Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৭ নভেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৮ ||  ২০ রবিউস সানি ১৪৪৩

ভিয়েতনামের ফ্লাইটের অপক্ষোয়

ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৩, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৯, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১
ভিয়েতনামের ফ্লাইটের অপক্ষোয়

নদীর পাড়ে মানুষ এবং কবুতরের এমন সখ্য কোথাও দেখিনি

বিজন দ্বীপের স্বরলিপি: ষষ্ঠ পর্ব

নমফেন ফেরার টিকিট কাটার পর এদিক-সেদিক ঘুরতেই দিনটা পেরিয়ে গেল। সন্ধ্যার পর আরেকটা বাজার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে চলে গেলাম সকসন রোড এলাকার ঠিক পেছনের দিকে, যেখানে আমি সাধারণত ভাত-মাংস খাওয়ার জন্য যাই। এখানে একটা হস্তশিল্পের বাজার আছে। নাম ‘ফাল্লা আঙ্কোর নাইট মার্কেট’। আলো ঝলমলে বাজারের প্রায় শতভাগ ক্রেতা-দর্শনার্থী বিদেশি। হরেক পণ্যের সমাহার! অনেক জিনিসের মধ্যে পছন্দ হলো ছোট একজোড়া হাতির দাঁত। এত কিছুর ভিড়ে এই জিনিস কেন পছন্দ হলো জানি না। তাছাড়া বাংলাদেশে নেয়াটাও ঝুকিপূর্ণ। সব মিলিয়ে মন সায় দিতে না চাইলেও দরদাম শুরু করলাম। শেষ পর্যন্ত দামে পর্তায় না পড়ায় ইচ্ছা পরিত্যাগ করেই বরং শান্তি পেলাম।

নাইট মার্কেট থেকে চললাম পাব স্ট্রীটে। এখানে শেষ বারের মতো একটা চক্কর দিয়ে রেস্টুরেন্টের প্রিয় হয়ে ওঠা টেবিলটাতে গিয়ে বসলাম। তার আগে সকসন রোডের মুখে দেখা হলো সেই টুকটুক চালকের সঙ্গে। এখনও তার ইচ্ছা দমেনি। আমাকে বিশেষ কোথাও নিয়ে যেতে চায়। প্রতিদিন যতবার দেখা হয়েছে তার একই প্রস্তাব। সে যেন বারবার এমন করে আনন্দ পাচ্ছিল। ব্যপারটা আমারও খারাপ লাগছিল না। যত বার রেস্টুরেন্টটিতে গিয়েছি টেবিল ফাঁকা পেয়েছি। এর পেছনে আধ্যাত্মিক কোনো কারণ না থাকলেও একটা ব্যাপার নিশ্চিত- ওই টেবিল আসলে কারও পছন্দ নয়।

স্থাপনাগুলো দেখলে চমকে উঠতে হয়

ভোরবেলা একটা টুকটুক এসে হোটেল থেকে আমাকে তুলে নিয়ে পৌঁছে দিলো বাস স্ট্যান্ডে। এই রুটে শতভাগ বাস এসি সুবিধাসম্পন্ন। তবে এ যাত্রা সেবা ও মানের দিক থেকে সুবিধার মনে হলো না। অস্বস্তিকর যাত্রায় একমাত্র ভরসা সিয়াম রেপ-এর স্মৃতি রোমন্থন। টাটকা স্মৃতিগুলো রোমন্থনের মধ্য দিয়ে যেন সিয়াম রেপ থেকে পুনরায় একটা ভ্রমণ দিয়ে এলাম। নমফেনে থাকার জায়গা বুক করা আছে রিভার সাইড এলাকার নিকটে। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা পর বাস যখন নমফেন শহরে প্রবেশ করল তখন থেকেই পাশের যাত্রীদের কাছে জানতে চাইলাম- হোটেলে যেতে ঠিক কোন জায়গায় নামতে হবে?

সমস্যা বাঁধল ভাষা নিয়ে। তারা কেউ আমার কথা বুঝতে পারল না, এমনকি বাসের সুপারভাইজারও না। বলা যায় ছোটখাটো একটা বিপদে পড়ে গেলাম। আমার এমন বিপদ দেখে একজন ইংরেজি জানা লোক হাত বাড়িয়ে আমার কাছ থেকে মানচিত্র নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে বললেন, চিন্তা করবেন না, আমি যেখানে নামবো সেখানে নামলেই হবে। নির্দিষ্ট বাস স্টপেজে নেমে একটা টুকটুক নিয়ে তিনি আগে আমাকে নামিয়ে দিলেন। বাস থেকে শুরু করে হোটেলে পৌঁছা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টার আলাপচারিতা। ফিলিপিনের নাগরিক লিওপোল্ডো নমফেনে চার্চভিত্তিক এক সংগীত বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। সংগীতের শিক্ষকতায় কম্বোডিয়াতে নয় বছর ধরে অবস্থান করছেন। দুই সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে বর্তমানে নমফেনেই স্থায়ী হয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল, যা আজও অটুট আছে এবং প্রায়ই যোগাযোগ হয়।

সংগীতের জগতে আমারও যে কিঞ্চিৎ পদচারণা তা খোলাসা হওয়ার পরই মূলত সম্পর্কটা এঁটে যায়। যাইহোক, হোটেলে পৌঁছে ম্যানেজারকে নিজ থেকেই বলে দিলো আমার প্রতি যেন ঠিকঠাক খেয়াল রাখা হয়। বিদায়ের সময় আবারও স্মরণ করিয়ে দিলো, আমাগীকাল বিমানবন্দর পর্যন্ত সে তার গাড়িতে আমাকে পৌঁছে দেবে। সে জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সময়মতো এসে আমাকে তুলে নেবে।

ফুটপাতের পাশে মাংসের দোকান

হোটেলের নাম দা হ্যাপি হাউস জোন। আমার থাকার জায়গা চার কি পাঁচতলার ডরমেটরিতে। ঘরের সঙ্গে খোলা ছাদ। সাজানো আছে কিছু ফুলের টব। তার ফাঁকে দু’চারজনের জন্য বসার জায়গা। রেলিং ধরে দাঁড়ালে অদূরে নদী থেকে ভেসে আসা বাতাসের আলতো পরশে শরীর জুড়িয়ে যায়। নমফেনের এ পর্বেও আমার সংক্ষিপ্ত বিরতি। পরের দিন দুপুরে ভিয়েতনামের ফ্লাইট। মনে মনে এমন একটা থাকার জায়গাই আশা করেছিলাম। সব মিলিয়ে নমফেন দ্বিতীয় পর্বের শুরুটাই হয়েছে ভালোভাবে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে লিওপোল্ডোর মতো একজন বন্ধু পাওয়া এবং সুন্দর একটা থাকার ব্যবস্থা মিলে যাওয়া। অধিকন্তু সন্ধ্যায় রিভার সাইডে দেখা হবে মাহদী ভাইয়ের সঙ্গে। আগে থেকেই প্রোগ্রাম ঠিক হয়ে আছে।

এখন পর্যন্ত পেটে দানাপানি পড়েনি, মধ্য বিরতিতে শুধু একটা পানীয় নিয়েছিলাম। সে অবশ্য কয়েক ঘণ্টা আগের কথা। সুতরাং, ফ্রেশ হওয়ার পর বিশ্রাম না নিয়ে ছুটে গেলাম লাঞ্চ করতে। মনের মতো একটা রেস্টুরেন্ট পেয়ে বসে পড়লাম। কড়ির থালের উপর এক বাটি উপুর করা ভাত, সঙ্গে তিন টুকরো মাছ ভাজা এবং সালাদসহ দুই ধরনের সুরুয়া। সব শেষে এক পেয়ালা ব্ল্যাক কফি। অন্য কোনো খদ্দের না থাকায় সমাদরের ঘাটতি হলো না। হোটেলে ফিরতেই ম্যানেজার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, লিওপোল্ডো নিজে এসেছিল দেখা করার জন্য। না পেয়ে এই চিঠি দিয়ে গেছে। পড়ার পর মনে হলো সুদূর প্রবাসে এমন বন্ধুরাই বারবার আমার ভ্রমণ অর্থবহ করে তোলার উপকরণ যুগিয়ে যায়। প্রিয় বন্ধু বলে সম্বোধনপূর্বক সে লিখেছে: আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত একটা জরুরি মিটিং পড়ে যাওয়ায় আগামীকাল তোমাকে বিমানবন্দরে নিতে পারছি না। লিওপোল্ডো তার মাঝাড়ি সাইজের চিঠিটা শেষ করেছে একাধিকবার দুঃখ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এবার ম্যানেজার টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিজেই ডায়াল করে আমাকে কথা বলার জন্য এগিয়ে দিলেন। ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাড় থেকে সাড়া দিলো লিওপোল্ডো। সে তার চিঠির ভাষার পুনরাবৃত্তি করল। সব শেষে বুঝিয়ে দিলো কিভাবে বিমানবন্দরে যাওয়া যাবে। কথা শেষে ম্যানেজার আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইল, আমরা কত দিনের পরিচিত?

রাস্তার পাশেই শোভা পাচ্ছে ভাস্কর্য

ওদিকে মাহদী ভাইও জরুরি কাজে আটাক পড়ায় আসতে পারছেন না। অতএব, আর দেরি না করে ছুটলাম রিভার সাইডে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে প্রবেশ করলাম পুরনো বৃক্ষের ছায়া ঢাকা এক নিরিবিলি পথে। দীর্ঘ প্রাচীরের পাশ দিয়ে সোজা পথটা গিয়ে শেষ হলো এক খোলা চত্বরে। চত্বরের ওপারে নদী, এপারে রাজপ্রাসাদ। অর্থাৎ এতক্ষণ ধরে হেঁটে আসা নিরিবিলি রাস্তার লাগোয়া প্রাচীরটাই প্রাসাদের সীমানা। সবুজ ঘাসের চত্বরে ফরফর করে উড়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার কবুতর। একসাথে এত কবুতর এর আগে কখনও দেখিনি। প্রাসাদের সংস্কার কাজ চলমান। মূল ভবনের অনেকটাই নীল রঙরে নেট দিয়ে ঢেকে দেওয়া। এসবের উপর দিয়ে শুধু চূড়াগুলো বেরিয়ে আছে। ওর চেয়ে বরং কবুতর দেখতেই আমার বেশি ভালো লাগল। ছোট্ট শিশুর দল আর কবুতরের যুগল বিচরণের দৃশ্যে আমি যারপরনাই মুগ্ধ! এদিকে অস্থায়ী খাবারের দোকানে বেচাকেনা জমে উঠেছে। বেশিভাগ দোকানের প্রধান পণ্য হরেক রকমের জলজ ও স্থলজ  কীটপতঙ্গ ভাজা। পা চালালাম নদীর দিকে। নদীর পাড় ধরে প্রায় এক কিলোমিটারের মতো টানা বসার ব্যবস্থা। দর্শনার্থীরা খাবার ছিটিয়ে দিতেই ফরফর করে উড়ে এসে সমবেত হয়ে ঘিরে ধরছে হাজার কবুতর। দর্শনার্থী আর কবুতর দলের এই খেলা রিভার সাইডের নিত্য প্রহরের ব্যাপার।

বেশ চওড়া নদী। বর্ষা চলমান তাই পানিতে টইটুম্বুর। দুই পাড়ের আয়োজন নদীর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে প্রমদতরীগুলোর আলোকসজ্জা ছড়িয়ে পড়ল স্রোতের পড়তে পড়তে। ওদিকে অপর পাড়ের বিন্দু বিন্দু রঙিন আলোর সমষ্টি নমফেনের জমিনে যেন তারার মতো ফুটে বের হলো। রিভার সাইড থেকে ফিরে হেঁটে চললাম শহরের পথে পথে। রাতের শহর, নতুন পথ, নতুন মানুষ। সমস্ত আয়োজনই আমার জন্য নতুন। নতুনের সাক্ষাৎ পেতে কার না ভালো লাগে? সেই ভালো লাগার অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে অনেক ব্যস্ত এলাকায় পৌঁছে গেলাম। রাস্তার দু’ধারে শুধু রেস্টুরেন্ট। সী-ফুড এসবের প্রধান পণ্য। প্রতিটি রেস্টুরেন্টের সামনে সাজানো মাছ, কাঁকড়া এবং বিভিন্ন প্রজাতীর শামুক, ঝিনুক ও সামুদ্রিক প্রাণীর সম্ভার। খদ্দেরের পছন্দ মতো রান্না করে দেওয়া হয়। কোনো কোনো রেস্টুরেন্টে রয়েছে স্থানীয় ঐতিহ্যের রীতিতে বসার ব্যবস্থা। এই আয়োজন সবচেয়ে বেশি উপভোগ করতে দেখা গেল বিদেশি পর্যটকদের। জমজমাট এলাকা, ঘুরতে ঘুরতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেল। (চলবে)  

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়