ঢাকা     রোববার   ১৭ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪৩৩ || ২৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’র নেপথ্য-কথা

আবদুল মান্নান পলাশ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৯, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’র নেপথ্য-কথা

পাঠ্য বইয়ে ‘কাজলা দিদি’ কবিতার অলঙ্করণ, ইনসেটে যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আবদুল মান্নান পলাশ: যতীন্দ্রমোহন বাগচী রবীন্দ্র-উত্তর যুগের কবি হয়েও রবীন্দ্র-ধারা থেকে মুক্ত- এ বড় কম কথা নয়। তার কবিতায় স্বকীয়তা প্রথম থেকেই স্পষ্ট। রবীন্দ্রধারায় কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিলেন তিনি-এ কথা সত্য, কিন্তু তার পদক্ষেপটি একেবারেই তার নিজস্ব। তিনি শুধুমাত্র ছন্দে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তাই নয়, তার কবিতার ভাষাও এমনই যে, তা সর্বকালের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। যে কারণে এখনও যখন ‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই’ পড়া হয় তখন তা পুরনো বলে মনে হয় না। ‘কাজলা দিদি’ শিরোনামের এই কবিতাটি সে সময় সকল পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে; এবং আজও  এর কাব্যসুধা হৃদয়ে ওই একইরকম অনুভূতির সঞ্চার করে।

যতীন্দ্রমোহন বাগচী খুব অল্প বয়স থেকেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। সে যুগে রবীন্দ্রনাথের ভক্তের তুলনায় নিন্দুকের সংখ্যা কম ছিল না। তখন যতীন্দ্রমোহনের মতো সাহসী তরুণ কবিরা রবীন্দ্রনাথের জয়গান করে প্রকৃত আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কলকাতায় তার  বাড়িতে তিনি গড়ে তোলেন ‘রবীন্দ্র-সাহিত্যচক্র’ এবং ১৯১২ সালে রবীন্দ্র-সংবর্ধনার যে আয়োজন চোখে পড়ে তার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। একুশ জন গায়কের কোরাসে যতীন্দ্রমোহন রচিত গান দিয়ে সেই সভা শুরু হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে স্নেহ করতেন। তার ‘নাগকেশর’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনাতে বিশ্বকবি বলেছিলেন: ‘তোমার লেখনী তোমার কবিত্বকে পক্ষিরাজ ঘোড়ার মতন এখনও সমান বেগে বহিয়া লইয়া চলিয়াছে। … তোমার নিপুণ ছন্দের পায়ে পায়ে অনায়াস নৃত্যলীলার নূপূর বাজিতেছে, আবার তাহার হাতে ও মাথায় কানায় কানায় ভরা বিচিত্র রসের থালি…।’

যতীন্দ্রমোহনের কবিতায় হাতেখড়ি স্কুল জীবনে। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র।  ১৮৯১ সালে যতীন্দ্রমোহন শুনতে পেলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর নেই। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে কিশোর কবির মন বেদনার্ত হয়ে ওঠে। লিখে ফেলেন বিদ্যাসাগর স্মরণে ছোট্ট একটি কবিতা। এ কবিতা সে সময় অনেককেই অশ্রুসজল করেছে। তেরো বছর বয়সে লেখা সেই রচনাটিই যতীন্দ্রমোহনের প্রথম মুদ্রিত কবিতা বলে সাহিত্যশ্রুতি রয়েছে।

পল্লীর প্রতি যতীন্দ্রমোহনের ছিল স্বাভাবিক আকর্ষণ, একই সঙ্গে তার জন্ম-সংস্কার। সে কারণেই পল্লীর এমন মোহনরূপ তার কবিতায় আমরা পাই; সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোথাও পল্লী-প্রকৃতির উৎকট রোমান্টিক ভাবুকতা তিনি প্রশ্রয় দেননি। সহজ এবং বাস্তব ঘটনার বর্ণনাই ছিল তার কবিতার বৈশিষ্ট্য। তার পল্লীকবিতা শুধুমাত্র পল্লী-বর্ণনায় পরিণত হয়নি, হৃদয়ের উত্তাপে জীবনের স্পন্দন লাভ করেছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যতীন্দ্রমোহনের ‘রেখা’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে কবিকে লিখেছিলেন: ‘এক একটি ছোটোখাটো রেখার টানে গ্রাম্য দৃশ্যগুলি কেমন ফুটিয়া উঠিয়াছে। তোমার ছন্দ সুমধুর, ভাষাও ভাবের উপযোগী। কোনো কোনো কবিতায় সুললিত সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য, আবার গ্রামদৃশ্যের বর্ণনায় ভাবব্যঞ্জক চলিত গ্রাম্য-শব্দের নিপুণ প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়।’

‘যতীন্দ্রমোহনের কাব্যে প্রকৃতি ও মানব-হৃদয়ের একটি অতি সহজ সরল অনাড়ম্বর মধুর সম্পর্কের দিক ফুটিয়া উঠিয়াছে, সেখানে কোনো জবরদস্তি নেই। কল্পনার দুরহ প্রয়াস বা ভাবনার ধনুর্ভঙ্গ পণ নেই। আছে আলো-ছায়ার সহজ মাধুরী, সমবেদনার শরৎ প্রসন্নতা। কিন্তু সবচেয়ে গৌরবজনক তাহার ভাষার শুচিতা।’ বাংলা কাব্যে একক নাটকীয় সংলাপ প্রয়োগেও যতীন্দ্রমোহন সার্থক ছিলেন। এ বিষয়ে তার ‘অন্ধবধূ’ কবিতাটি জ্বলন্ত উদাহরণ-

‘পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী!
আস্তে একটু চল্ না ঠাকুরঝি
ওমা এ যে ঝরা বকুল। নয়?’

গা শিউরে ওঠে অনুভবে। কোনো চক্ষুস্মানের এভাবে কোনো অন্ধ নারীর বেদনা অনুভব করতে পারা এবং তার বর্ণনায় পাঠকের হৃদয় নাড়া দিতে পারা মোটেই সহজ নয়। যতীন্দ্রমোহনের প্রথম কবিতার বই ৬৬টি কবিতা ও গানে সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়। বইটি রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। এই কাব্যগ্রন্থেই সেই বিখ্যাত ‘দিদিহারা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল:

‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো আমার শোলোক-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুরধারে নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই’

এই কবিতাটিতে কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ নেই, তত্ত্ব বা ভাষার আতিশয্যও নেই। কিন্তু অত্যন্ত সহজভাষায় লেখা এই কবিতাটি যে কোনো হৃদয় নাড়া দেয়। কাজলা দিদির শোকে কাতর ভাইটি যে প্রত্যেক পাঠকের বুকের মধ্যে ঢুকে পরেছে, এ জায়গাতেই তিনি অনন্য। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই কবিতাটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন: ‘কবিতাটি সোনার অক্ষরে ছাপানো উচিৎ ছিল।’
তার এই কবিতাটি সুধীন দাশগুপ্তের সুরে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছিল, আজও সকলের মুখে মুখে ফেরে।

যতীন্দ্রমোহনকে লেখক-জীবনের খ্যাতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ সঙ্গে করে চলতে হয়েছে। তার তিন কন্যাসন্তানের অকাল মৃত্যু এবং স্ত্রী ভাবিনী দেবীর মৃত্যু তাকে বারবার শোকাতুর করেছে। সন্তান ও পত্নীর বিয়োগব্যথা যতীন্দ্রমোহনকে অনেক কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। তার কন্যা ইলার মৃত্যুর পরই শোকার্ত হয়ে তিনি ‘কাজলা দিদি’ লিখেছিলেন। প্রতিভা বসুর লেখা পড়ে এ তথ্য জানা যায়। সেই লেখা থেকে আরো জানা যায়, লেখার পর এটি তিনি যত্ন করে রাখেননি, হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার পুত্রবধূ লেখাটি কুড়িয়ে পেয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, জ্যেষ্ঠা এই পুত্রবধূ যতীন্দ্রমোহনের খুব প্রিয় ছিল। তিনিই শ্বশুরের সব রচনা সযত্নে গুছিয়ে রাখতেন। অনেক সময় কবির লেখা ডায়েরিতে টুকে রাখতেন। তার রান্নাও খুব সুস্বাদু ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম তার রান্নার খুব ভক্ত ছিলেন। 



রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়