ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

দিনে দিনে তার নিতে হবে শোধ

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০৩ ১:২৬:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-০৩ ১:২৬:২৫ পিএম

জাফর সোহেল: নির্বাচনের ডামাডোলে জাতি এতটাই আচ্ছন্ন যে, মাঠে টাইগাররা কী করে ফেলেছে তা মনে হয় অনেকে ঠিক আঁচ করতে পারেননি। বিশেষ করে যারা এই দলটাকেই বছরের পর বছর একের পর এক হারে রিক্ত-নিঃস্ব হতে দেখেছেন তাদের জন্য কত বড় পুলকের ঘটনা ঘটে গেছে রোববার, তা ক’জন বুঝতে পেরেছেন কে জানে! এক সেশনেই প্রতিপক্ষের ৯ উইকেট বাগানোর মতো অসাধারণ অর্জন যেমন এদিন হয়েছে, তেমনি প্রথমবারের মতো কাউকে ফলো-অন করিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুনরায় অলআউট করে এই প্রথম ইনিংস ব্যবধানে বিজয় অর্জন করার মতো সুখকর ঘটনা ঘটেছে।

একসময় যে অভিজ্ঞতা বাঙালিকে নিতে হতো নতমস্তকে; একদিন নয়, দুদিন নয়, বহুদিন, বহু বছর। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা এখন অন্যদের ফিরিয়ে দিতে পারার মধ্যে কী যে আনন্দ, কী যে ভালোলাগা- তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশের নয়।

ডিসেম্বরের মহান বিজয়ের মাসে টাইগাররা জাতিকে উপহার দিয়েছে এমন সুখের আর আনন্দের অনন্য অনুভূতি। সাকিব বাহিনীকে এজন্য আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ। মাশরাফি বিন মুর্তজা ওয়ানডে ক্রিকেটে দলকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, টেস্টেও আমাদের সে পথেই হাঁটার দৃপ্ত শপথ দেখা যাচ্ছে। দল হিসেবে পরফর্ম করার এমন ঘটনাকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করবে টাইগাররা, এমনটাই প্রত্যাশা।

এক সময় ছিল, বাঙালি টেস্ট খেলতে নামত আর নিশ্চিত হারের পাশাপাশি হিসেব চলত, কতটা সম্মানজনক হার বরণ করা যায়! জয় তো সুদূর প্রহেলিকা, তখন একটি একক ভালো পারফর্মেন্সের জন্যেও ভক্তদের ছিল তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা। যদি হাবিবুল বাশার একটা ফিফটি করেন, যদি আশরাফুল একটা সেঞ্চুরি করতে পারেন কিংবা যদি মোহাম্মদ রফিক ৫টা উইকেট বাগাতে পারেন!  এরকম যেকোন একটা ঘটনা ঘটলেই বাঙালি ক্রিকেট ভক্তরা বর্তে যেত। একটি ভালো পারফর্মেন্স দেখার জন্য তারা মাঠে গিয়েছে অনেকগুলো সকাল-বিকাল। কখনো কখনো এক-আধটা সান্ত্বনা হয়ত পাওয়া গেছে, তবে বেশিরভাগ দিনগুলো ভক্তদের শেষ হয়েছে হতাশার আগুনে পুড়ে।

তবু শুভ কামনা, দোয়া-প্রার্থনা কম করেননি ভক্তরা। সেই প্রার্থনাতেই কি না কে জানে, দিনে দিনে মার খেতে খেতে একসময় প্রতিরোধ করতে শিখে যান আমাদের মাঠের সৈনিকেরা। তাঁরা হঠাৎ হঠাৎ ধরাশায়ী করতে শুরু করেন প্রবল শক্তিধরদের। এরপর তো পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়াল, দিনে দিনে টাইগার ক্রিকেটে জন্ম হতে শুরু করল তারকার। বাংলাদেশের প্রাণ সাকিব আল হাসান, রান মেশিন তামিম ইকবাল, মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকুর রহিম, লিটল ব্র্যাডম্যান মুমিনুল হক, কাটার মাস্টার মুস্তাফিজ আর ক্যাপ্টেন মাশরাফি বিন মুর্তজারা নিজেরা বনেছেন তারকা আর ভক্তদের দিয়েছেন একের পর এক জয়। জয়ের ক্ষুধায় পেট যখন একেবারে চৌচির, পেটের ভেতরে যখন বুবুক্ষু অবস্থা তখন তাঁরা সে ক্ষুধা মেটানো কর্তব্য মনে করে শুরু করেন জয়ের মিশন। সে মিশনে একের পর এক কাবু হতে থাকে বিশ্বসেরারা। কাপ্তান মাশরাফি হয়ে ওঠেন ‘কাপ্তান অব এশিয়া’।

ঢাকায় তিন দিনে ক্যারিবিয়দের ইনিংস ও ১৮৪ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে হোয়াইট ওয়াশের স্বাদ গ্রহণ করা টাইগার ক্রিকেটের বদলে যাওয়ারই একটি ধারাবাহিক ছবি। শেষতম এই ছবিটি কৌলিন্যের দিক থেকে একটু বেশিই মর্যাদার। টেস্টে জয় আমরা আরও পেয়েছি, তবে কাউকে ফলো-অন করিয়ে এভাবে নাস্তানাবুদ করে জেতা, যেটা আগে আমাদের সঙ্গে হতো, এর আগে তেমনটা হয়নি। যতই উইকেট হেল্প করুক, এমন বিজয় টাইগারদের আত্মবিশ্বাসের ইঞ্জিনে বাড়তি জ্বালানি হবেই। যেকোন ধরনের ক্রিকেটেই সেই জ্বালানিটা এই মুহূর্তে বাঙালির খুব দরকার। সামনেই যে বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণ। ব্রিটিশদের মূল ভূ-খণ্ডে কাপের লড়াইয়ে এবার যে মাশরাফিরাও থাকতে চান সমান তালে।

কিন্তু একটা বিষয়ে একটু খটকা লাগছে। অনেকেই একটু চুপচাপ আছেন, উচ্ছ্বাসে যেন কিছুটা ঘাটতি আছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ কী? কেউ কেউ বলছেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক ঘটনা; এ আর এমন কী, হোয়াইট ওয়াশ তো বাঙালি আগেও করেছে।’- ইত্যকার কিছু মূল্যায়ন চোখে পড়ছে। আমি বলব, একটা জায়গায় তাঁরা এবারের অর্জনটাকে ঠিক সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছেন না। বাংলাদেশ এর আগে টেস্টে হোয়াইট ওয়াশই করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। কিন্তু তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি ছিল একেবারেই ভেঙেচুরে টালমাটাল অবস্থা। এছাড়া সিরিজে পরাজিত করেছে জিম্বাবুয়েকে কয়েকবার। কিন্তু দুটি দলই এখন আগের সেই অবস্থান পেছনে ফেলে এসেছে। দুটি দলই এখন বেশ শক্তিশালী। সবশেষ এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই কিন্তু দেশের মাটিতে টেস্ট হেরেছে টাইগাররা। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি সাম্প্রতিক ভারত সফরে দেখিয়েছে তাদের শক্তিমত্তা। জয় যেমন পেয়েছে তেমনি প্রত্যেকটি ম্যাচে ভারতীয়দের ভুগিয়েছে তারা।

সুতরাং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টাইগারদের এমন দাপুটে বিজয়কে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা হিসেবে না দেখে টাইগারদের দুর্দান্ত পারফর্মেন্স হিসেবেই মূল্যায়ন করা উচিত। সফলতার প্রশ্নে মাঠ বা উইকেট ততটাই আপনাকে হেল্প করবে যতটা আপনি সফল হতে উদগ্রীব থাকেন, যতটা আপনি সেই সফলতার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে পারেন। একই মাঠে বাংলাদেশ ৫০০ রান করতে পারলে ক্যারিবিয়দের তা না-করতে দেয়ার সাফল্য নিশ্চয়ই আমাদের বোলারদের। আর বোলাররা তখনই উইকেট পান যখন সঠিক জায়গায় বলটি ফেলতে পারেন। তাই মিরাজের ১২ উইকেট প্রাপ্তিকে পারফর্মেন্সের গ্রাফ উপরের দিকে উঠেছে ধরে নেয়াটাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

এমন জয়ে দিনে দিনে টাইগারদের শরীরী ভাষারও পরিবর্তন হচ্ছে দারুণভাবে। দেশের মাটিতে এখন অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড যেই খেলত আসুক না কেন, বাঙালিকে হারানো নয় বরং হারের আশঙ্কা বা হার এড়ানোর কৌশল নিয়েই মাঠে নামতে হবে। দেশের বাইরেও ভালো করার সুযোগ এবং যোগ্যতা আগের চেয়ে বেড়েছে টাইগারদের। বাংলাদেশ এখন অন্যদের মতোই একটি বড় দল। খেলা যেখানেই হোক, যে ফরমেটেই হোক ভক্তদের এ বিশ্বাস এখন জন্মেছে- বাংলাদেশ জিততে পারে। আগে যা ছিল ‘বাংলাদেশ ভালো খেলবে বা লড়াই করবে’ ধরনের প্রত্যাশা।

দেশের মাটিতে ভালো খেলার কৌশল সবাই নেয়। ভারত-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড সবাই যার যার ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয়। ক্রিকেটে এটাই চল হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, আগে আমরা ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগানোর মতো খেলোয়াড়ও যোগান দিতে পারিনি। ফলে খেলা দেশে হোক বিদেশে হোক, ফল হতো একটাই- হার। কিন্তু এখন বাংলাদেশের পারফর্ম করার মতো প্রচুর খেলোয়াড় বেরিয়ে এসেছে এবং আরো পাইপলাইনে আছে। আমাদের এখন একজন তামিম বা সাকিব না থাকলেও বিকল্পদের নিয়েই ম্যাচ জিততে পারি। তাই যেহেতু এই সামর্থ্য আমাদের হয়েছে সেহেতু এখনই সময়, যত বেশি করে জয় ছিনিয়ে আনা যায় সে চেষ্টা করা। সেটা দেশের মাটিতে হলে যাতে সব ম্যাচেই জয় নিতে পারি সে ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ, অনেক দেনা আমাদের অছে; অনেক অশ্রুজলের গড়াগড়ি হয়েছে; টিপ্পনি আর পরিহাসের হাসি অনেক হেসেছে ‘মন্ডল বাড়ির অভিজাতেরা’। গিলেস্পির মতো দশ নম্বর ব্যাটসম্যান ২০০ করে বাঙালিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ইনজামাম নিজের দেহের মতোই পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বাঙালিকে নিশ্চিত জয় বঞ্চিত করেছে। এরকম অনেক ঘটনা শেল হয়ে বিঁধে আছে বাঙালির মনে।

এখন সময় হয়েছে এসব ক্ষতে প্রলেপ দেয়ার। এখন আমাদের জিততে হবে, জিতে জিতেই দিতে হবে জবাব। মুলতান, মেলবোর্ন, লর্ডসে দিনে দিনে অনেক জমিয়াছে দেনা; এখন তার নিতে হবে শোধ। দীর্ঘদিনের ব্যথা-বেদনার উপশমের জন্য এখন এমন সব জয়ই চাই, এমন হোয়াইটওয়াশ চাই, এমন ফলে-অন করানো চাই। মাঠে এমন উদ্দাম নৃত্য চাই প্রতিপক্ষের সামনে। হাসি-ঠাট্টা তামাশা করা চাই!  তবেই না...।

সামনে ওয়ানডে সিরিজ আছে। এখানেও সমান সাফল্য পাবে বাংলাদেশ, এই আশা আমাদের আছে। যদিও লড়াইটা টেস্টের মতো একপেশে হবে না। ক্যারিবিয়রা মাত্রই ভারতে খুব ভালো একটা সিরিজ খেলে এসেছে। তিনশর বেশি রান করেছে বেশ কয়েকবার। তবু আমাদের নেতা মাশরাফি আছেন, সহনেতা সাকিব আছেন, তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ সবাই আছেন। আছে টেস্টে হোয়াইট ওয়াশের টাটকা সুখানুভূতি। আশাকরি জিত আমাদেরই হবে।

শুভ কামনা আমাদের স্বপ্ন সারথিরা, দেখা হবে বিজয়ে।

লেখক: সাংবাদিক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC