আর্সেনিকেও টিকে থাকে ব্রি ধান-১০৫
ই এম সৌরভ, ঢাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ ধান উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সেনিকের উপস্থিতিতে ধানের অঙ্কুরোদগম, বৃদ্ধি ও জৈব ভর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে কিছু ধান জাত প্রতিকূল এই পরিবেশেও তুলনামূলক বেশি সহনশীলতা দেখায়।
‘Arsenic Tolerance in Rice: A Comparative Study on Germination and Early Growth Stage’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Bangladesh Journal of Botany–এর মার্চ ২০২৬ সংখ্যায়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাহিদ আকতার, অধ্যাপক মো. আব্দুল হালিম ও তাদের সহকর্মীরা।
গবেষণায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) থেকে সংগৃহীত সাতটি বোরো ধানের জাত—ব্রি ধান-৯২, ৯৯, ১০০, ১০১, ১০২, ১০৪ ও ১০৫—নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন মাত্রার (০, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ ppm) আর্সেনিক প্রয়োগ করে ১৪ দিন ধরে অঙ্কুরোদগম ও চারার প্রাথমিক বৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, আর্সেনিকের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধানের অঙ্কুরোদগমের হার, গতি ও সূচক কমে যায়। একই সঙ্গে চারার শিকড় ও কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, তাজা ও শুষ্ক ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বিশেষভাবে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ২০ ppm আর্সেনিকের উপস্থিতিতেও ‘ব্রি ধান-১০৫’ প্রায় ৮১ দশমিক ৬৭ শতাংশ অঙ্কুরোদগম ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে ‘ব্রি ধান-১০৪’-এর ক্ষেত্রে তা নেমে আসে মাত্র ১০ শতাংশে।
চারার বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। আর্সেনিকের কারণে শিকড় ও কাণ্ডের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কিছু ক্ষেত্রে শিকড়ের দৈর্ঘ্য ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়, যা উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, ‘ব্রি ধান-১০৫’ আর্সেনিকের প্রতিকূল পরিবেশেও তুলনামূলক কম ক্ষতির মুখে পড়ে এবং জৈব ভর ধরে রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ‘ব্রি ধান-৯৯’ ও ‘ব্রি ধান-১০৪’ সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণের কারণে সেচের মাধ্যমে ধানক্ষেতে এই বিষাক্ত উপাদান প্রবেশ করছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
অধ্যাপক মো. আব্দুল হালিম বলেন, “স্যালো মেশিন থেকে উত্তোলিত পানির মাধ্যমেই মূলত জমিতে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ে। দেশে এমন খুব কম পানিই আছে যেখানে আর্সেনিক নেই। প্রায় ৫৪টি জেলায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।”
তিনি আরো বলেন, “ধান আর্সেনিক গ্রহণ করলে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, আবার ধানের খড় খাওয়ার মাধ্যমে গবাদিপশুর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি ধীরে ধীরে পুরো খাদ্যচক্রের মধ্যে প্রবেশ করছে।”
আর্সেনিক আক্রান্ত জমিতে প্রতিষেধক হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সার ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করেন এই গবেষক। তার ভাষ্য, এসব সার প্রয়োগে গাছ নিজস্ব কৌশলে আর্সেনিকের প্রভাব কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে।
গবেষকদের মতে, আর্সেনিক সহনশীল ধান জাত যেমন ‘ব্রি ধান-১০৫’ ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ে চাষের জন্য সম্ভাবনাময় হতে পারে। পাশাপাশি আর্সেনিক সহনশীলতা বাড়াতে জেনেটিক ও প্রজননভিত্তিক গবেষণা আরও জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অন্যতম গবেষক ড. আব্দুল হালিম বলেন, “আমরা যেসব জাত নিয়ে কাজ করেছি, তার মধ্যে ব্রি ধান-১০৫ সবচেয়ে বেশি সহনশীল। ভবিষ্যতে আরো জাত নিয়ে গবেষণা করলে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।”
গবেষণাটি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, আর্সেনিক দূষণ ধানের প্রাথমিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তবে সঠিক জাত নির্বাচন করলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব, যা বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব পায়—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আব্দুল হালিম বলেন, “সরকারি পর্যায়ে এসব গবেষণাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী ধরনের গবেষণা ও প্রকাশনা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য সরকারের একটি সমন্বিত উইং থাকা দরকার।”
তিনি বলেন, “পলিসি মেকিংয়ের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় জড়িত। তারা যদি আমাদের নির্দিষ্ট গবেষণার নির্দেশনা দেয় এবং আরো তথ্য চায়, তাহলে বড় পরিসরে কাজ করা সহজ হবে। বর্তমানে আমরা নিজেদের সীমিত অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছোট পরিসরে কাজ করছি। বড় আকারে গবেষণা করতে গেলে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় দুটোই প্রয়োজন।”
ঢাকা/জান্নাত