ফিলিস্তিনিদেরকে দিয়েই ভাঙানো হচ্ছে তাদের বাড়িঘর
জেরুজালেমের পুরনো শহরের প্রাচীরের ঠিক নিচে একটি খাড়া ও ঘনবসতিপূর্ণ উপত্যকার মাটি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জ্যাকহ্যামার এবং বুলডোজারের শব্দে কেঁপে উঠছে।
কয়েক দশক ধরে জেরুজালেমে এই শব্দই শোনা যাচ্ছে। কারণ ইসরায়েলি রাষ্ট্র শহরটির অধিকৃত পূর্বাঞ্চলে একটি অভিন্ন ইহুদি পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং এর ফিলিস্তিনি চরিত্র মুছে ফেলছে।
সাধারণত রাষ্ট্র ও পৌরসভার কর্মীরাই বুলডোজার চালায়। কিন্তু একাদশ শতাব্দীর আল-আকসা মসজিদের ছায়ায় অবস্থিত আল-বুস্তান পাড়ায় এই কোলাহল আরো সাম্প্রতিক একটি ঘটনা থেকে আসছে।
এটা ফিলিস্তিনিদের নিজেদের পারিবারিক বাড়িঘর ভেঙে ফেলার শব্দ।
জালাল আল-তাউইলের ভাড়া করা একটি ট্রাক্টর তার বাবার তৈরি করা বাড়িটির শেষ ধ্বংসাবশেষটুকুও গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই বাড়িটি আবার তার দাদা-দাদির বাড়ির জায়গায় তৈরি হয়েছিল।
ওই দিনের ঘটনা স্মরণ করতে গিয়ে জালাল বলেন, “এটা সত্যিই খুব কঠিন একটা ব্যাপার। এটা একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা।”
বুধবার সকালের মধ্যে বেশিরভাগ দেয়ালই ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং ধ্বংসাবশেষগুলো এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছিল। আল-তাউইল ৩৫ বছরের পুরোনো একটি আঙুর গাছের মোটা, গিঁটযুক্ত শিকড়টি শেষ পর্যন্ত রেখে দিলেন।
তিনি বলেন, “একসময় এটা পুরো আল-বুস্তানের জন্য আঙুর সরবরাহ করত।”
নিজের পরিবারের বাড়ি ও ইতিহাস ধ্বংস করার অভিজ্ঞতা জালাল আল-তাউইলকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু এর মূলে ছিল নির্মম অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জেরুজালেম পৌরসভা তাকে জানিয়েছিল, তাদের কর্মীরা বাড়িটি ভেঙে ফেললে তার ২ লাখ ৮০ হাজার শেকেল (৭২ হাজার পাউন্ড) খরচ হবে। নিজের সরঞ্জাম ও শ্রমিক নিয়োগ করলে আল-তাউইলের খরচ এর ১০ ভাগের এক ভাগেরও কম হতো।
জালাল বলেন, “তাছাড়া, তারা যদি এটা করে, তাহলে তারা জমিটা উপড়ে ফেলবে এবং সবকিছু পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে।”
তিনি জানান, তার কাছে এটা ছিল আত্মহত্যা অথবা খুন হওয়ার মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার মতো।
পূর্ব জেরুজালেমের বৃহত্তর সিলওয়ান জেলার অংশ আল-বুস্তানে গত দুই বছরে ৫৭টিরও বেশি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত আটটি বাড়ি ভাঙার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ওই জায়গায় ‘কিংস গার্ডেন’ নামে বাইবেলভিত্তিক থিম পার্ক তৈরি করা হবে। বাইবেলে কথিত আছে তিন সহস্রাব্দ আগে রাজা সলোমন ওই বাগানে অবসর সময় কাটাতেন।
পার্কটি একটি ক্রমবর্ধমান, মূলত বসতি স্থাপনকারীদের পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত, যা শুধুমাত্র জেরুজালেমের ইহুদি অতীতের উপর আলোকপাত করে এবং তথাকথিত ‘ডেভিডের শহর’কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অবশ্য অনেক ইসরায়েলি প্রত্নতাত্ত্বিকের মতে, দৃশ্যমান ধ্বংসাবশেষগুলো রাজা ডেভিডের রাজত্বের আগে ও পরের অন্যান্য যুগের।
ইর আমিম-এর একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক আভিভ তাতারস্কি বলেন, আল-বুস্তান ভূগোল ও ইতিহাস উভয় থেকেই ফিলিস্তিনিদের মুছে ফেলার বিষয়টিকে মূর্ত করে তোলে।
ইর আমিম হলো জেরুজালেমের একটি ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের পক্ষে কাজ করা একটি গোষ্ঠী।
আভিভ বলেন, “ইসরায়েল জেরুজালেমের দ্বি-জাতীয়, বহু-জাতিগত, বহু-সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করতে রাজি নয় এবং এটি সর্বাগ্রে ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যা কিছু ইহুদি নয়, তাদেরও নিশ্চিহ্ন করছে এবং তারপর এই ডিজনির মতো বানানো আজেবাজে কথা দিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিচ্ছে।”
তিনি জানান, যদি শেষ পর্যন্ত এমনটাই চলতে থাকে, তাহলে ইসরায়েলিরা সেখানে যাবে এবং পার্কটির কাহিনী দেখবে। তারা এই সত্যটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকবে যে, এর জন্য জায়গা তৈরি করতে গিয়ে জীবন ধ্বংস করা হয়েছে, একটি গোটা সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
প্রায় দুই দশক ধরে আল-বুস্তানের উপর কিংস গার্ডেন থিম পার্কের ছায়া ঝুলছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক বিরোধিতা এবং ইসরায়েলি রাজনীতির কিছু দোটানার কারণে বুলডোজারগুলো এতোদিন আটকে ছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলা, তার ফলস্বরূপ গাজা যুদ্ধ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে আসাার পর থেকে এই তিনটি বাধাই ভেঙে পড়েছে।
ছয় সন্তানের জনক, ৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ কায়েদার বলেন, “রাতে পাড়ায় এমন কিছু পথকুকুর ঘুরে বেড়ায় যারা আমাদের চেয়েও বেশি নিরাপদ ও সুরক্ষিত বোধ করে।”
পরিকল্পনাকারীদের সন্তুষ্ট করার আশায় মোহাম্মদ কায়েদার সম্প্রতি তার বাড়ির সেই অংশটি ভেঙে ফেলেছেন, যা অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাদের পারিবারিক বাসস্থান ছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পৌরসভার একজন কর্মকর্তা এসে তাকে সতর্ক করে দেন যে, বাকি অংশটুকু গুঁড়িয়ে দিতে বুলডোজারগুলো আবার ফিরে আসবে।
কাইদারের দীর্ঘস্থায়ী পিঠের সমস্যা আছে, তার একজন প্রতিবন্ধী ছেলে এবং একজন অসুস্থ বৃদ্ধা মা আছেন যিনি নড়াচড়া করতে পারেন না।
তিনি বলেন, “ওরা যদি আমাদের বাড়ি ভেঙে দেয়, আমরা তাঁবু খাটাব। আমরা এখান থেকে যাব না। হয়তো ফিলিস্তিনি হিসেবে আমাদের মানসিকতাকে ওরা ভুল বোঝে। আমরা সহজ লক্ষ্যবস্তু নই। তোমরা আমাদের ভূমি কেড়ে নিতে পার না।”
ঢাকা/শাহেদ
সীমান্তে ৭ পাসপোর্টসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক ডিজি সাব্বির আটক