ঢাকা, রবিবার, ২১ আষাঢ় ১৪২৭, ০৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

জিনাতের উদ‌্যোগে শত মাদ্রাসায় ধ্বনিত হয় জঙ্গিবাদ বিরোধী স্লোগান

রেজাউল করিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-১৬ ১১:১১:০১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-১৬ ১:১৬:৩৯ পিএম

তার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিক অনেকগুলো পরিচয় আছে।

কিন্তু সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগে তার জনপ্রিয় পরিচিতি মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় জঙ্গীবাদ বিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য।

যেখানে মাদ্রাসা থেকে জঙ্গীবাদের সৃষ্টি বলে অভিযোগ তোলা হয়, সেখানে মাদ্রাসার ক্লাসরুমে গিয়ে ছাত্র/ছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখান তিনি।

তিনি জিনাত সোহানা চৌধুরী। চট্টগ্রামের মেয়ে। পেশাগত পরিচয়ে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের তৃতীয়বারের মতো মনোনীত বেসরকারি কারা পরিদর্শক।

সাংগঠনিকভাবে তিনি সুচিন্তা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক। পারিবারিকভাবে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জিনাত সোহানা সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগে মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় গিয়ে জঙ্গিবাদ বিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পৌঁছে দিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। সমস্বরে মাদ্রাসা ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে গাইছেন জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। জিনাত সোহানা চৌধুরীর উদ‌্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগে শত মাদ্রাসায় জঙ্গিবাদ বিরোধী স্লোগান ধ্বনিত হয়।

জঙ্গিবাদ বিরোধী যুদ্ধে একজন দুঃসাহসী নারী হিসেবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে খ্যাতি পাওয়া অ্যাডভোকেট জিনাত সোহানা চৌধুরী তার স্বপ্ন যাত্রার কথা বলেছেন রাইজিংবিডির সঙ্গে।

আলাপকালে জিনাত সোহানা জানান, স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি ধাপেই দেশের জন্য, দেশের কল্যাণের জন্য, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য কাজ করার ব্রত নিয়েই অগ্রসর হয়েছেন তিনি। তার এই কল্যাণমুখী অগ্রযাত্রার অংশ হিসেবেই দশ বছর পূর্বে যুক্ত হন ‘সুচিন্তা বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে। যে সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। একের পর এক বোমা হামলা এবং নানা জঙ্গী তৎপড়তার ঘটনা ঘটে দেশের বিভিন্নস্থানে, ঠিক সেই সময়ে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে অন্যরকম যুদ্ধ শুরু করেন জিনাত।

রাইজিংবিডিকে জিনাত সোহানা বলেন, ‘যেখানে মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গীবাদ সৃষ্টির জন্য প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অভিযোগ তোলা হয়, সেখানে আমি চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে গিয়ে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে অন্যরকম এক সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছি। যেসব মাদ্রাসায় কখনো জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হতো না সেসব মাদ্রাসায় শত শত ছাত্রছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সমস্বরে গেয়েছি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। প্রতিটি মাদ্রাসায় গিয়ে আমি ছাত্র/শিক্ষক সবাইকে একটি বার্তা পৌঁছে দেই- আর তা হলো ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’, মানুষ হত্যা করে কেউ জান্নাতে যেতে পারে না’। জঙ্গিবাদকে ‘না’ বলতে আমি প্রতিটি মাদ্রাসা ছাত্র/ছাত্রীকে শপথ করাই।’

জিনাত সোহানা আরো বলেন, ‘ইসলামের সঙ্গে জঙ্গিবাদ বিষয়টি সাংঘর্ষিক। কারণ এখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে কিছু দেশদ্রোহী অসাধু মানুষ নিজেদের স্বার্থে কিংবা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে জঙ্গিবাদের মতো হীন কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষদেরকে বিপদগামী করে তোলে। ইসলাম ধর্মের ভ্রাতৃত্বের যে বাণী রয়েছে সেটা সকলের মধ্যে আমি ছড়িয়ে দিতে চাই।’

গত দশ বছর ধরে জিনাত সোহানার জঙ্গিবাদ বিরোধী যুদ্ধে চট্টগ্রাম বিভাগের একশ’র ও বেশি মাদ্রাসা এবং কয়েক লক্ষ ছাত্র/ছাত্রীকে সম্পৃক্ত করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতন করতে সক্ষম হয়েছেন। উত্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে শুরু করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তিনি।

এই কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা স্বীকার করে জিনাত সোহানা বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে মাদ্রাসায় গিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা অনেক কঠিন। নানা সমালোচনার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে নানা ধরনের হুমকি ধমকিও আসতে থাকে প্রতিনিয়ত। কিন্তু আমি অকুতোভয়।’

মাদ্রাসায় গিয়ে শত শত মাদ্রাসা ছাত্রকে নিয়ে জয়বাংলা স্লোগান ধরেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধ. আধুনিক নতুন বাংলাদেশকে উপস্থাপন ধরেন, তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ছাত্রছাত্রীদেরকে তিনি সচেতন করেন- মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে শুধুমাত্র মাদ্রাসার শিক্ষক বা ইমাম মুয়াজ্জিনই হতে হবে বিষয়টি এমন নয়। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে, তথ্য প্রযুক্তিসহ আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে- এই শিক্ষায়।

নিজের কোন রাজনৈতিক উচ্চবিলাস নেই উল্লেখ করে জিনাত সোহানা জানান, ‘সুচিন্তা বাংলাদেশ’ এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক, লেখক, গবেষক মোহাম্মদ এ আরাফাতের নির্দেশনায় রাত দিন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তার পথচলায় অনুপ্রেরণা এবং আইডল হিসেবে মনে করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

বাধা, প্রতিবন্ধকতা কিংবা প্রতিকূলতা যেমনই আসুক, জঙ্গিবাদ, মাদকসহ সকল নেতিবাচক কাজের বিরুদ্ধে সচেতন করে এই প্রজন্মের তারুণ‌্যকে একটি সৃষ্টিশীল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গিকার ব্যাক্ত করেন জিনাত সোহানা চৌধুরী। 


চট্টগ্রাম/রেজাউল/বুলাকী