৭ অক্টোবরের বন্দিদের ফাঁসি ও প্রকাশ্য বিচারের আইন পাস ইসরায়েলে
ইসরায়েলি আইনপ্রণেতারা একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিল অনুমোদন করেছেন, যার অধীনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
সোমবার রাতে ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে বিলটি ৯৩-০ ভোটে পাস হয়। বাকি ২৭ জন আইনপ্রণেতা অনুপস্থিত ছিলেন অথবা ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
মঙ্গলবার (১২ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনের পাশাপাশি ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই আইনের তীব্র সমালোচনা করেছে।
ইসরায়েলে আরব সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘আদালাহ’-এর আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ আল-জাজিরাকে বলেন, “ফিলিস্তিনিদের গণহারে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য এই বিলটি পরিকল্পিতভাবে সুষ্ঠু বিচারের আইনি সুরক্ষা কমিয়ে দিয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “জোরপূর্বক বা নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া স্বীকারোক্তিকেও এই বিলে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।”
ইসরায়েলের সাধারণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে ক্যামেরা নিষিদ্ধ থাকলেও, এই বিলে বিচারের মূল মুহূর্তগুলো একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে ভিডিও করার ও জনসম্মুখে সম্প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাদ্দাদ বলেন, “প্রকাশ্য শুনানি সংক্রান্ত এই বিধানগুলো নির্দোষ হওয়ার পূর্বধারণা, সুষ্ঠু বিচারের অধিকার ও মর্যাদার অধিকার লঙ্ঘন করে। এই কাঠামোটি বিচারিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই যেকোনো অভিযোগকে দোষী সাব্যস্ত করার সমান বলে গণ্য করে।”
তার মতে, “এটি মূলত একটি প্রদর্শনী বিচারে পরিণত হবে, যেখানে প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রাধান্য পাবে।”
ইসরায়েল বর্তমানে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ ফিলিস্তিনিকে আটকে রেখেছে, যাদের মধ্যে ৭ অক্টোবরের হামলার সময় আটক হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
আল জাজিরার পরিসংখ্যান ও ইসরায়েলি সরকারি তথ্যানুযায়ী, গাজা সীমান্তের ইসরায়েলি বসতিগুলোতে হামাসের নেতৃত্বাধীন সেই হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া প্রায় ২৪০ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল।
এর বিপরীতে গাজায় ইসরায়েলের পরবর্তী যুদ্ধকে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই যুদ্ধে অন্তত ৭২ হাজার ৬২৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত অক্টোবর থেকে মার্কিন মধ্যস্থতায় ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৪৬ জন।
সোমবার (১১ মে) ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা হামোকেড, আদালাহ ও পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েলসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা এক বিবৃতিতে বলেছে, “৭ অক্টোবরের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার একটি বৈধ ও জরুরি বিষয় হলেও, অপরাধের জবাবদিহিতা এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত যা ন্যায়বিচারের নীতিগুলোকে বিসর্জন না দিয়ে বরং অন্তর্ভুক্ত করে।”
এই বিলটি গত মার্চ মাসে পাস হওয়া একটি আইন থেকে আলাদা, যেখানে ইসরায়েলিদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেই আইনটিকে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক বলে কঠোর সমালোচনা করেছিল। তবে ওই আইনটি রেট্রোঅ্যাক্টিভ নয় (অর্থাৎ এটি অতীতের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়), তাই এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরের সন্দেহভাজনদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেছেন, নতুন এই আইনটি ‘গাজায় ইসরায়েলের সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের একটি আড়াল হিসেবে কাজ করবে’।
ঢাকা/ফিরোজ