RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

মানবদেহের নতুন ১০ বিষয় জানালেন বিজ্ঞানীরা

নিয়ন রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:০৬, ১ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
মানবদেহের নতুন ১০ বিষয় জানালেন বিজ্ঞানীরা

আমাদের মানবদেহকে একটা জটিল মেশিনের সাথে তুলনা করা যায়। যেই মেশিনের অনেক পার্টস সম্পর্কে এখনও আমরা অনেক কিছুই জানি না। তাই এখনও গবেষকরা মানবদেহের নিত্যনতুন গোপন বিষয় আবিষ্কার করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এইতো গতবছর এক গবেষণায় আমাদের দেহের ইমিউন সেলের মধ্যে এক অদৃশ্য নেটওয়ার্কের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। চলুন পাঠক মানবদেহ সম্পর্কে নতুন এবং সর্বশেষ আবিষ্কৃত ১০টি তথ্য বিস্তারিত জেনে নিই। 

জেল-ও হেয়ারিং

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, মানুষ কান দিয়ে পরিষ্কারভাবে সবকিছু শুনতে পারে কানের ভেতর ‘জেল-ও’ নামক অতিক্ষুদ্র ও পাতলা একটি পর্দার কারণে। অত্যন্ত পাতলা এই টিস্যুগুচ্ছকে টেক্টোরিয়াল মেমব্রেন নামে ডাকা হতো। এই পর্দাটি ৯৭% ভাগই পানি দিয়ে গঠিত। এই টিস্যু বাহির থেকে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির শব্দতরঙ্গকে নার্ভ রিসিপ্টরে আনতে সহায়তা করে। এরপর নার্ভ রিসিপ্টর এই তরঙ্গকে মস্তিষ্ক যাতে পড়তে পারে এমন একটি ইলেক্ট্রিক সিগন্যালে রূপান্তরিত করে মস্তিষ্কে প্রেরণ করে। 

সূক্ষ্ম টানেল

আমাদের দেহের হাড়গুলোতে এখনও অজানা অনেক আণুবীক্ষণিক টানেল নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই টানেলগুলো সম্ভবত ইমিউল সেলে সংকেত সরবরাহ অথবা ব্লাড সার্কুলেশনের কাজ করে থাকে। কিছুদিন আগে একদল গবেষক ইঁদুরের পায়ের হাড়েও এরকম শত শত ক্ষুদ্র টানেল আবিষ্কার করেছিলেন। এই অদ্ভুত জিনিস দেখার পর গবেষকদের মধ্যে একজন নিজের পা এমআরআই মেশিনে ঢুকিয়ে দেন। তার পা স্ক্যান করে তিনি দেখতে পান যে, তার হাড়ের টিস্যুগুলোতেও এমন কিছু ছিদ্র ছিল যা ইঙ্গিত করে যে ইঁদুরের পায়ের হাড়ের টানেলগুলোর মতো মানুষের পায়ের হাড়েও অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টানেল রয়েছে। 

পানি পান করা বন্ধ করুন

সাম্প্রতিক সময়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের ঠিক কতটুক পানি খাওয়া উচিত তা আমাদের মস্তিষ্ক নির্ধারণ করে দেয়। আমাদের অন্ত্রের প্রেডিকশন মেকানিজমের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠিয়ে এই ব্যাপারটি নির্ধারণ করে। অন্ত্রের মধ্যে থাকা কোষগুলো মস্তিষ্কে সংকেত পাঠিয়ে জানায় যে আপনি ঠিক কতটুক তৃষ্ণার্ত। পানি পান করার সময় এই টিস্যুগুলো ক্রমাগত সংকেত পাঠাতে থাকে। যখন এই টিস্যুগুলো সংকেত পাঠায় যে, আপনি কম তৃষ্ণার্ত বা তৃষ্ণার্ত না তখনই আপনি পানি পান করা বন্ধ করে দেন।

নতুন অঙ্গ

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আমাদের দেহে নতুন এক অঙ্গের সন্ধান পেয়েছেন। এটি ত্বকের ঠিক নিচেই থাকে এবং সামান্য খোঁচার মতো আঘাতগুলো অনুভূত করতে সহায়তা করে। এই আবিষ্কারের পূর্বে ধারণা করা হতো যে, সূচ ফোঁটানো বা সামান্য খোঁচার ব্যথাগুলো অনুভূত করতে সহায়তা করতো চামড়ার উপরিভাগের টিস্যুগুলো। তবে ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করার সময় একই ব্যাপার লক্ষ্য করার পর মানবদেহ নিয়েও গবেষণা করে এই চমৎকার তথ্যটি জানতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের ত্বকের নিচে জালের মতো থাকা নতুন এই অঙ্গকে বলা হচ্ছে নসিসেপটিক গ্লিও-নিউরাল কমপ্লেক্স।

টিকটিকির মতো দেখতে ক্ষুদ্র পেশী

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, জন্ম নেওয়ার আগে শিশুদের হাত এবং পায়ে টিকটিকির মতো দেখতে কিছু পেশী ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে পেতে জন্মের পর একদম হারিয়ে যায়। মানব ভ্রুণের থ্রিডি ছবি গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, এই পেশীগুলো ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে একটা সময় একদম সংকুচিত হয়ে যায় বা অন্য পেশীগুলোর সাথে মিশে যায়। তবে কেন বা কীভাবে এরকম হয় এর কোনো কারণ এখন পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। 

টি হেল্পার সেল

সুপার সেঞ্চুরিয়ান বা ১১০ বছরের চেয়ে বেশি যারা বাঁচেন সেসব লোকেদের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার পেছনে অবশ্যই কোনো সিক্রেট আছে। সাম্প্রতিককালে এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, সুপার সেঞ্চুরিয়ানদের দেহে ‘টি হেল্পার সেল’ নামে এক বিশেষ প্রকারের ইমিউন সেল থাকে। এটি সুপার সেঞ্চুরিয়ানদের বিভিন্ন ভাইরাস এবং টিউমার থেকে রক্ষা করে। আর এই বিশেষ কোষের জন্যই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন সুপার সেঞ্চুরিয়ানরা। 

মস্তিষ্কের দক্ষতা

আমাদের মধ্যে দেখবেন যে কিছু মানুষ আছে যারা খুবই মেধাবী, বুদ্ধিমান এবং প্রায় সবকিছুই মনে রাখতে পারে। এর কারণ হলো এদের মস্তিষ্কের নিউরন নেটওয়ার্কগুলো খুব দক্ষতার সাথে একে অন্যের সাথে যুক্ত আছে। জার্মানির একদল গবেষক সম্প্রতি ৩২৪ জন মানুষের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানতে পেরেছেন। তারা এইসব মানুষদের শিল্পকলা, আর্কিটেকচার এবং সায়েন্সের বিভিন্ন জিনিস নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এবং তাদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করেছিলেন। যারা উত্তরগুলো খুব দ্রুত বা নিখুঁতভাবে দিতে পেরেছিল তাদের মস্তিষ্কের স্ক্যান রিপোর্টে গবেষকরা দেখতে পান যে, অন্য সাধারণ মানুষদের তুলনায় তাদের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং শক্তিশালীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত আছে। 

ধরুণ আপনাকে প্রশ্ন করা হলো, মানুষ প্রথম কবে চাঁদে অবতরণ করেছিল? এই প্রশ্ন শোনার পর আপনার মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকবে মস্তিষ্কের কোন অংশে ‘চাঁদ’ সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণ করা আছে। কিন্তু ‘চাঁদে অবতরণ’ এবং ‘এটি কোন বছরের ঘটনা’ এই তথ্যগুলো নিশ্চই মস্তিষ্কের ওই অংশেই থাকবে না। তাই সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য মস্তিষ্ক সবগুলো তথ্যকে একত্রিত করে। এইক্ষেত্রে যাদের নিউরাল নেটওয়ার্ক সাধারণ তাদের উত্তর দিতে বেগ পেতে হয়। কিন্তু যাদের মস্তিষ্কের নিউরন নেটওয়ার্কগুলো খুব দক্ষতার সাথে একে অন্যের সাথে যুক্ত আছে তারা চট করেই উত্তর দিয়ে দেয়।

ইমিউন সেল এক্স

নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মানবদেহে অজানা এক ধরনের কোষের সন্ধান পেয়েছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইমিউন সেল এক্স’। মানবদেহে এ ধরনের কোষ সংখ্যায় খুবই কম। প্রতি ১০০০ শ্বেত রক্তকণিকায় মাত্র ৭ টিরও কম। তবে স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধে এরা খুব শক্তিশালী খেলোয়াড়। মানবদেহে কোনো কোষ যখন অজানা আচরণ করে বা ভুল করে তখনই ইমিউন সেল এক্স তাদের আক্রমণ করে বসে। গবেষকরা টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের দেহে এই বিশেষ প্রকার কোষের অস্তিত্ব পেয়েছেন। তবে এটা এখনও পরিষ্কার না যে, ডায়বেটিসের জন্য এই কোষটিই দায়ী নাকি ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য দেহে এই কোষের সৃষ্টি হয়। 

আমাদের জিহ্বাও গন্ধ নিতে পারে

এবার আপনাদের অবাক করা এক তথ্য শুনাচ্ছি। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এক গবেষণায় প্রমাণ পেয়েছেন যে, মানুষের জিহ্বাও যেকোনো জিনিসের গন্ধ নিতে সক্ষম। গবেষকরা মানুষের স্বাদ বৃদ্ধি নিয়ে এক গবেষণা করার সময় খেয়াল করেন যে, মানুষের জিহ্বাতেও এমন কিছু কোষ রয়েছে যেগুলো নাকের ভেতরে থাকে। এই কোষগুলো সাধারণত নাককে গন্ধ নিতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীরা আরো খেয়াল করেন যে, গন্ধ নেওয়ার সময় নাকের কোষগুলো যেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, জিহ্বার কোষগুলোও একই প্রতিক্রিয়া দেখায়। সুতরাং মানুষের জিহ্বাও গন্ধ নিতে সক্ষম। এ ব্যাপারটা অদ্ভুত না? 

মানুষের সহনশীলতার সীমা

গবেষকরা খেয়াল করে দেখেছেন যে, অনেক ধৈর্যশীল অ্যাথলেটদেরও সীমিত শক্তি রয়েছে। কিন্তু তারা ঠিকঠাকভাবেই পারফর্ম করছে। আমরা প্রায় সবাই জানি যে, মানবদেহের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে প্রতিদিন গড়ে ৪০০০ ক্যালরি ক্ষয় হয়। বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু ইভেন্টের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, ইভেন্ট যতো দীর্ঘ হবে ক্যালরি পোড়ানো ততো কঠিন হয়ে যাবে। তাই ম্যারাথনের দৌঁড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে আড়াই-তিন গুণ বেশি ক্যালোরি দরকার হয়। এবং মানুষের অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এরকম কিছু খুব কম সময়ই হয়। মানুষের সহনশীলতার উপর নির্ভর করেই ক্যালরি খরচ হয়। এখন আপনি যে কাজই করুন না কেন।

তথ্যসূত্র : লাইভ সায়েন্স



ঢাকা/ফিরোজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়