ঢাকা, শনিবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৮ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

রসগোল্লা’র লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১৩ ১১:০০:০২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১৩ ১১:০০:০২ এএম

রুহুল আমিন : ‘রসগোল্লা’ রম্য রচনা পড়ে কে না হেসেছে? রসগোল্লার পাঠকরা নির্দ্বিধায় তা স্বীকার করবেন। চমৎকার এক রম্যকাহিনী রসগোল্লা।ঝান্ডুদা, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। বন্ধুর মেয়ের জন্য এক টিন ভ্যাকুম প্যাকেটজাত মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছেন ইতালি।

ইতালির কাস্টমস ঘরে কাস্টমস অফিসারের সঙ্গে তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাকে তিনি বোঝাতে ব্যর্থ হন যে, প্যাকেট খুললে মিষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে। এরই মধ্যে কাস্টমস অফিসারের ভাঙাচোরা চেহারার বর্ণনা রসগোল্লা খাওয়ার আগে মিষ্টির আনন্দ দেয় যেন পাঠকদের।কাস্টমস ঘরে নানা হাস্যরসাত্মক কাণ্ডের পর ঝান্ডুদাকে মিষ্টান্নর প্যাকেট খুলতে হয়।

সৈয়দ মুজতবা আলী রম্য রচনায় বাংলা সাহিত্যে প্রবাদপুরুষ। এ ছাড়া তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও অনুবাদক।তিনি তার ভ্রমণকাহিনীগুলির জন্যও বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা একই সঙ্গে পাণ্ডিত্য এবং রম্যবোধে পরিপুষ্ট।

সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিন আজ। ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ সিকান্দার আলীর পৈত্রিক ভিটা মৌলভীবাজারে।

বিভিন্ন সময় বাবার চাকরিস্থল বদলি হওয়ায় মুজতবা আলীর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কাটে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯২১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন। বিশ্বভারতীর প্রথমদিকের ছাত্র ছিলেন তিনি। এখানে তিনি সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষা শিক্ষালাভ করেন।

১৯২৬ সালে তিনি বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। পরে দর্শনশাস্ত্র পড়ার জন্য বৃত্তি নিয়ে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান।১৯৩২ সালে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণার জন্য তিনি ডি.ফিল লাভ করেন। ১৯৩৪-১৯৩৫ সালে তিনি মিশরে কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।

আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত মুজতবা আলী কাবুলের শিক্ষাদপ্তরে অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন। ১৯৩৫ সালে বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে তিনি বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি আট বছর কাটান। এরপর দিল্লির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন।

১৯৪৯ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পঞ্চাশের দশকে কিছুদিন আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে তিনি অবসরগ্রহণ করেন।

শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় বিশ্বভারতী নামের হস্তলিখিত ম্যাগাজিনে মুজতবা আলী লিখতেন। পরবর্তীতে তিনি ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রিকায়, যেমন : দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতিতে কলাম লিখেন। দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন।

লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা। বিবিধ ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাকে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ৩০। সেগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভ্রমণকাহিনী ‘দেশে-বিদেশে’, ‘জলে-ডাঙায়’। উপন্যাস ‘অবিশ্বাস্য’, ‘শবনম’। রম্যরচনা ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’ এবং ছোটগল্প ‘চাচা-কাহিনী’, ‘টুনি মেম’ ইত্যাদি।

মানুষকে হাসানো সহজ না। তবে সেই কাজটি অতি সহজে করতে পারতেন সৈয়দ মুজতবা আলী। যে কোনো বক্তব্যকে নিয়ে তিনি হাস্যরস করেছেন। অত্যন্ত গম্ভীর বিষয়কে তিনি রম্য কায়দায় উপস্থাপন করেছেন। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির একঘেয়েমি জীবনে তার রচনা পড়লে হাসির রোল উঠতে বাধ্য। তিনি হাস্যরসের প্রাণভ্রমরা। জীবনে ঘটে যাওয়া নানা তুচ্ছ ঘটনাকে অবলম্বন করে তিনি গড়ে তুলেছেন রম্য রচনার ভুবন। যেখানে একবার অবগাহন করলে হাসিতে জীবন ভরে যায়।

বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ১৯৪৯ সালে তিনি নরসিং দাস পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া ১৯৬১ সালে অর্জন করেন আনন্দ পুরস্কার।গুণি এই মানুষটি ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭/রুহুল/টিপু

Walton Laptop