ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ কার্তিক ১৪২৪, ২৪ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-৩০ ৬:৫৩:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-৩০ ১০:৩৯:১৭ পিএম

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাখাইনে মিয়ানমারের অভিযান ও এর ফলে সৃষ্ট সংকট নিয়ে বৈঠক করেছে। কিন্তু  বৃহস্পতিবারের এ বৈঠকে পরিষদের প্রায় সব সদস্য রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হামলার নিন্দা করলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি অবিলম্বে সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। আর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাখাইনে যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নিরাপদে ও সম্মানের সাথে স্থায়ীভাবে ফিরতে পারে, সেই ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স মিয়ানমার সরকারের ভূমিকার নিন্দা জানিয়েছে এবং কার্যকর কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে অভিমত দিয়েছে। আর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ এবং দোষী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি। তবে অপর দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন রাখাইন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তারা মিয়ানমার সরকারের প্রতি নমনীয়।

ফলে ঐকমত্যের অভাবে বৈঠকে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি দেওয়ার উদ্যোগও গৃহীত হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদে এই অনৈক্য আমাদের হতাশ করেছে। পরিষদের মুক্ত অধিবেশনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার রেওয়াজ না থাকলেও সদস্যদেশগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাখাইনের ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বৈঠকে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি সেখানে সেনা অভিযান বন্ধ ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশের দাবি জানিয়েছেন। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে মানবাধিকারের দুঃস্বপ্ন বলে অভিহিত করেছেন তিনি। গুতেরেস আশঙ্কা প্রকাশ করেন, রোহিঙ্গা সংকটের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা, মানবপাচার, এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে তৈরি হওয়া এই সংকট প্রতিবেশী দেশগুলোতে বড় আকারের সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দিতে পারে।

বস্তুতঃ এই সংকট কীভাবে কাটবে, সে বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা অর্জনে সময়সীমা ঠিক করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। মিয়ানমারের প্রতিনিধি ৫ সেপ্টেম্বরের পর সে দেশে সামরিক অভিযান হচ্ছে না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা যে চরম মিথ্যা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সচিত্র প্রতিবেদন তার বড় প্রমাণ।

জাতিসংঘের মহাসচিব তার বক্তব্যে বলেছেন, সমস্যার মূলে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব না থাকা। তার এ কথা যথাযথ। কেননা দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই রোহিঙ্গাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পার্লামেন্টে ও মন্ত্রিসভায় ছিলেন। ১৯৮২ সালে জাতিগত নিধন করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়। তবে নাগরিকত্ব দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না।  প্রয়োজন বাংলাদেশে অবস্থানরত নয় লাখসহ নানা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং সেই নিশ্চয়তা প্রদান, যাতে সেখানে তারা নিরাপদে বাস করতে পারে।

আমাদের দাবি সবার আগে মিয়ানমারকে হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সেখানে যাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সমমর্যাদা ও সম–অধিকারের ভিত্তিতে বসবাস করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই নিষ্ঠুর জাতিগত নিধন ও বিতাড়নের অবসান এবং অপরাধের বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রস্তাব প্রণিধানযোগ্য, যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেখেছেন। কফি আনানের প্রতিবেদনেও তাদের নাগরিকত্ব প্রদান, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অনুমতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবের আলোকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে বাধ্য করতে হবে মিয়ানমারকে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭/আলী নওশের

Walton
 
   
Marcel