবিতার উপযুক্ত সমালোচনা করতেন। অবিশ্বাসী কবিদের মোকাবিলায় কবিতা রচনা করতে বিশ্বাসী সাহাবি কবিদের উৎসাহিত করতেন। তাঁরাও অনুপ্রাণিত হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রশংসামূলক, ইসলাম ও মুসলমানদের কীর্তি ও বীরত্বমাখা, লড়াইয়ে উদ্দীপনামূলক কবিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কবিতা রচনা করতেন। নবীজিও কখনো কখনো মুখে মুখে কবিতা আওড়াতেন।

কবিতার মূল্যায়ন

কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয়ই কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা। যে কবিতা সত্য আশ্রিত তা সুন্দর। আর যে কবিতা সত্য-বিবর্জিত তাতে কোনো কল্যাণ নেই।’ তিনি কবিতার ছন্দ ও গঠনের চেয়ে কবিতার প্রকৃতি ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেশি মন্তব্য করতেন। সুরা শুয়ারার [কবিগণ] ভাষ্য ছিল তাঁর কাব্যদর্শন, কাব্যচিন্তন ও কাব্য-সমালোচনার আদর্শ। তিনি আরব-কবিদের কবিতা আগ্রহভরে শুনতেন এবং সে সম্পর্কে অত্যন্ত চমৎকার সমালোচনা করতেন। সাহাবি হজরত শারিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কণ্ঠে জাহেলি যুগের কবি উমাইয়া ইবনে আবু সালাতের কবিতা শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘উমাইয়ার কবিতা ইমান এনেছে, অথচ তার মন এখনো কুফুরির অন্ধকারে।’

তৎকালে যারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অশ্লীল কবিতা লিখত ইমরুল কায়েস ছিল তাদের অন্যতম। নবীজি তার কবিতাকে অশ্লীল বললেও কবিতার সঠিক মূল্যায়ন করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তার ভাষায় আছে সম্মোহনী শক্তি এবং কাব্যকর্মে রয়েছে বর্ণনার পরিপাট্য। পৃথিবীতে সে খ্যাতনামা হলেও আখেরাতে তার নাম নেওয়ার কেউ থাকবে না। কবিদের যে দল জাহান্নামে যাবে সে থাকবে তাদের পতাকাবাহী।

কবিদের মর্যাদা দান

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা দিতেন। কবি হাসসান ইবনে সাবিতের জন্য তিনি মসজিদে নববিতে আলাদা একটি মিম্বর [মঞ্চ] তৈরি করেছিলেন। মসজিদেই বসে যেত কবিতার আসর। কবি হাসসান কবিতা আবৃত্তি শুরু করলে স্বয়ং নবীজি তার জন্য এই বলে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! রুহুল কুদুসকে [জিবরাইল আলাইহিস সালাম] দিয়ে তুমি তাকে সাহায্য করো।’ যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও কবিদের গনিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অংশ দিতেন। কারণ তাঁদের কবিতা ছিল উন্মুক্ত এবং উত্তোলিত তরবারির মতো। 

কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান এবং যুদ্ধের সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি কবিদের অপরাধ ক্ষমা করে দিতেন এবং বিশ্বাসীদের কাফেলায় শামিল হওয়ার জন্য অনেক পুরস্কারে ভূষিত করতেন। ইমাম শরফুদ্দিন বুসিরি রহ.-এর কবিতায় আকৃষ্ট হয়ে স্বপ্নে নবীজি নিজের গায়ের চাদর তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঐ ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থের নাম হয়, ‘কাসিদায়ে বুরদাহ’ বা ‘চাদরের কবিতা’। আল্লাহ তায়ালাও সুরা শুয়ারায় বিশ্বাসী কবিদের প্রশংসা করেন।

সমাজ বিপ্লবে কবিতা

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবিতাকে সমাজ-বিপ্লবের উত্তম হাতিয়ার মনে করতেন। তিনি সাহাবি কবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘যাও, তোমরা মুশরিকদের প্রতিপক্ষে কবিতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হও। কারণ মুমিন লড়াই করে জান-মাল দিয়ে। মুহাম্মদের প্রাণ যার হাতে তার কসম, তোমাদের কবিতা তীরের ফলা হয়ে তাদের কলজে ঝাঁঝরা করে দেবে।’ 

নবীজির কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে হাসসান ইবনে সাবিত, কা’ব ইবনে জুহাইর, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, কা’ব ইবনে মালিক, আব্বাস ইবনে মিরদাস, কবি লবিদ, মহিলা কবি খানসা, নাবী খাজাদি প্রমুখ সাহাবি কবি যুদ্ধ সম্পর্কে এবং যুদ্ধের আগে-পরে অনেক রণোদ্দীপক কবিতা রচনা করে আবৃত্তি করেন।

মহানবীর কবিতা

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী ছিলেন বলে কবি ছিলেন না। তাঁর জন্য তা শোভনীয় ছিল না। তিনি যদি কবিতা রচনা করতেন, তাহলে ওহি এবং কবিতা পৃথক করা কঠিন হতো। এমনিই তো ওহি লাভ করার পর যখন ওহি প্রচার শুরু করলেন, তখন মক্কার কাফের নেতারা উপহাস করে তাঁকে ‘কবি’ বলে আখ্যায়িত করতে লাগল। আল্লাহ তায়ালা তাদের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণ করতে সুরা ইয়াসিনের ৬৯ নম্বর আয়াতে বলে দেন, ‘আমি রাসুলকে কবিতা শিক্ষা দিইনি এবং তা তাঁর শোভনীয়ও নয়।’ 

যদি তাঁর কবিতা রচনার সুযোগ থাকতো তবে সারা বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবির আসন অলঙ্কৃত করতে সক্ষম হতেন। মাঝে মাঝে তাঁর মুখনিঃসৃত কবিতা থেকে এর প্রমাণ মেলে। তবে তিনি যে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ছিলেন সে কথা তিনি নিজেই বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আনা আফসাহুল আরবÑ আমি আরবদের মধ্যে সবচে বড় সাহিত্যিক’। সময়টি কাব্য সাহিত্যের হওয়ায় তিনি মাঝে মাঝে মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে আবৃত্তি করতেন। যেমন উহুদ যুদ্ধে পাথরের আঘাতে তাঁর আঙুল মোবারক থেকে রক্ত বের হলে তিনি তৎক্ষণাৎ রচনা করেন অমিয় পঙক্তি- 
‘হাল আনতি ইল্লা ইসবাউন দামীতি 
ওয়া ফী সাবীলিল্লাহি মা লাকিতি।’ 

অর্থাৎ, হে আঙুল, তুমি তো একটি আঙুল বৈ কিছুই নও। সুতরাং যা কিছু হয়েছে তা তো আল্লাহর পথে হয়েছে। দুঃখ ও অনুশোচনা কিসের! 

অন্য প্রসঙ্গে আরও বলেন- 
‘আনান নাবিয়ু লা কাজিব 
আনা ইবনু আবদিল মুত্তালিব।’ 
অর্থাৎ, আমি নবী, মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।

শেষ কথা

কবি ও কবিতা সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনেক হাদিস রয়েছে। এখানে স্বল্প পরিসরে বিশদ আলোচনার সুযোগ নেই। এখন কথা হলো, আমরা তো সেই কবিতাপ্রেমিক নবীর উম্মত। আমাদের জন্যও কবিতার প্রতি একটু ভালোবাসা দেখানো প্রয়োজন। বর্তমানেও ধর্মবিদ্বেষীরা কবিতার মাধ্যমে কটাক্ষ করছে। তাদের জবাব দিতে এই বিষয়ে প্রতিভাবানদের কাব্যচর্চায় আত্মনিবেশ করা উচিত।

[তথ্যসূত্র : সিরাতে ইবনে হিশাম]
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম

 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়