ঢাকা, রবিবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

খুলনার উপকূলে নিরাপদ পানির সংকট চরমে

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২০ ৮:৫৭:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২১ ৪:১১:৪১ পিএম
উপকূলে নারীদের নিরাপদ পানি সংগ্রহ

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : দুর্বল পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার কারণে বৃহত্তর খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটে ভুগছে। এখনও তাদের পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপরই ভরসা করতে হয়।

বাঁধ কেটে লবণ পানি প্রবেশ, অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ, নদী প্রবাহে বাঁধা, নদী-খাল দখলসহ নানাবিধ কারণে যুগ যুগ ধরে সুপেয় পানির এ সংকট অব্যাহত রয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে  উপকূলীয় অঞ্চলে এক কলসি নিরাপদ পানি যেন সোনার হরিণ। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি এবং বৃষ্টি শেষে পুকুরের পানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় হাহাকার। পুরো উপকূলজুড়েই এই চিত্র। দিন যত যাচ্ছে নিরাপদ পানির জন্য হাহাকারও বাড়ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব দীর্ঘকালের। এ ছাড়াও ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডর এবং ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় উপকূলের সুপেয় পানির উৎসগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি মহাসংকটে রূপ নেয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় নদ-নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে উপকূলের জীবন-জীবিকা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপ, কয়রা, মংলা, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, শ্যামনগর ও আশাশুনির অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এসব উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়নেই গভীর নলকূপ কার্যকর নয়। এখানে বসবাসরত মানুষ বর্ষা মৌসুমে মূলত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে বছরের ২/৩ মাস পান করে। বৃষ্টি পরবর্তী সময়ে শুষ্ক মৌসুমে সীমিত সংখ্যক পুকুরই তখন হয়ে ওঠে সুপেয় পানির প্রধান উৎস।



এসব সংরক্ষিত পুকুরের সংখ্যা এতই সীমিত যে গ্রামবাসী ৪-৫ ঘণ্টা ব্যয় করে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হয় পুকুর থেকে। উপকূলের বাসিন্দারা বছরের ৩ থেকে ৪ মাস পুকুরের পানি পান করেন। একটি পর্যায়ে পুকুরের পানিও শুকিয়ে যায়। অবস্থাপন্নরা তখন উচ্চমূল্যে পানি সংগ্রহ করতে পারলেও দরিদ্রদের মধ্যে পানির জন্য হাহাকার পড়ে যায়। এ হাহাকার অব্যাহত থাকে পরবর্তী বৃষ্টি মৌসুমের আগ পর্যন্ত। পানিবেষ্টিত উপকূলের জীবন ওষ্ঠাগত এই পানিরই অভাবে।

খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালি ইউনিয়নের বগা গ্রামের গৃহবধূ রোমেছা বেগম জানান, খুব সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় ইসলামপুর গ্রামের সরকারি পুকুরে। একটু সকাল সকাল পৌঁছাতে পারলে পরিষ্কার পানি পাওয়া যায়। তা নাহলে কর্দমাক্ত ঘোলা পানি নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের চারধারে লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন পুকরের পানি ঘোলা হয়ে যায় বলে পরিষ্কার পানির জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো দিন পানি নিয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যাও হয়ে যায় তার। শুষ্ক মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তারা এভাবে মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করে থাকেন। কারণ সে সময় মিষ্টি পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাওয়া আর লবণাক্ততার কারণে এলাকার সর্বত্রই পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়।

সম্প্রতি উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের হাতিয়ারডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাশের একটি সরকারি পুকুরে প্রায় ১০০ নারী পুরুষ ব্যস্ত কলস ও ড্রামে পানি ভরার কাজে। দুপুরের তপ্ত রোদে পুকুরের ঘোলা পানি কলসে ভরতে রীতিমত নেয়ে ঘেমে একাকার সবাই।

কয়রা উপজেলার সর্বত্র ঘুরেও অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। কোথাও পুকুরে পানি নেই। কোথাও নলকূপ, কোথাও লবণ পানি শোধন প্রক্রিয়া (পিএসএফ) বিকল হয়ে আছে। অনেক স্থানে পানিতে ব্যাপক লবণাক্ততা।

কয়রায় পানি সংকট দীর্ঘদিনের স্বীকার করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম বলেন, দুই একটি স্থান বাদে এখানে গভীর-অগভীর নলকূপ কোনোটাই সফল নয়। অনেক আগে থেকেই এখানকার মানুষের খাবার পানির প্রধান উৎস পুকুর বা দীঘি।

কয়েকবার ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে সেসব উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু এলাকার পুকুর সংস্কার করা হলেও লবণাক্ততা রয়েছে। আবার যেসব পুকুরে পিএসএফ বসানো হয়েছিল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা বিকল হয়ে পড়েছে। অনেক পুকুরে পানি কমে যাওয়ায় পিএসএফ কাজ করছে না।

তবে পানি সংকট নিরসনে পুকুর খনন ও পিএসএফ বসানো ছাড়া বিকল্প নেই বলেও জানান শহীদুল ইসলাম।



রাইজিংবিডি/খুলনা/২০ মার্চ ২০১৭/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/রিশিত

Walton Laptop