হাল্লাজ থেকে শামীম রেজা: ব্যাখ্যার রাজনীতি ও জনতার বিচার
মানসুর হাল্লাজকে মারার আগে এক মুহূর্তের জন্যও কি কেউ ভেবেছিল—যদি মানুষটা সত্যিই অন্যরকমভাবে বিশ্বাস করে? শুরুটা ছিল তর্ক দিয়ে। কিন্তু তর্ক থামেনি—জমে গিয়ে একদিন রূপ নিল জনতার ক্রোধে।
বাগদাদের উত্তেজিত, ক্ষুব্ধ মানুষদের অনেকেই সেদিন শুধু অপেক্ষা করছে একজন মানুষকে দেখার জন্য। তিনি মানসুর আল-হাল্লাজ। তারা শুনেছে, হাল্লাজ খোদাদ্রোহীতা করেছে। আধ্যাত্মিকতায় আগ্রহী কিছু মানুষ ছাড়া তাঁর ‘আন ‘ল হক’ কেউ বোঝেনি, বরং নিয়েছিল সীমালঙ্ঘন হিসেবে। যেদিন তাঁকে সামনে আনা হলো, ভিড় আর দর্শক ছিল না—তারা বিচারক হয়ে উঠেছিল। কে প্রথম আঘাত করেছিল, কেউ জানে না। শুধু জানা যায়, একসময় আর কেউ থামায়নি।
পীর শামীম হত্যাকাণ্ডেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যুগে যুগে, কালে কালে বিষয়গুলো এমনই ছিল। তবে বাংলাদেশে বিষয়টা ভিন্ন, ২০২১ সাল পুরোটাই ছিল ধর্ম অবমাননার গুজবে ভরা। তারও আগে ২০১৩ সালজুড়ে পবিত্র কুরআন ও নবীর অবমাননার অভিযোগে আমরা ব্লগার হত্যাকাণ্ড ঘটতে দেখেছি। সূরা আল-হিজরের ৯ নাম্বার আয়াতে কুরআন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি, এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।’ একই সূরার ৯৫ নাম্বার আয়াতে নবীর সম্মান সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই উপহাসকারীদের জন্য আমিই আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট।’
পীর শামীম কুরআন অবমাননা করছে বলে যে ইস্যু মবকারীরা দাঁড় করাল, তা শুধু দেশীয় আইনের সাথেই নয় ইসলামি চিন্তার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এই ঘটনাটির আরেকটি দিকও চোখ এড়ানো যায় না। শামীম রেজার দরবারে গান-বাজনা হতো—যা আমাদের অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও উগ্রবাদীদের কাছে বিতর্কিত। ফলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি হয়তো কেবল একটি ‘ট্রিগার’; এর পেছনে ছিল আগে থেকেই জমে থাকা মতভেদ, অস্বস্তি এবং বিরোধ।
সংগীতের প্রতি কেন এত ক্ষোভ? এর কারণ অপব্যাখ্যা। এসব বিভ্রান্তিকর অপব্যাখ্যার জন্য কোনো বিদেশি শক্তির মদদ ছিল কিনা পূর্ব থেকে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তবে সংগীত শেখা ও সংগীতের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যে একটা ছোটখাটো বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে তা সুস্পষ্ট ওয়ায়েজিনদের জন্য অসুবিধার কারণ হয়ে গেল কিনা, তাদের মনোজগতে সেই প্রতিযোগিতা কী পরিমাণ প্রবেশ করেছে, এটারও একটি কৌশলী গবেষণা হওয়া উচিত।
এই দীর্ঘ বিতর্কের ভেতরে সংগীতকে ঘিরে যে অবস্থানগুলো তৈরি হয়েছে, তা একরৈখিক নয়—বরং মুসলিম বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের ভেতরেই বহুস্তরীয়। ইবনে সিনা সংগীতকে কেবল বিনোদনের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, সুর ও ছন্দ মানুষের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে—এটি মানসিক অস্থিরতা প্রশমিত করতে পারে, এমনকি চিকিৎসার অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে। তাঁর চিকিৎসা ও দার্শনিক চিন্তায় সংগীত ছিল শরীর ও আত্মার ভারসাম্য রক্ষার একটি সূক্ষ্ম মাধ্যম।
অন্যদিকে ইবনে খালদুন সংগীতকে দেখেছেন একেবারে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর মতে, কোনো সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিকাশ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সংগীতচর্চা গভীরভাবে যুক্ত। সমাজ যত স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হয়, ততই সেখানে শিল্প-সংস্কৃতি, গান ও বিনোদনের বিকাশ ঘটে। তাঁর কাছে সংগীত ছিল সভ্যতার ‘মুড-ইন্ডিকেটর’—একটি সমাজ কী অবস্থায় আছে, তা বোঝার একটি সূচক।
এই আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক ধারার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় সুফি ঐতিহ্যেও। উপমহাদেশে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী এবং তাঁর অনুসারীরা সংগীতকে আধ্যাত্মিক চর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের দরবারে কাওয়ালি ছিল হৃদয়কে নরম করার, মানুষকে আত্মিক অনুভূতির দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি মাধ্যম।
এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আমির খসরু কেবল কাওয়ালির বিকাশেই ভূমিকা রাখেননি, বরং ভারতীয় উপমহাদেশে সংগীতচর্চার এক নতুন পরিমণ্ডল তৈরি করেছিলেন। তাঁর কাব্য ও সুরচর্চা আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে প্রকাশের এক নতুন ভাষা দিয়েছিল, যেখানে প্রেম, ভক্তি ও ঈশ্বরানুভূতি একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিকাশে মুসলিম শিল্পীদের ভূমিকা নির্ণিত হয়েছে। দিল্লি-আগ্রা দরবার থেকে শুরু করে পরবর্তী মুঘল রাজসভা পর্যন্ত সংগীতচর্চা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং এক উচ্চমাত্রার শিল্প ও বৌদ্ধিক চর্চা হিসেবে গড়ে ওঠে। আমির খসরুর পরে যে দরবারি সংগীতধারা বিকশিত হয়, সেখানে মুসলিম সংগীতজ্ঞরা বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর বিন্যাস, তাল-লয়ের বৈচিত্র্য এবং নতুন বাদ্যযন্ত্রের প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের যে আজকের সমৃদ্ধ কাঠামো, তার ভেতরে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও স্থানীয় ভারতীয় সুরধারার এক অনন্য সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছিল, যেখানে মুসলিম শিল্পীরা সেতুবন্ধনের কাজ করেন। বিশেষ করে খেয়াল, তারানা, কাওয়ালি এবং দরবারি সংগীতের বিকাশে মুসলিম গায়ক-বাদকদের অবদান আজও স্বীকৃত।
মধ্যপ্রাচ্যের সুফি ধারায় সামা ও হামদ-নাতের ঐতিহ্য, পারস্যে রুমি-হাফিজের কবিতার সুরায়িত প্রকাশ, মধ্য এশিয়ায় দরবেশদের আধ্যাত্মিক সংগীতচর্চা, এবং উত্তর আফ্রিকায় গ্নাওয়া ও জিকির-ভিত্তিক সংগীত—সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্বের সংগীতচর্চা এক বহুমাত্রিক পরম্পরা তৈরি করেছে। এই ধারাগুলোতে সংগীত কেবল শিল্প নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, স্মরণ (জিকির) এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। ফলে মুসলিম সভ্যতার সংগীতচর্চা একদিকে যেমন দরবারি ও শাস্ত্রীয় রূপ পেয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সুফি আধ্যাত্মিকতার ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষের অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছে।
এই সব চিন্তাধারা মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—মুসলিম ইতিহাসে সংগীত শুধু বিতর্কের বিষয় নয়, বরং কোথাও কোথাও এটি ছিল জ্ঞান, চিকিৎসা, আধ্যাত্মিকতা এবং সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে যুক্ত এক জীবন্ত চর্চা। ফলে সংগীতকে ঘিরে বর্তমান সময়ের একমাত্রিক বিতর্ক ঐতিহাসিক বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি সংকুচিত। এখানে প্রশ্ন শুধু ‘বৈধ না অবৈধ’ নয় বরং কোন ঐতিহ্যকে আমরা গ্রহণ করছি, আর কোনটিকে বাদ দিচ্ছি।
লেখক: গবেষক চলচ্চিত্র নির্মাতা।
ঢাকা/তারা//