সিরাজগঞ্জে মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের হাসি, মধু উৎপাদনের লক্ষ্য ৪০৪ টন
অদিত্য রাসেল, সিরাজগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
সরিষা ফুলের মধু
শীতের শিশির ভেজা সকালে ঘন কুয়াশার চাঁদরে মোড়ানো হলুদ ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের দিগন্ত জোড়া সরিষার মাঠ। এ বছর এই জেলায় বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে ব্যাপকহারে সরিষার আবাদ হয়েছে। বর্তমানে মাঠ থেকে সরিষা ফুলের মধু আহরণ শুরু করেছেন স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মৌচাষিরা। ৯টি উপজেলায় সরিষা ক্ষেতের পাশে পাঁচ শতাধিক চাষি মৌ-বক্স স্থাপন করেছেন।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০৪ টন। সরিষা এবং মধু থেকে মৌসুমে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বাণিজ্য আশা করা হচ্ছে।
মধু উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ও মৌমাছি বাঁচাতে সরিষা ফুলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধে কৃষকদের সচেতনতার দাবি জানিয়েছেন মৌচাষিরা।
যশোর থেকে আসা মৌ চাষি আমিরুল ইসলাম জানান, উল্লাপাড়ায় ৩০০টি মৌ-বক্স বসানো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একাই ৪ হাজার ৫০০ কেজির বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন এমনটি আশা করছেন তিনি।
একই কথা জানান সাতক্ষীরার মৌ চাষি পলাশ ও স্থানীয় খামারি রাকিব হোসেন। রাকিব বলেন, “গত কয়েক বছর ধরেই এখানে মধু সংগ্রহ করছি, প্রতিবারই ভালো লাভ হয়েছে।”
সরিষার মধু সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করা মৌ-বক্স
উত্তরবঙ্গ মৌ চাষি সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, “অনেক মৌ চাষিদের কৃষি প্রণোদনা হিসেবে মৌ-বক্স দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং মৌ খামারিদের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সব মিলিয়ে কৃষি বিভাগ সরাসরি মধু উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করছে। বর্তমানে ১০ হাজার কেজি মধু সংগ্রহ করেছেন মৌচাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।”
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্না ইয়াসমিন সুমী বলেন, “এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২৪ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। এখানকার আবহাওয়া ও সরিষার ফুল মধু উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহে স্থানীয় মৌচাষি ছাড়াও অন্যত্র থেকে অনেকেই এসেছেন। মধু উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।”
মৌ-বক্স থেকে পাওয়া মধু
চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, এ উপজেলায় ১০ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো মাঠ। প্রায় ৫ হাজার মৌ-বক্স মধু সংগ্রহের জন্য বসানো হয়েছে। আরো বক্স বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শষ্য) মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, “মৌমাছি মধু সংগ্রহের সময় ফুলে ফুলে উড়ে পরাগায়ন ঘটায়। ফলে শষ্যের উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। মধু চাষি ও কৃষক উভয় লাভবান হয়। উৎপাদিত মধু মাঠ থেকে দেশের বড় বড় কোম্পানি কিনে বাজারজাত করে। প্রতিকেজি মধু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়।”
মৌমাছি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (উপ-পরিচালক) এ. কে. এম মনজুরে মওলা বলেন, “সরিষা ও মধুকে ঘিরে জেলায় বড় পরিসরে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সরিষা চাষিদের জন্য উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের বীজ বিতরণ, সার ও সুষম সার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ, সময়মতো বপন ও সঠিক পরিচর্যার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “মৌ চাষিদের ক্ষেত্রেও আমরা নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। মৌ-বক্স স্থাপনের সঠিক দূরত্ব, প্রতি একর জমিতে কতটি মৌ বক্স বসানো উপযুক্ত, এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা, যাতে মৌমাছির ক্ষতি না হয়, সে বিষয়েও কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।”
ঢাকা/মাসুদ